kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

ধাপে ধাপে চলছে শান্তি আলোচনা

আমেরিকার শর্ত মানবে তালেবান?

তারেক হাবিব   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমেরিকার শর্ত মানবে তালেবান?

কাতারের রাজধানী দোহায় আমেরিকা ও তালেবান প্রতিনিধিদের মধ্যকার শান্তি আলোচনার পঞ্চম পর্ব দুই সপ্তাহ ধরে চলছে। আলোচনায় দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বিদেশি বাহিনী (ন্যাটো) পুরোপুরি প্রত্যাহার আর আফগানিস্তানের ভূখণ্ড আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে (কোনো দেশের বিরুদ্ধে) ব্যবহার করতে না দেওয়া। ভবিষ্যত্ আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি ‘খসড়া রূপরেখা’ সামনে রেখেই আলোচনা এগোচ্ছে। উভয় পক্ষের বরাত দিয়ে আলজাজিরায় বলা হয়েছে, আলোচনার মূল বিষয়ে উভয় পক্ষই মোটামুটি রাজি। তবে আলোচনার বিস্তারিত নিয়ে কোনো পক্ষই মুখ খোলেনি। সত্যিই যদি তালেবানরা কাটছাঁট ছাড়াই আমেরিকার সব শর্ত মেনে নিত, তাহলে আলোচনা এত দূর গড়াত না। আর বাহ্যিকভাবে তারা যদি রাজি হয়ও, বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ থেকে যাবে। তালেবানদের পুরনো ইতিহাস ও কিছু কিছু ঘটনাকে একত্র করলে বিষয়টি আন্দাজ করা যাবে।

প্রায় দেড় যুগ আগে আমেরিকা যাদের নির্মূলের জন্য আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে এসেছে, আজ তাদের কাছেই ‘শর্ত সাপেক্ষে’ ক্ষমতা ছেড়ে সসম্মানে দেশে ফেরার কথা ভাবছে! একসময় যাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে পাকড়াওয়ের হুমকি দেওয়া হয়েছে, আজ তাদেরকেই ‘রাজনৈতিক শক্তি’ বলে আলোচনার টেবিলে ডাকা হচ্ছে। এমনকি শান্তি আলোচনায় গতি ফেরাতে গত অক্টোবরে গুয়ানতানামো কারাগার থেকে প্রভাবশালী তালেবান নেতা মোল্লা আব্দুল গনি বারাদারকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিনিই এখন কাতারে তালেবানদের ডিপ্লোমেটিক অফিসের প্রধান।

বৈশ্বিক যুদ্ধবিষয়ক বিশ্লেষক এবং লং ওয়ার জার্নালের সিনিয়র এডিটর থমাস জোসেলিন গত অক্টোবরে (২০১৮) খোলামেলাভাবেই বলেছেন, ‘আফগান যুদ্ধ শেষ, আমরা হেরে গেছি।’ ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনায় শান্তি ফিরবে না’ বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

আমেরিকা মূলত চাচ্ছে, আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলো যাতে কোনোভাবেই আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে।

টুইন টাওয়ারে হামলার পর আমেরিকার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ তালেবানপ্রধান মোল্লা ওমরকে দুটি অপশন দিয়েছিলেন : ১. মূল অভিযুক্ত আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে (নিজ দেশ সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত হয়ে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেন) আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া।

২. যুদ্ধ, ক্ষমতাচ্যুতি ও হত্যার হুমকি। লাদেনকে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে যুদ্ধকেই পছন্দ করলেন তালেবানপ্রধান। কঠিন সময়েও লাদেন ও তাঁর অনুসারীদের ছাড়েনি তালেবানরা। আর এখন যখন আফগানিস্তানের বেশির ভাগ ভূখণ্ড তালেবানদের দখলে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিজেরা শক্তিশালী, দৃশ্যত জয়ের কাছাকাছি; ঠিক এই মুহূর্তে এসে আমেরিকার কথায় তাদের পুরনো ও ঘনিষ্ঠ মিত্র আল-কায়েদাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করবে? তালেবানদের আধুনিক, যুগোপযোগী ও মারকুটে বাহিনীতে পরিণত করার পেছনে আল-কায়েদার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। আল-কায়েদা থেকে বেরিয়ে গিয়ে ২০১৪ সালে ‘খিলাফত’ ঘোষণা করে কট্টরপন্থী জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করায় আল-কায়েদা ও তালেবানদের সঙ্গে আইএসের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। আফগানিস্তানে আইএসের উপস্থিতি সীমিত হলেও তাদের সঙ্গে তালেবানদের বড় ধরনের সংঘর্ষ-হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তাই বলা যায়, আইএস দমনে রাজি হলেও আল-কায়েদার পক্ষ ছাড়বে না তালেবান! বর্তমানে আইএস নিজেদের দাবীকৃত খিলাফতের কেন্দ্র ইরাক ও সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে। অন্যদিকে অল্পসংখ্যক আরব সদস্যের সংগঠন আল-কায়েদা গত ১৮ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর সংগঠনে পরিণত হয়েছে। সোমালিয়া, মালি, ইয়েমেনে বিশাল ভূখণ্ড তাদের দখলে। আর তাদের মূল কেন্দ্র আফগানিস্তান ও আশপাশের সীমান্তবর্তী এলাকা।

আমেরিকা যাদের হুমকি মোকাবেলায় আফগানিস্তান এসেছিল; তারা এখন শুধু আমেরিকা নয়, মিত্র ও সমমনা দেশগুলোর জন্যও হুমকি। রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান পর্যন্ত তালেবানদের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে সায় দিয়েছে। কারণ আঞ্চলিক শান্তি অনেকটাই তালেবানদের ওপর নির্ভর করছে। আফগানিস্তানকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সশস্ত্র সংগঠনগুলো ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব সংগঠনকে নিজ নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত করার অভিযোগ আছে আল-কায়েদার বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় তালেবানরা আল-কায়েদাকে তাড়াতে রাজি না হলে বা তাদের ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকলে শান্তিপ্রক্রিয়া কোনো কাজে দেবে না। তাদের রাজি করানোরই বা উপায় কী? একরোখা তালেবানদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের কার্যকর উপায়ও সম্ভবত জানা নেই আমেরিকার। তালেবানদের বিরুদ্ধে স্থানীয় (আফগান) কোনো নেতার ওপরও ভরসা করতে পারছে না আমেরিকা।

সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে (১৯৭৯-১৯৮৯) রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধবাজ নেতাদের সমর্থন দিয়েছিল আমেরিকা ও পাকিস্তান। ১৯৯৪ সালে সংগঠিত হওয়া তালেবানরা সেসব যুদ্ধবাজ নেতাকে হটিয়ে মাত্র দুই বছরেই প্রায় গোটা দেশ দখলে নেয়। সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আহমদ শাহ মাসুদ (সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট), বোরহান উদ্দিন রব্বানীর (সাবেক প্রেসিডেন্ট) মতো বেশ কিছু আমেরিকাপন্থী নেতাকে তারা হত্যা করে। এদিকে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকারের অবস্থাও নড়বড়ে। যুদ্ধের খরচের জোগান দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শেষ করতেই ‘শান্তি প্রক্রিয়া’কে সামনে নিয়ে আসে আমেরিকা।

মন্তব্য