kalerkantho

বরিস জনসন

তাঁরও কি সময় ঘনিয়ে এলো?

তামান্না মিনহাজ   

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তাঁরও কি সময় ঘনিয়ে এলো?

ব্রেক্সিট ইস্যু নিয়ে জেরবার যুক্তরাজ্য। গত তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদে পরিবর্তন এসেছে তিনবার। তিন মেজাজের তিন ব্যক্তিত্বের তিনজন মানুষ চেয়ারে বসেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসও পার হয়নি, এর মধ্যেই বিভিন্ন ইস্যুতে চাপের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। অবস্থাটা এমন যে—সহসাই উতরিয়ে উঠবেন, এমনটাও মনে হচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে তাঁরও কি সময় হয়ে এলো? একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের একত্রে থাকা নিয়েও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কারণ যে কঠোর অবস্থান নিয়ে ব্রেক্সিট কার্যকরের কথা জনসন বলছেন তা অনেকেরই মনঃপূত নয়। ফলে স্কটল্যান্ড বা আয়ারল্যান্ডের মতো অংশগুলো কঠোর ব্রেক্সিটের চাপে যুক্তরাজ্য থেকে ছিটকে বের হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বরিস জনসন বাউন্ডুলেপনা আর হাস্যরস সৃষ্টির জন্য অধিক পরিচিত।

গত ২৩ জুলাই এই অস্থিরমতি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং লন্ডনের মেয়রের হাতেই দেশের দায়িত্ব তুলে দেয় ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি। এ রকম একজন মানুষের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার পর দলের ভাগ্যে কী ঘটবে, ব্রেক্সিটই বা কতখানি গতি পাবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না রাজনীতিকরা। যদিও জনসন এসেই ঘোষণা দিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ব্রেক্সিট সম্পন্ন করবেন তিনি; তা যে প্রকারেই হোক না কেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রেক্সিটের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছে। এর আগেও তারা দুই দফা সময় বাড়িয়েছিল। তবে সেই সময়ের মধ্যে জনসনের পূর্বসূরি টেরেসা মে নিয়ম মেনে, পার্লামেন্টকে তাঁর ইইউর সঙ্গে করা চুক্তি মানিয়ে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করতে সক্ষম হননি। মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে ব্যাকস্টপের (আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে) চুক্তিটির একটি শর্ত।

টেরেসা মের সেই ব্যর্থতাকেই এবার সাফল্যে পর্যবাসিত করতে চান জনসন। তবে তাঁর অবস্থানটি হচ্ছে, টেরেসা মের আনা চুক্তিটি থাক বা না থাক, তিনি ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইইউ থেকে বের হয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্রে নতুন চুক্তিতে আগ্রহী জনসন। যদিও ইইউ আর নতুন করে আলোচনায় আগ্রহী নয়। এমন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করেছেন জনসন। আর কাজ শুরু করার পরপরই নতুন এক জটিলতার মধ্যে পড়ে গেছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের ওয়েলস রাজ্যের উপনির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির পরাজয়ের পর জনসনের প্রধানমন্ত্রিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে। ১ আগস্ট উপনির্বাচনে তাঁর দল লিবারেল ডেমোক্রেটিকের কাছে হেরে গেছে। ফলে পার্লামেন্টে জনসনের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকছে মাত্র একটি আসনের ব্যবধানে। আর কোনো নির্বাচন হলে তাঁর দল পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে, একই সঙ্গে হুমকিতে পড়তে পারে তাঁর ব্রেক্সিট নীতি।

ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ তথা ব্রেক্সিট ইস্যুতে সব ধরনের রাজনৈতিক সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন জনসন। এখন তাঁর দল যদি আর কোনো নির্বাচনে পরাজিত হয় কিংবা তাঁর সঙ্গে মতানৈক্যের জেরে কেউ দল ছেড়ে যান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের মতো তাঁকেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে হবে। আর পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে মেয়াদ পূর্তির আগেই তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর ঝুঁকি দেখা দেবে।

প্রধানমন্ত্রিত্ব খোয়ানোর ঝুঁকির পেছনে আছে জনসনের কট্টর ব্রেক্সিট নীতি। চুক্তি ছাড়াই ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর জেদ।

পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর জেরে তিনি যদি ব্রেক্সিট অঙ্গীকার পূরণ করতে না পারেন, তবে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন যে সুতায় ঝুলে আছে, সেটা ছিঁড়ে যাবে বলে পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা। এমনিতেই পার্লামেন্টে বিভিন্ন দলের সদস্যদের মধ্যে নানা ইস্যুতে মতবিরোধ থাকলেও একটা বিষয়ে তাঁরা একমত—ইইউর সঙ্গে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট তাঁরা চান না। পার্লামেন্ট সদস্যদের এমন অবস্থান সত্ত্বেও জনসন যদি ইইউর সঙ্গে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট নিশ্চিত করে ফেলেন, তবে ব্রিটিশ সরকারের ইতিহাসে এটা এক নজির হয়ে থাকবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৬৫০ আসনবিশিষ্ট নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে খোদ কনজারভেটিভ সদস্যদের মধ্যে ব্রেক্সিট ইস্যুতে চরম মতবিভেদ আছে।

পার্লামেন্টের বাধা পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রী জনসন ব্রেক্সিট নিশ্চিত করে ফেললে সংকট শুরু হতে পারে স্কটল্যান্ড ইস্যুতে। বেশির ভাগ স্কটিশ ইউরোপীয় জোটে থাকার পক্ষে। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট-সংক্রান্ত গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দেয়। ব্রেক্সিট কার্যকর হলে স্কটিশরা স্বাধীনতার দাবি তুলতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট কার্যকর হলে আয়ারল্যান্ড ইস্যুতেও সংকট তীব্র হবে। স্বাধীন আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত উত্তর আয়ারল্যান্ডের মধ্যবর্তী সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করা হতে পারে, যদিও উভয় ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই এর ঘোর বিরোধী। গৃহযুদ্ধের জেরে তিন দশক আগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া দুই আয়ারল্যান্ডের পুনর্মিলনের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে। ফলে এমন আলোচনার জন্মও হয়েছে যে যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত এক থাকতে পারবে, নাকি টুকরো হয়ে যাবে। ব্রেক্সিট বিভক্তির জেরে যদি যুক্তরাজ্য ভেঙেই যায়, তবে জনসন হতে যাচ্ছেন এখন পর্যন্ত অবিভক্ত এই ভূখণ্ডের শেষ প্রধানমন্ত্রী।

স্কটল্যান্ড সফরকালে জনসনকে দূরছাই করেছে ইইউপন্থী ও স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থীরা। খোদ স্বাধীনতাপন্থী স্কটিশ ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টার্জন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, স্কটিশদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস প্রধানমন্ত্রী জনসনের নেই।

ওয়েলস সফরকালেও সমালোচিত হয়েছেন কনজারভেটিভ নেতা জনসন। কারণ ইইউর সঙ্গে কোনো চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট কার্যকর করা হলে যুক্তরাজ্য যে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, সেটা সামাল দেওয়ার মতো জুতসই কোনো পরিকল্পনা জনসনের নেই।

ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার মার্ক ডার্কফিল্ডের মতে, ব্রেক্সিট বিপর্যয় সামাল দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশদ পরিকল্পনা না থাকাটা ‘গভীর উদ্বেগের বিষয়’।

উত্তর আয়ারল্যান্ডেও সমাদৃত নন জনসন। কারণ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তিনি যখন প্রচারকাজে ব্যস্ত ছিলেন, তখন বরাবরের মতোই উত্তর আয়ারল্যান্ডের শান্তিপ্রক্রিয়ার প্রতি রুক্ষ মনোভাব দেখিয়েছেন।

এবার আসা যাক ইংল্যান্ডের প্রসঙ্গে। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিষয়ক অধ্যাপক রব ফোর্ড বলেন, ‘ইতিহাসবিদরা যদি চুক্তিবিহীন (ব্রেক্সিট) পরিস্থিতিকে যুক্তরাজ্য ভাঙনের কারণ হিসেবে দেখেন, তবে আমি তাতে মোটেই বিস্মিত হব না।’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, ব্রেক্সিটের সবচেয়ে জোরালো সমর্থক হলো ইংরেজ জাতীয়তাবাদী ভোটাররা। যুক্তরাজ্যের ঐক্য নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। বেক্সিটপন্থী ইংল্যান্ডবাসীর কাছে তারা নিজেরা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য