kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

উদ্যোগ

মানুষের সেবায় ছিন্নমূল বাংলাদেশ

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা কিশোরদের সংগঠন ছিন্নমূল বাংলাদেশ। ব্লাড ডোনেশনসহ অন্যান্য সামাজিক কাজও করছে তারা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষের সেবায় ছিন্নমূল বাংলাদেশ

শুরুটা যেভাবে

২০১৬ সালের এক শুক্রবার। শ্যামপুর বহুমুখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণি পড়ুয়া নাইমুর রহমান জয়, বিল্লাল হোসেন, তসলিম উদ্দিন, আরমান হোসেন—এরা সবাই নাইমুরের বাসায় বসে গল্প করছিল। একপর্যায়ে নাইমুরের মা এসে বললেন, ‘সামিয়া নামে এলাকার আট বছরের একটি মেয়ে আগুনে পুড়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিত্সার জন্য টাকা চাইতে তার মা এসেছিলেন। তোমরা বন্ধুরা এত কিছু করো, পারলে এই মেয়েটার জন্য কিছু করো। কিছু টাকা উঠিয়ে দাও।’ কথাগুলো শুনে ওই দিন সবাই মিলে চিন্তা করে, কিছু করা যায় কি না। বিকেলে মেয়েটির মায়ের সঙ্গে দেখা করল তারা। ওর শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। চিকিত্সার জন্য ৫০ হাজার টাকা লাগবে। এত টাকার কথা শুনে সবাই একটু দমে যায়। তবে চিন্তা করল, যতটুকু পারে সাহায্য করবে। পরদিন ক্লাসে গিয়ে বললে বন্ধুরা যার কাছে যা ছিল দিল, স্যাররাও দিলেন। পরদিন এলাকার দোকানদারদের থেকেও কিছু টাকা সংগ্রহ করা হয়। শহিদুল নামে এলাকার এক ভাই একাই দেন পাঁচ হাজার টাকা। এভাবে মোটামুটি ১০ হাজার টাকার মতো ওঠে। তবে সামিয়াকে বাঁচানো যায়নি। পরদিনই মারা যায় মেয়েটি। সামিয়ার জন্য মনটা অনেক খারাপ হয়ে যায় তাদের। সিদ্ধান্ত নেয়, সমাজের অন্য যে অসহায় শিশুরা আছে তাদের নিয়ে কিছু করার। বিশেষ করে পথশিশু। এভাবেই শুরু হয় ‘ছিন্নমূল বাংলাদেশ’-এর যাত্রা। নাইমুর রহমান জয় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি, অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলো—বিল্লাল হোসেন, আইরিন নাহার, আরমান হোসেন, মো. সজল, তসলিম উদ্দিন, নাজমুস সাকি সৌরভ, শোয়েব রওনক রুদ্র, সালাহ উদ্দিন লাবলু।

 

এখন অনেক বড়

তাদের স্বপ্ন—দেশের প্রতিটি থানায় ছিন্নমূল বাংলাদেশ থাকবে। লক্ষ্য ছিল থানাভিত্তিক কাজ করার। এ জন্য একটি কেন্দ্রীয় কমিটি বানায়। এর অধীনে কদমতলী থানা কমিটি বানায়। সেখানে চলছে তাদের কার্যক্রম। তারপর বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানায় আরো একটি শাখা কমিটি করল। তখন ওখানে একটি প্রগ্রাম করে ২৫ জন মানুষকে চাল, ডাল, তেল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালীর চাটখিলে তারা দ্রুতই কাজ শুরু করবে। বর্তমানে দুটি থানা ও কেন্দ্রীয় কমিটি মিলে তাদের সদস্যসংখ্যা ২৫০ জন। প্রতিষ্ঠাতারা এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিলেও বেশির ভাগ সদস্য স্কুল-কলেজপড়ুয়া। আবার কোনো কোনো বড়ভাইও তাদের কাজে আগ্রহী হয়ে সংগঠনে যোগ দিয়েছেন বলে জানায় জয়। বর্তমানে সারা বছর চলতে থাকে ছিন্নমূল বাংলাদেশের ছোট ছোট নানা আয়োজন। 

 

যা যা করে

প্রতিবছর ঈদ আনন্দ নামে একটি প্রগ্রামের আয়োজন করা হয়। এতে দরিদ্র ও পথশিশুদের মধ্যে ঈদের নতুন পোশাক বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া এই প্রগ্রামের আওতায় বেশ কিছু দরিদ্র মানুষকে ঈদের দিন একবেলা ভালো খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। ২০১৭ সাল থেকে এই প্রগ্রাম চলে আসছে। এখন পর্যন্ত এর মাধ্যমে ৫৪০ জন শিশু বস্ত্র পেয়েছে এবং ১২০টি পরিবার ঈদের দিন খাবার পেয়েছে।

প্রতিবছর শীতে পালিত হয় প্রগ্রাম ‘শীতবস্ত্র’। এর মাধ্যমে অসহায় দরিদ্র মানুষকে শীতের পোশাক ও কম্বল বিতরণ করা হয়। ২০১৭ সাল থেকে এটি করে আসছে। সামনের শীতের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে এরই মধ্যে। ভালোবাসার বাংলাদেশ নামে প্রগ্রামটি ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে পালন করে থাকে। এদিন  অসহায় দরিদ্র শিশুদের ও এতিমদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। তাদের বিনোদনের সামগ্রী দেওয়া হয়। আরেকটি প্রগ্রাম হলো ‘সবার জন্য আলো’। এর আওতায় বরিশাল থেকে একজন মহিলাকে এনে চোখের ছানি অপারেশন করা হয়েছে। ফলে তাঁর স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে। এ বছর বসুন্ধরা আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগিতায় ঢাকার শ্যামপুরে এক হাজার ৩২৫ জন মানুষকে ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে। এতে ২৫  জন ডাক্তারের একটি টিম ও ‘ছিন্নমূল বাংলাদেশে’র স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করেছিলেন। কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমও সারা বছর চলতে থাকে। তাদের আরেকটি ভালো উদ্যোগ হলো অসুস্থদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া। বয়স কম হওয়ায় সংগঠনটির অনেকেই রক্ত দিতে পারে না। তবে বিভিন্ন মানুষ ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে রক্ত জোগাড় করে দেয় তারা। তাদের ব্লাড ডোনেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩৫৮ জন মানুষের জন্য রক্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া সারা বছরই যেসব এনজিও বাচ্চাদের ফ্রি পড়ায়, সেখানে শিশুদের বিভিন্ন বিনোদনের সামগ্রী দেয়।

 

ফান্ড ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা

‘সরকার থেকে বা কোনো এনজিও থেকে আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমাদের সদস্য ও তাদের পরিচিতজন থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাই। এর মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।’ জানাল ছিন্নমূল বাংলাদেশের সভাপতি নাইমুর রহমান জয়।

পথশিশুদের জন্য একটি অনাথ আশ্রম ও দুস্থ বৃদ্ধদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করার ইচ্ছা তাদের। যেখানে অসহায় মানুষের জন্য একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি হবে। তবে এর জন্য সমাজের বিত্তবানদের সাহায্য প্রয়োজন বলে জানায় জয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা