kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

কাশ্মীরের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়বে আশপাশে

তারেক হাবিব   

২১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




কাশ্মীরের

উত্তাপ

ছড়িয়ে পড়বে

আশপাশে

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর গত দুই সপ্তাহে জম্মু-কাশ্মীরে খবরের হিসাব অনুযায়ী চার হাজারেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাস্তবে সংখ্যাটা এত বেশি যে কারাগারেও জায়গা কুলাচ্ছে না, গ্রেপ্তারকৃতদের অন্য রাজ্যের কারাগারে স্থানান্তর করতে হচ্ছে।

এখনো অনেকে নিখোঁজ আছে। বহু নেতা, এমনকি সাংবাদিকদেরও আটক করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কেন্দ্র সরকারের স্বার্থ রক্ষা করে আসা মাহবুবা মুফতিও রেহাই পাননি, গৃহবন্দি হয়ে আছেন। কারফিউও চলছে, সড়কে গাড়ি নেই, দোকানপাট খুলছে না, মোবাইল নেটওয়ার্ক-ইন্টারনেট বন্ধ, অসুস্থদের চিকিত্সা নেওয়ার মতো অবস্থা নেই, খাদ্যসংকট চরমে। ভারত সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি বুঝে পর্যায়ক্রমে কারফিউ শিথিল করা হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি বরং খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভেতরের অনেক খবরই গণমাধ্যমে আসছে না।

 

পাকিস্তান কী চায়?

সম্প্রতি কাশ্মীর সীমান্তে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যকার গোলাগুলিতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন সেনা হতাহত হয়েছে। প্রায়ই এমনটি হচ্ছে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হলে কাশ্মীরে এর বড় রকমের প্রভাব পড়বে, বিদ্রোহীরা এর ফায়দা নেবে।

কাশ্মীরের সশস্ত্রগোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদ, হিজবুল ও লস্করকে মদদ দিচ্ছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা। পাকিস্তান এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিষয়টি অস্পষ্ট নয়। পাকিস্তান নিজেদের স্বার্থে এ সহযোগিতাকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রেখেছে। সংগঠন দুটির নেতারাও অনেক বছর ধরে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজরবন্দিতে। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে তাদের আটক কিংবা গৃহবন্দি করে পরে মুক্তি দেওয়ার নজিরও আছে। জইশের নেতা মাসুদ আজহার, যাকে বিমান ছিনতাইয়ের মাধ্যমে বন্দিবিনিময়ের শর্তে ভারতীয় কারাগার থেকে মুক্ত করে নেয় তার অনুসারীরা। ১৯৯৯ সালে ছিনতাইকৃত ভারতীয় বিমানটি নিয়ে যাওয়া হয় আফগানিস্তানের কাবুলে। আফগানিস্তানে তখন কট্টর তালেবানি শাসন। এ থেকেই জইশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও মতাদর্শগত মিলের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০০১ সালে ভারতের পার্লামেন্টে ভয়াবহ হামলার পর পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে হয়। ওই হামলায় কাশ্মীরি গোষ্ঠীগুলোকে অভিযুক্ত করা হয়। চাপে ফেলতে ভারতের অভ্যন্তরে হামলাকে বিদ্রোহীরা গুরুত্ব দিলেও পরবর্তীকালে তাদের কার্যক্রম কাশ্মীরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

সোভিয়েত বাহিনীকে বিতাড়িত করার পর আফগানিস্তান থেকে বিদ্রোহীরা যখন কাশ্মীরে এসে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন পাকিস্তানই তাদের বাধা দেয়। অথচ সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান ও আরব যোদ্ধাদের সব রকমের সহযোগিতা করেছিল দেশটি। তখন জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতায়। বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদল হলেও কিছু কিছু ইস্যুতে নীতি বদলায়নি। দেশটির সেনা ও গোয়েন্দাদের হাতেই অনেক কিছুর কলকাঠি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে বিদ্রোহীদের লাগাম যে পাকিস্তান ছেড়ে দেবে না, তা বলা যায় না। এটিই সবচেয়ে বড় শঙ্কার কথা।

২০০১ সালের পর থেকে আফগান সীমান্তবর্তী ওয়াজিরিস্তান ও দেশের অভ্যন্তরে উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান, বড় রকমের ক্ষয়ক্ষতির শিকারও হতে হচ্ছে, সে অবস্থায় কেন তারা কাশ্মীরের বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করছে? এর সবটাই নিজেদের স্বার্থে, কাশ্মীরিদের স্বার্থে নয়। কোনো কোনো সময় বিদ্রোহীদের নিজেদের প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করছে পাকিস্তান। কাশ্মীর সীমান্তে কিছু অতি উত্সাহী পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার ভূমিকার সঙ্গে দেশটির সামগ্রিক নীতিকে মেলানো যাবে না। সীমান্তে দুই দেশের সেনাবাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা পেছনে কোনো এক পক্ষের অসতর্কতা বা অতি উত্সাহ থাকতে পারে। এ থেকে ‘পাকিস্তান কাশ্মীরের স্বাধীনতা চায়’ এ কথা বলা বোকামি হবে, কারণ এমন  গোলাগুলি তারা আফগান ও ইরান সীমান্তেও করে। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে, কাশ্মীরে এমনটা হলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যাবে। পাকিস্তানি সেনারা ভারতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিশোধ নিতে বিদ্রোহীদেরও লেলিয়ে দিতে পারে।

কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান ঘোলাটে। তাদের রহস্যময় ভূমিকার কারণে পাকিস্তানঘেঁষা বিদ্রোহী সংগঠনগুলো থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা বেরিয়ে গেছেন। এসব নেতার অভিযোগ—পাকিস্তান আদতে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চায় না, তারা সংকটের সুযোগ নিতে চায়। দলছুট বিদ্রোহীরা এ-ও বলেছে, পাকিস্তান অস্ত্র দেবে; কিন্তু শর্ত হলো তাদের অনুমতি ছাড়া বিদ্রোহীরা কিছু করতে পারবে না!

বাস্তবতা হচ্ছে—কাশ্মীর ভারতের কাছ থেকে এখন যেমন আচরণ পাচ্ছে, স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের কাছ থেকে তেমনটাই পাবে। অর্থাত্ এক পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে আরেক পরাধীনতা!

কাশ্মীর স্বাধীন হলে পাকিস্তান সরকারেরও বিপদ আছে! এমনটি হলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বাড়বে। বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। ওদিকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিদেশি বাহিনী প্রত্যাহারের কথাবার্তা চলছে। তারা চলে গেলে তখন তালেবানদের হয়ে লড়াই করা  বেশির ভাগ বিদেশি যোদ্ধা কাশ্মীরমুখী হবে। আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরের সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলো তো আছেই। পাকিস্তান তাদের বাধা দিলে পরিস্থিতি আরো অশান্ত হবে, যেমনটা ২০০৪ সালে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনজায়ায় হয়েছিল। পাকিস্তানের আফগাননীতি ও উগ্রবাদবিরোধী দমন-পীড়নের বিপরীতে ওই অঞ্চলের কট্টরপন্থীরা একজোট হয়ে পাকিস্তানের হুকুমতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেয়, একই সঙ্গে নিজেদের অধিকৃত ভূখণ্ডে শরিয়া শাসনের ঘোষণা দেয়। এ ঘটনার পর দেশটিতে তেহরিকে তালেবানের জন্ম।  সেই ক্ষত পাকিস্তান বয়ে বেড়াচ্ছে, সংঘাত এখনো চলছে।

 

ভারতবিরোধী ক্ষোভ দানা বাঁধছে

জনপ্রিয় কমান্ডার বোরহান ওয়ানির নিহতের পর কাশ্মীরে এমন সব পরিবর্তন দেখা গেছে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। তরুণদের মধ্যে ভারতবিরোধী ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। বিদ্রোহীদের দল ভারী হচ্ছে। কোনো বিদ্রোহী মারা গেলে তার জানাজাকে ঘিরে গোটা কাশ্মীর উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি তরুণদের মনেও প্রভাব ফেলছে। যারা আগে ‘কাশ্মীর বনেগা পাকিস্তান’ স্লোগান দিত, তারা আজ ‘কাশ্মীর বনেগা দারুল ইসলাম’ বলছে। পাকিস্তানি পতাকার বদলে ধর্মীয় পতাকা ওড়াচ্ছে।

কিছু দিন আগে বিবিসির সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে কাশ্মীরের কয়েকজন বলেছে—দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, এখন স্বাধীনতা ছাড়া তারা আর কিছু ভাবছে না, নিজেরা অস্ত্র হাতে তুলে নেবে, সন্তানদেরও অস্ত্র তুলে দেবে।

৩৭০ ধারা রদের পরে শুক্রবার সীমিত সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করার পর কাশ্মীরে ভয়াবহ বিক্ষোভ হয়। তাই ঈদের মধ্যেও অনেক জায়গায় কারফিউ শিথিল করার সাহস করেনি ভারত।   

 

উত্তাপ ছড়াবে আশপাশে

বিশেষ সুবিধা বাতিলের পর কাশ্মীরে বিভিন্ন দল-মতের রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ এক কাতারে চলে এসেছে। যারা এত দিন ভারতের অধীনে থাকার পক্ষে ছিল, তারাও বুঝে গেছে—ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আশা-ভরসা নেই। এখন একটাই পথ—স্বাধীনতা। ভারতের বিরুদ্ধে জনরোষ চরমে উঠেছে। অনেকেই প্রতিবাদ হিসেবে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি অনেকটাই সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তের অবস্থার মতো।

এদিকে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ও স্থানীয় শিখ নেতারা কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে মুখ খুলেছেন। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে মণিপুর রাজ্যে কয়েক হাজার লোক নাগা পতাকা উড়িয়ে নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল, মিজোরাম, আসাম নিয়ে নাগা স্বাধীন ভূমি গড়ার দাবি তুলেছে। এ দাবি নতুন নয়, তবে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন পরিস্থিতি তৈরি হবে। কাশ্মীর স্বাধীন হওয়া মানে কিন্তু এসব অঞ্চলেও স্বাধীনতার সূচনা!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা