kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

যেভাবে চাকরি পেলাম

স্কুলবেলা থেকেই নোট করার অভ্যাস ছিল

জুতসই একটি চাকরি বগলদাবা করা সহজ কর্ম নয়। রায়হান রহমানকে চাকরি পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন ১১তম জুডিশিয়ারি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী রিমি সাহা

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্কুলবেলা থেকেই নোট

করার অভ্যাস ছিল

পরিবারের সবাই চেয়েছিল ডাক্তার হই। আমার ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। শেষ পর্যন্ত আমার ইচ্ছারই জয় হয়েছিল। যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসির পাস করার পরে সুযোগ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। বিষয় নির্বাচনের সময় মনে হয়েছিল, আইন নিয়ে পড়লে ভালো করতে পারব। মেধাক্রমে এগিয়ে ছিলাম। ভর্তি হলাম আইন বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ম্যাডাম একদিন ক্লাসে বললেন, ভবিষ্যতে তোমরা যা হতে চাও সাদা কাগজে লিখে দাও। আমি লিখেছিলাম, জজ হবো। তখন থেকেই স্বপ্নের শুরু। তারপর থেকেই জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলাম। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতাম। এতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে আমার অনেক চর্চা হতো। এটি জুডিশিয়ারির এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষায় বেশ কাজে দিয়েছে।

জুডিশিয়ারির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বসেই প্রস্তুতি নিয়েছি। মাঝেমধ্যে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে যেতাম, বন্ধুরা মিলে পড়তাম। স্কুলবেলা থেকেই নোট করার অভ্যাস ছিল। সব বিষয়ে নোট করতাম নিজের মতো করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও এই অভ্যাসটা রয়ে গেছে। প্রথম বর্ষ থেকেই আইনের বিষয়গুলো নোট করা শুরু করেছিলাম। আইনের ধারা পড়ে যা বুঝতাম তাই লিখে রাখতাম। লেখার পরে খুঁজতাম ধারাসংশ্লিষ্ট মামলা (কেইস রেফারেন্স) আছে কি না? পেলে তাও টুকে রাখতাম। এতে পড়ার সময় অনেক সুবিধা হতো, ধারা ও মামলা উভয়ই একসঙ্গে পেতাম। এতে দ্রুত পড়া হতো। একই বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের বই পড়তাম। পত্রপত্রিকায় আইন বিষয়ে লেখা কলাম চোখে পড়লেই পড়তাম। এ ছাড়া শিল্প-সাহিত্য নিয়ে প্রচুর বই পড়া হতো। এটি কাজে দিয়েছে জুডিশিয়ারির ভাইভা পরীক্ষায়।

জুডিশিয়ারি পরীক্ষা মূলত তিন ধাপে নেওয়া হয়। প্রিলি, লিখিত ও ভাইভা। প্রিলিতে পাস করলেই হলো। মূলত লিখিত পরীক্ষায় শুরু হয় আসল প্রতিযোগিতা। উত্তীর্ণ হওয়ার পরে দিতে হয় ভাইভা পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই নোট করার কারণে অনার্স শেষ হওয়ার পরে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। পেনাল কোড, অস্ত্র আইন, স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টস, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, তামাদি আইন, সাক্ষ্য আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সম্পর্কে বেশ ভালো ধারনা ছিল। তবে খুব ভালো প্রস্তুতিই যে সাফল্য এনে দেবে এমনটিও নয়। তার প্রমাণ পেয়েছি দশম জুডিশিয়ারি পরীক্ষায়। খুব ভালো প্রস্তুতি নিয়েও লিখিত পরীক্ষার গণ্ডি পেরোতে পারিনি। তাই জুড়িশিয়ারির আশা প্রায় ছেড়েই ছিয়েছিলাম! কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বন্ধু, বড় ভাই-আপুদের অনুপ্রেরণায় ফের জুডিশিয়ারি পরীক্ষা দিই। দশম জুডিশিয়ারির ব্যর্থতা আমাকে আরো সচেতন করেছিল। ১১তম জুডিশিয়ারিতে তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষার জন্য আগেই প্রত্যেকটি প্রশ্নের নম্বর অনুসারে সময় ভাগ করে নিয়েছিলাম। লেখার আগে প্রশ্নে কি চাওয়া হয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করেছি। প্রশ্ন হাতে পেয়েই মনে মনে একটি গ্রাফ এেঁকছি—উত্তরে কোন কোন রেফারেন্স দেওয়া যাবে এবং কোন আইনের কোন ধারাটি লেখা যাবে। পরে বিশ্লেষণ করেছি নিজের মতো করে। উত্তরে ল্যাটিন টার্ম, বিশেষজ্ঞদের উক্তি উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, এই কারণেই হয়তো বেশি নম্বর পেয়েছি।

যথারীতি প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষায় টিকে ছিলাম আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। তার পরেও ভাইভা বলে কথা! ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। কেমন প্রশ্ন হবে আগবাড়িয়ে বলা যায় না। তাই প্রস্তুতিটা সারতে হয়েছে দিনরাত খেটেই। ভাইভা বোর্ডে ছিলেন বেশ কয়েকজন সদস্য। রুমে ঢুকে বসার পরেই আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২২ থেকে। জানতে চেয়েছিলেন, কোনো পক্ষের মৃত্যুতে মামলা করার অধিকার ক্ষুণ্ন্ন হয় কি না? কিন্তু উত্তরটা যে জুতসই দিতে পারিনি তা নিজেই বুঝেছিলাম। প্রথমেই এমন হোঁচট খেয়ে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবারও কিছু হবে না। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। পরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সম্প্রতি কোনো বই পড়েছি কি না? বলেছিলাম, রশিদ করীমের ‘উত্তম পুরুষ’ আর বুদ্ধদেব বসুর ‘তিথিডোর’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীকে নিয়েও প্রশ্ন করেছিলেন। পরে বিভিন্ন আইন নিয়ে শুরু হয়ে একের পর এক প্রশ্ন। ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, আর্মস অ্যাক্ট, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থঋণ আদালত আইন থেকে প্রশ্ন করেছিলেন। শেষের দিকে সব প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক এবং গুছিয়ে দিয়েছিলাম। পরে যখন ১১তম জুডিশিয়ারি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল দিল, দেখলাম আমি প্রথম হয়েছি। বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আনন্দে চোখে পানি এসেছিল।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা