kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আফসানা আফরীন

পড়ে যে রাঁধেও সে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আফসানা আফরীন। রান্নায় বেশ পটু। শিক্ষার্থীদের পছন্দের খাবার বাড়ি থেকে তৈরি করে এনে ক্যাম্পাসে বিক্রি করেন। সহপাঠী, সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষার্থী, এমনকি শিক্ষকদের কাছেও তাঁর খাবারের বেশ কদর। এভাবে তাঁর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার গল্প শোনাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পড়ে যে রাঁধেও সে

ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন, পরিবারের সবাই রাঁধুনি। বাবা, চাচা আর মামাদের কেউ কেউ বিদেশেও থাকতেন। যখনই দেশে আসতেন তাঁরা, বিদেশ থেকে শিখে আসা নতুন পদগুলো রাঁধতেন। আর দেশীয় খাবারগুলোর রান্না তো সব সময়ই হতো। তাই রান্না এবং রান্নায় এক্সপেরিমেন্ট করতে করতেই বেড়ে ওঠা আফসানার। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই পিঠা বানিয়ে চমকে দিয়েছিলেন মাকে। আফসানা বললেন, ‘মেয়েদের রান্নার হাতেখড়ি সাধারণত মায়ের কাছে হলেও আমার হয়েছিল বাবার কাছে।’

বললেন, ‘খাবারের শখ আর রুচি নিয়েই বড় হয়েছি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম রান্না করার শখও বেড়েছে। রান্নায় এক্সপেরিমেন্ট করতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে। নতুন কোনো পদ বানানোর চেষ্টা করতাম। তারপর সেটা বাসার সবাই মিলে খেতাম। এভাবেই রান্নায় ভালো অভিজ্ঞতা হতে থাকে আমার।’

স্কুল-কলেজের দিনগুলো এভাবেই গেছে আফসানার। বিভিন্ন পদ রেঁধে সেগুলোর ছবি তুলে রাখতেন। ফেসবুকে যুক্ত হওয়ার পর নিজের রান্নার ছবিগুলো আপলোড করতেন। অন্যদের দেখানোর জন্য নয় অবশ্য, নিজের ছবি তোলার হাত, নিজের রান্নার উন্নতিটা বোঝার জন্য। এই অভ্যাসটা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তাঁকে নতুন অভিজ্ঞতা দিল। ছবি দেখে বন্ধুরা কেউ আবদার করতেন খাওয়ার, কেউ করতেন অভিমান। হলে থাকা বন্ধুরা ওর খাবারের ছবি দেখে হয়তো নিজেদের বাসা মিস করতেন। তাই আফসানা ঠিক করলেন, সকালে ক্লাসে আসার সময় বন্ধুদের জন্য কিছু খাবার রেঁধে নিয়ে আসবেন। করলেনও তা-ই। কিন্তু বাধল বিপত্তি। কতজনকে খাওয়াতে পারবেন তিনি? তাই একসময় ভাবলেন, খাবারগুলো বিক্রি করলে মন্দ হয় না। তাতে বন্ধুদের আবদারের চাপও কমবে! কিন্তু তাতেও যদি বিড়ম্বনা হয়, কেউ কটু কথা শোনায়—এমন ভাবনায় খানিকটা দমে গেলেন তিনি।

এরই মধ্যে গত বছর দুটি রান্নার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ‘চুঁইঝাল কুক বুকে’ তাঁর অপরাজিতা চা আর চুঁইঝাল গরুর মাংসের রেসিপি ছাপা হয়; অন্যদিকে ‘কুক আপে’র ডেজার্ট গেমে জায়গা করে নেন সেরাদের কাতারে। সেখানে তাঁর বানানো মিষ্টি নিমকি পিঠা বেশ নাম করে।

ওদিকে বন্ধুদের আবদার আরো বাড়তে থাকলে খাবার বিক্রির আইডিয়াটি নতুন করে আবার ভাবলেন। এ বছরের ১৫ জুলাই ক্যাম্পাসে নিয়ে এলেন দুই বাক্স নবাবি সেমাই। তার আগে ফেসবুকে অবশ্য পোস্ট করেছিলেন। কিন্তু একটি বাক্সও বিক্রি হলো না। তাই বলে দমে যাননি তিনি। পরের সপ্তাহে আবার আনলেন। এবারে দুটিই বিক্রি হয়ে গেল। তবে বন্ধুরা এবার পরামর্শ দিলেন, বাক্সে না এনে ছোট কাপে আনলে তাঁদের কিনতে সুবিধা হয়। আফসানা তা-ই করলেন। পরের সপ্তাহে মুগ পাকন পিঠা আনলেন। বিভাগের সিনিয়র এক শিক্ষার্থী সেটি কিনে খেয়ে, মুগ্ধ হয়ে রিভিউও দিলেন ফেসবুকে।

এভাবে উৎসাহ বেড়ে গেল আফসানার। ফ্রোজেন আইটেম করার চিন্তা করলেন তিনি। নাগেটস, রুই মাছের টিকিয়া—এসব বানিয়ে আনলেন। কিন্তু বিক্রি হলো না! কারণ হলের ছেলেরা এসব রাঁধতে পারবেন না। আর মেয়েদের জন্যও ঝামেলার ব্যাপার হবে ফ্রিজে রাখতে হবে বলে।

এভাবে কোরবানির ঈদ গেল। ঈদের ছুটি থেকে ফিরে লাঞ্চ বক্স নিয়ে এলেন তিনি। দুটি আইটেম দিয়ে শুরু—কালাভুনা আর স্পাইসি চিকেন। এবার বেশ বিক্রি শুরু হলো। সপ্তাহে দুই দিন অর্ডার নিতেন। কোনো কোনোবার ২০টি পর্যন্ত অর্ডার পেয়েছেন। তারপর আনলেন রোস্ট পোলাও। আর ডেজার্ট হিসেবে শ্রীখান্দ। বিক্রির উন্নতি দেখে বেশ আটঘাট বেঁধে নামলেন তিনি। ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুললেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপগুলোতেও পোস্ট করলেন। তারপর এক ধাক্কায়ই অর্ডার বেড়ে সপ্তাহে ১০০-১৫০টায় দাঁড়াল। এর মধ্যে তাঁর তৈরি নবাবি সেমাই বেশ নাম করেছে। 

এখন শিক্ষকরাও আফসানার কাছ থেকে খাবার কিনে নেন। প্রশংসা করেন। সোশ্যাল সায়েন্স বিভাগের ডিন ড. সাদেকা হালিম একদিন আফসানাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি খাবারের মেন্যু ঠিক কোরো, আমরা তাহলে আর বাইরে থেকে খাবার কিনব না।’

আফসানা জানালেন, ‘রান্নার পুরো প্রক্রিয়ায় আমি নিজে থাকি। নিজে বাজার করি, রান্না করি, খাবার প্যাকিং করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসি। সোশ্যাল সায়েন্স বিভাগের সিঁড়িতে সেই খাবার নিয়ে বসি। যাঁরা আগের দিন অর্ডার করেন, তাঁরা সেখান থেকেই খাবার নিয়ে যান।’ এই রান্না থেকে সপ্তাহে এখন ৮-১০ হাজার টাকা উপার্জন হয় তাঁর।

‘অবসরের দিনলিপি’ (www.facebook.com/groups/51345372919 5123) নামের ফেসবুক গ্রুপটি আফসানার। সেখানে নিজের কাজগুলো পোস্ট করেন ও অর্ডার নেন তিনি।

আফসানা ঠিক করেছেন, পুজোর ছুটির পর ক্যাম্পাস খুললে সপ্তাহে পাঁচ দিনের মেন্যু তৈরি করবেন। এরই মধ্যে নতুন তিনজন রাঁধুনি সহকর্মী ও দুজন ডেলিভারিম্যান নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। রাঁধুনি তিনজনকে তিনি নিজেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আর পুরো প্রক্রিয়া রাখছেন নজরদারিতে।

এত কিছুর মধ্যেও ঠিকমতোই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন আফসানা। পরীক্ষা কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে সব কিছু ফেলে পড়াশোনায় মন দেন। তবে নিত্যনতুন রান্নায় মন তো সব সময়ই পড়ে থাকে তাঁর! এরই মধ্যে নিজে বিভিন্ন খাবারের ৪০টা রেসিপি বানিয়ে ফেলেছেন তিনি।

অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহজুরা বলছিলেন, ‘আফসানার খাবারের স্বাদের ব্যাপারে কোনো কথা বলার দরকার নাই! বিশেষ করে নবাবি সেমাই। এটা যে খায়নি, সে অনেক ভালো কিছু মিস করেছে জীবনে! তবে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে—লাঞ্চ বক্সগুলোতে দাম অনুযায়ী খাবারের মান ও পরিমাণ যথেষ্ট ভালো। সে পোস্ট দিলেই আমার মনে হয়, অর্ডার না করলে বড় কিছু মিস করব। তাই মানিব্যাগের অবস্থা যেমনই হোক, অর্ডার করতে দ্বিতীয়বার ভাবি না।’

আফসানার আরো গুণ

রান্না আর পড়াশোনা নয়, পরিবেশ নিয়েও কাজ করছেন আফসানা। বিভিন্ন প্লাস্টিকের বোতল রিসাইকেল করে তার মধ্যে গাছ লাগাচ্ছেন, বাগান করছেন। সেসব দিয়ে ঘর সাজিয়ে তুলছেন।

২০১৮ সালে ‘ডেইলি স্টার’ ও ‘ইয়ুথ অপরচুনিটি’র যৌথ আয়োজনে ‘বিট প্লাস্টিক পলিউশন’ প্রতিযোগিতায় নিজের প্লাস্টিক রিসাইকেল করা গাছগুলোর আইডিয়া জমা দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন আফসানা। এর পর থেকে সচেতনতামূলক কাজ শুরু করেছেন। এ কাজে ফেসবুকে তাঁর একটা গ্রুপ আছে—‘গ্রিন হোপার’ নামে। কিভাবে গাছের যত্নআত্তি করা যায়, প্লাস্টিকের বোতল না ফেলে পরিবেশবান্ধব কাজে লাগানো যায়—এসব নিয়ে সেই গ্রুপে লেখেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন জিনিস দিয়ে গয়নাও বানান আফসানা। কাঠ, শামুক, ঝিনুক, পুঁতির তৈরি নান্দনিক সেই গয়না নিজে পরেন, বিক্রিও করেন। ভবিষ্যতে আর্কিটেকচার নিয়ে পড়ার ইচ্ছা আছে আফসানার। এর পাশাপাশি একটি শেফ কোর্সও করতে চান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা