kalerkantho

রবিবার । ২৫ আগস্ট ২০১৯। ১০ ভাদ্র ১৪২৬। ২৩ জিলহজ ১৪৪০

বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০

আরাফাত শাহরিয়ার   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০

ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় (এনইসি) ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ অনুমোদন হলো ৪ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্টরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করে দেশকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই এই ডেল্টা প্ল্যান। প্রকল্পটির মূল প্রতিপাদ্য জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো।

 

কেন এই পরিকল্পনা

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন— বন্যা, নদীভাঙন, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় আমাদের নিত্যসঙ্গী। ভূমি ক্ষয় বড় সমস্যা। নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তো রয়েছেই। মানবসৃষ্ট নানা কারণে প্রাকৃতিক পানিচক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে পানির গুণগত মান ও প্রাপ্যতা। বাড়ছে লবণাক্ততা ও মিঠা পানির স্বল্পতা। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বন্যা, খরা, সাইক্লোনের ঝুঁকি বাড়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করাও দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মত্স্য, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প, বনায়নসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনায় রেখে এই সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। উত্পাদন শক্তি না কমিয়ে কৃষিজমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, শহরাঞ্চলে সুপেয় পানি নিশ্চিত করা, বর্জ্য ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আছে বদ্বীপ পরিকল্পনায়।

 

গুরুত্ব পাবে ছয় অঞ্চল

বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশের অঞ্চলগুলোকে ভাগ করা হয়েছে ছয়টি অঞ্চলে। এগুলো হচ্ছে—উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং নগরাঞ্চল। একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন জেলাগুলো থাকছে একেকটি গ্রুপের আওতায়। এসব হটস্পটে চিহ্নিত করা হয়েছে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ। বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির মাত্রা।

 

ডেল্টা তহবিল ও কমিশন

বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ‘ডেল্টা তহবিল’। তহবিলের সম্ভাব্য উত্স বাংলাদেশ সরকার, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কিত তহবিল। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিকেও (পিপিপি) বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ‘ডেল্টা কমিশন’। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৭৮২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপির ২.৫ শতাংশ পরিমাণ অর্থায়ন দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

 

নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা

নেদারল্যান্ডসের ডেল্টা ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ প্রণয়ন করা হয়েছে। তিন বছর আগে এই পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে সরকার। এতে সহায়তা করেছে নেদারল্যান্ডস। পরিকল্পনা তৈরির জন্য ৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অনুদানও দিয়েছে দেশটি। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

 

নদীভিত্তিক পরিকল্পনা

নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি, জনজীবন, চাষাবাদ অনেকটাই নদীনির্ভর। তাই বলা হয়, নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। কিন্তু বহু নদী এরই মধ্যে মরে গেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। ভারত অংশে নদীগুলোর পানি প্রবাহের গতিরোধ করা হলে বাংলাদেশ অংশে পানি প্রবাহ কমে যায়। চাষাবাদ ব্যাহত হয়। আবার বর্ষায় পানির ঢল নামে ভারতীয় অঞ্চল থেকে। অতি বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফসলের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অভিন্ন নদীগুলোর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানি সংকটের সমাধান জরুরি হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় বদ্বীপ বাংলাদেশ। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি হয় প্রতিবছরই। বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত হয় দেশের বৃহত্ অঞ্চল। আবার গ্রীষ্মে দেখা দেয় খরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ক্ষতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ ও পন্থা বদ্বীপ পরিকল্পনা।

 

মূল লক্ষ্য উন্নয়ন

দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়ন করা হবে। বদ্বীপ পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, বন্যা, নদীভাঙন, নদী শাসন, নাব্যতা রক্ষাসহ সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা যাচাই-বাছাই শেষে প্রথম পর্যায়ে ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি ভৌত অবকাঠামোসংক্রান্ত। বাকি ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণাবিষয়ক প্রকল্প। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বদ্বীপ পরিকল্পনা হবে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা—এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মন্তব্য