kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হামাচাংয়ের শিশুরা স্কুলে যায়

খাগড়াছড়ি সদরের দুর্গম হামাচাং এলাকায় ছিল না কোনো স্কুল। এলাকাবাসীর চেষ্টায় সেখানে গড়ে উঠেছে একটি বিদ্যালয়। হামাচাং গিয়ে শিশু, অভিভাবকসহ সবার সঙ্গে কথা বলে এসে লিখেছেন আবু দাউদ

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হামাচাংয়ের শিশুরা স্কুলে যায়

ত্রিপুরাদের ককবরক ভাষায় ‘হামাচাং’ অর্থ ‘সুন্দর মাটির জমি।’ আসলেই চারদিকে প্রকৃতির সবুজ চাদরে আবৃত অপরূপ এক পাহাড়ি গ্রাম ‘হামাচাং।’ দেখতে যতটা সুন্দর, শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে ততটাই পিছিয়ে। হামাচাং ও আশপাশের অন্তত ৯-১০টি গ্রামের শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ছিল অনেকটাই বঞ্চিত।

বেশির ভাগ শিশু অ, আ, ক, খ-ই শেখার সুযোগ পায়নি। হাতে গোনা কয়েকজন শিশু কষ্ট করে দূরবর্তী বড়গ্রাম ও কুকিছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেও বাকিদের সে সুযোগ হয়নি। অবশেষে গ্রামের কিছু শিক্ষানুরাগী জুমিয়া কৃষক ও উদ্যমী যুবক একটি বিদ্যালয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ‘হামাচাং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে নতুন স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়। এখন এর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭২ জন। সেই সঙ্গে স্কুলবিহীন গ্রামের তালিকা থেকে বাদ পড়ল আরেকটি গ্রাম।

প্রথম উদ্যোগ গ্রামবাসীর

হামাচাং, সাজেপাড়া, আমলাই হাদুক, রাস্তা হাদুক, তৈক্লা হাদুক, ছোটপাড়া, সিভিল হাদুক, কুকিছড়াসহ অনেক গ্রাম ছিল বিদ্যালয়বিহীন। আশপাশে পাঁচ-সাত কিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। আমলাই হাদুকপাড়ায় ব্র্যাক স্কুলটিতে শুধু শিশু শ্রেণির পড়াশোনা চললেও পরবর্তী ক্লাসে পড়া হতো না। তিন-চার বছর আগে কর্তৃপক্ষ ব্র্যাক স্কুলটি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এসব গ্রামের শিশুরা জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। গ্রামবাসীরা বুঝতে পারলেন, স্কুল গড়তে হবে নিজেদেরই। জুমচাষি পূর্ণ ভূষণ ত্রিপুরা, হজেন জ্যোতি ত্রিপুরা, ধনেশ্বর ত্রিপুরা, উমেষ, শ্যামল, ধনময়সহ অনেকে এগিয়ে আসেন। বারবার বৈঠক করেন তাঁরা। কিভাবে গ্রামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যায় তা নিয়ে চিন্তা শুরু হয়। গ্রামের জুমিয়াদের অনেকে জঙ্গল থেকে সাধ্যমতো শণ, বাঁশ, কাঠ সংগ্রহ করতে নেমে পড়েন। বিদ্যালয়ের জন্য জায়গা ঠিক করেন। কীর্তি রঞ্জন ত্রিপুরাসহ কয়েকজন কোনো অর্থ ছাড়াই জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি হন। ২৩৮ নম্বর মৌজার হেডম্যান শক্তিপদ ত্রিপুরাও স্কুলের জমি পাওয়ার বিষয়টিতে সাহায্য করেন। প্রায় দুই একর জমিতে সূচনা হয় স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজের।

ফেসবুক প্রচারণা

শুধু গ্রামের মানুষরাই নন, হামাচাংপাড়ায় বিদ্যালয় গড়ে তুলতে বিশেষভাবে এগিয়ে আসেন কিছু উদ্যমী তরুণ। তাদের মধ্যে জয়প্রকাশ ত্রিপুরা, সত্যপ্রিয় রোয়াজা, দহেন ত্রিপুরা উল্লেখযোগ্য। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, পরিমল ত্রিপুরারাও এগিয়ে আসেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেসবুক’ প্রচারণা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ফেসবুকে বিষয়টি জানতে পেরে সাহায্য করেন। হামাচাং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং স্কুল প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা জয়প্রকাশ ত্রিপুরা জানালেন, বলা যায় ফেসবুক প্রচারণা স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। স্কুল গড়ে তুলতে অনলাইন কালেকশনে দায়িত্ব পালন করেন সত্যপ্রিয় রোয়াজা।

 

এগিয়ে আসেন অনেকেই

শিশুদের স্কুলব্যাগ দেন প্রবাসী সুচরিতা ত্রিপুরা। শিক্ষার্থীদের পোশাক দিয়েছিলেন চন্দ্রা ত্রিপুরা।

স্কুল প্রতিষ্ঠায় অন্যতম ভূমিকা পালনকারী সত্যপ্রিয় রোয়াজা জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পেয়ে দুই ছেলের প্রেরণায় মনীন্দ্র কিশোর ত্রিপুরা একাই স্কুলের বেশির ভাগ ফার্নিচার (টুল, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল) দান করেন। ব্রজ কিশোর ত্রিপুরাসহ আরো কয়েকজন মিলে স্কুলের চালের টিন দেন। এ ছাড়া সাহায্য করেন আরো অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

 

সুচিতাদের পড়ার সুযোগ

সুচিতা ত্রিপুরার বাড়ি আমলাই হাদুকপাড়ায়। সে হামাচাং বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। বাবা জুমচাষি। জুমে উত্পাদিত ফসলে কোনো রকমে চার-পাঁচ মাস সংসার চললেও বাকি সময় একবেলা খেয়েই কাটে তাদের। অভাবী মা-বাবা তাকে স্কুলেই পাঠাতে চায়নি। আশপাশে কোনো বিদ্যালয়ও ছিল না। অভাব এতটাই যে কন্যাশিশুকে খাগড়াছড়িতে অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠিয়েছিল। কিন্তু এবার বাড়ির পাশে স্কুল হওয়ায় তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। তার আগে বড়পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। হামাচাংয়ের এক জুমচাষির কন্যা খমচাক ত্রিপুরা নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, ‘আমরা খুশি হইছে স্কুলে পড়তে  পেরে।’ তার বান্ধবী সাম্প্রীত ত্রিপুরাও বাড়ির কাছে স্কুল পেয়ে ভারি খুশি।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোরা মনি ত্রিপুরা জানান, এ বছরই হামাচাং বিদ্যালয় না হলে ইয়ালুং ত্রিপুরা, কমনি ত্রিপুরাদের স্কুলে যাওয়া হতো না। এলাকার অন্তত ২৫-২৬ জন শিশুকে এবার হামাচাং বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। পাড়ার মুরব্বি হিসেবে সম্মান পান হজেন জ্যোতি ত্রিপুরা। তিনি বললেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্কুল করার জন্য আমরা গ্রামবাসী অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে যে যার মতো করে স্কুল প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে নেমে পড়ি। সফলও হলাম। ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞ যে স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি।’ যাঁরা স্কুল গড়ে তুলতে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন, তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটি।

 

এখন চ্যালেঞ্জ

এখনো দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা ‘হামাচাং’ গ্রাম। গ্রামের মানুষের জীবিকা বলতেই জুমচাষ। কিছু পরিবার আছে, রাবার কষ সংগ্রহ করে উন্নয়ন বোর্ডে দিয়ে সামান্য  টাকা পায়। তা-ও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ফলে দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই চলে তাদের জীবন আর সংসার। খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কের দুই নম্বর রাবার বাগান প্রকল্প এলাকা দিয়ে প্রবেশ করতে হয় সেই গ্রামে। অভাবের তাড়নায় অনেকে তাদের শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে লাগিয়ে দেন। এমন পরিস্থিতিতে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হওয়ায় খুব খুুশি গ্রামবাসী।

গোরা মনি ত্রিপুরা জানান, বর্তমানে চার কক্ষবিশিষ্ট একটি ঘরে শিশু থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করানো হচ্ছে। একটি শ্রেণিকক্ষেই দুটি টেবিল বসিয়ে অফিসকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তিনি জানান, সরকারি সহায়তা ছাড়া স্কুলটির শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে চারজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী স্বেচ্ছাশ্রমে স্কুলটিতে কাজ করছেন।

এদিকে স্কুল পরিচালনা কমিটির সম্পাদক জয়প্রকাশ ত্রিপুরা জানিয়েছেন, স্কুলটিকে ঘিরে তাঁদের স্বপ্ন অনেক। দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীরাও স্কুলে পড়তে আসে। আসা-যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। একটি আবাসিক হোস্টেল করার চিন্তাভাবনা চলছে। এ ক্ষেত্রেও সহায়তার প্রয়োজন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা