kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আবরারের জন্য শোক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) নিহত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ভালোলাগা, মন্দলাগা, মা-বাবা ও একমাত্র ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের কথা জেনেছেন তারিকুল হক তারিক

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আবরারের জন্য শোক

নিজের বাবাকে খুঁজে পেতাম

রোকেয়া খাতুন, মা

জন্মের পর নিজের বাবাকে দেখিনি। শুনেছি, আমার প্রথম ছেলে আবরার নাকি আমার বাবার মতোই দেখতে হয়েছে। এর পর থেকে সব সময় ওর মধ্যে নিজের বাবাকে খুঁজে পেতাম। ওর আচরণও ছিল বাবার মতোই। ও আমাকে কখনো কিছু বললে আমার মনে হতো বাবাই যেন বলছেন।

চার বছর আগে ওকে ঢাকায় পাঠিয়েছি। এরপর একবার বাদে প্রতিবার ও বাড়ি থেকে ঢাকা যাওয়ার সময় ওর জন্য চালের রুটি আর মুরগির মাংস রান্না করে দিয়েছি। জার্নি করে ক্লান্ত হয়ে পড়বে, ঢাকায় ফিরে হয়তো বাইরে গিয়ে খেতে চাইবে না—এ জন্যই রান্না করে দিতাম। নিজের তেমন কোনো পছন্দের খাবারের কথা বলত না সে। ওরা দুই ভাই-ই নুডলস পছন্দ করত। তবে ও আমার কাছে তেমন কোনো খাবারের আবদার করত না। কিন্তু এবার বাড়ি আসার পর আমি ওর জন্য ফ্রাইড রাইস রান্না করেছিলাম। ফ্রাইড রাইসের ভাত তো শক্ত হয়। আমার রান্না রাইসটা একটু নরম হয়ে গিয়েছিল। খেতে বসে ও তখন আমাকে বলল, ‘আম্মু, বিশ্বের সেরা ফ্রাইড রাইস হইছে!’ বলছিল আর হাসছিল। আমি বললাম, ‘এবারের মতো খাও, পরেরবার এলে সুন্দর করে রেঁধে দেব।’ সেদিনই সন্ধ্যায় ফালুদা বানিয়েছিলাম। ওর দাদা বাসায় গেলে দাদার সঙ্গে আইসক্রিম দিয়ে ফালুদা খেতে খেতে বলেছিল, ‘আম্মু, তুমি কাস্টার্ড বানাতে পারো না। আমাকে কাস্টার্ড করে খাওয়াবা?’ বলেছিলাম, ‘তুমি পরেরবার যখন আসবে, খাওয়াব।’ আমি কী করে বুঝব আমার ছেলে আর বেঁচে ফিরবে না। কী করে বুঝব আমার ছেলে লাশ হয়ে ফিরে আসবে! এবার যাওয়ার আগের রাতে আমরা চারজন একসঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করেছিলাম। ওকে বললাম, ‘আব্বু, তোমাকে কত টাকা দেব?’ জবাবে আবরার বলেছিল, ‘এখন নেব না; টাকা তুমি অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ো।’ আবার বললাম, ‘কত লাগবে বলো? তোমার কাছে কত আছে?’ তখন ও রসিকতা করে বলল, ‘আমার কাছে কত আছে তা তোমাকে কেন বলব?’ বললাম, ‘আমি টাকা পাঠাতে গেলেই তো জানতে পারব।’ ও তখন বলল, ‘আমার কি একটা অ্যাকাউন্ট? আমার দুটি অ্যাকাউন্ট।’ সকালে ওকে মাছ-ভাত খাইয়ে সাড়ে ৯টার বাসে তুলে দিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে হলে পৌঁছে ও আমাকে ফোন দিয়েছিল। বলেছিলাম, ‘আব্বু, আমি তোমাকে খাবার দিয়েছি, তুমি কাপড় ছেড়ে খাবারগুলো খেয়ে নাও।’ এই ছিল ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা।

 

হীরার টুকরা ছেলে

বরকত উল্লাহ, বাবা

এই আধুনিক যুগে আমার ছেলের মতো ছেলে লাখে একটা মেলা কঠিন। এত শান্তশিষ্ট, ভদ্র-বিনয়ী ছেলে আজকাল দেখা যায় না। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, আমি ও আমার পরিবার বুয়েটে তাদের ছাত্রত্ব বাতিলের দাবি জানাই। অন্যথায় আমার ছেলের আত্মা শান্তি পাবে না।

আবরারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। সেদিন ঢাকা যাওয়ার পর বিকেল ৪টার দিকে ওকে ফোন করেছিলাম। বলল, ‘বাবা, এইমাত্র আমি বাস থেকে কল্যাণপুর নামলাম।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, সাবধানে যাও।’ এই ছিল ওর সঙ্গে শেষ কথা।

সোনার টুকরা না, ও ছিল আমার হীরার টুকরা ছেলে। এই হীরার টুকরাটাকে যারা এভাবে নির্মম যন্ত্রণা দিয়ে মারল, তারা কত বড় পাষাণ? তাদের বুকটা কি একবারের জন্যও কেঁপে উঠল না? আমার ছেলেকে যারা নির্দয়ভাবে নির্যাতন করেছে, আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। এই শাস্তি দেখে আর কেউ যেন কখনো কোনো মা-বাবার বুক খালি করার সাহস না পায়।

 

ঢাকায় যাব না

আবরার ফায়াজ, ছোট ভাই

ভাইয়া নিজে আমাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমার ভালো-মন্দ সব কিছুর খোঁজ রাখতেন। আমাকে নিজে পড়াতেন। এত স্মৃতি নিয়ে আমি কী করে ওই ঢাকা শহরে আবার পড়তে যাব? তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি কুষ্টিয়ায়ই ভর্তি হব, ঢাকায় যাব না। ঢাকা যেতে ভয় পাচ্ছি, তা নয়। তবু বলা তো যায় না। যারা ভাইয়াকে মেরেছে, তারা অনেক শক্তিশালী। যদি তারা বা তাদের কেউ আমার ক্ষতি করে, সেই দুর্ভাবনা যে একেবারে নেই, তা না। আগে তো আমাকে দেখার জন্য ভাইয়া ছিলেন, এখন তিনি নেই। আমি একা। কার ভরসায় সেখানে যাব? আমি তো তার শুধু ছোট ভাই ছিলাম না। তিনি ছিলেন আমার বন্ধু ও অভিভাবক। মা-বাবার সঙ্গে যে বিষয়ে কথা বলতাম না, সেসব বিষয়েও আমরা একে অন্যের সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করতাম। ভাইয়া এবার যেদিন কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় যান, সেদিন সকালে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। মা আমাকে ডেকেছিলেন। কিন্তু আমি শুয়েই ছিলাম। ভাইয়া তখন বললেন, ‘তাড়াতাড়ি ঢাকায় চলে আয়।’ এটাই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা।

কেউ কথা বলেননি!

আবরারের সহপাঠী, রুমমেট, বন্ধু ও শিক্ষকদের কাছ থেকে তাঁর ক্যাম্পাসজীবনের স্মৃতি জানতে চেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা