kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

মিরার গল্প

গণবিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন রোবট মিরা। মানবাকৃতির এই রোবট করতে পারে হ্যান্ডশেক, নাড়াতে পারে মাথা, শোনাতে পারে কৌতুক। মিরা তৈরির গল্প শোনাচ্ছেন মোহাম্মদ রনি খাঁ

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিরার গল্প

• চেয়ারে মিরা, পাশে এর ছয় কারিগর

একদিন ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুরা মিলে ইউটিউবে যন্ত্রাংশ তৈরির ভিডিও দেখছিলেন। দেখতে দেখতেই তাঁদের মাথায় পরিকল্পনা এলো। প্লাস্টিকের গুঁড়া তাপ দিয়ে গলিয়ে, ছাঁচে ঢেলে রোবটের যন্ত্রাংশ বানাবেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা গেলেন সাভারের নয়ারহাট ও ধামরাই বাজারের কয়েকটি স্বর্ণালংকারের দোকানে। কিনে আনলেন কিছু প্লাস্টিক মোম। তারপর রোবট তৈরির উদ্যোগ নিলেন গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থী। সেই রোবট এখন কথা বলতে পারে। দিতে পারে জটিল প্রশ্নের উত্তর। ভার্চুয়াল কাজে পারদর্শী এই রোবটের নাম ‘মোবাইল অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট রোবট ফর অ্যাডভান্সড অ্যাসিস্ট্যান্স (মিরা)’। তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার টাকা।

‘রোবট মিরা’ তৈরির দলনেতা মোহাম্মদ রিফাত। দলে আরো ছিলেন মাহতাবুর রহমান সবুজ, মাহমুদা আক্তার নিঝুম, মারুফ হোসেন, সাফিক হাসান ও শারমিন নাহার তোহফা। সিএসই বিভাগের প্রভাষক রোয়িনা আফরোজ অ্যানির অধীনে এ বছরেরই ২০ জুলাই রোবট তৈরির কাজ শুরু করেন তাঁরা।

মোহাম্মদ রিফাত বললেন, ‘জুলাই মাসের শেষ দিকে প্লাস্টিকের গুঁড়া আনতে গিয়েছিলাম ঢাকার চকবাজারে। কিন্তু কোন দোকানে পাওয়া যায়, জানা ছিল না। প্রযুক্তির সহায়তায় খুঁজতে শুরু করি। হুট করেই তুমুল বৃষ্টি নামে। ভিজে ভিজেই চলে খোঁজ। অনেক কষ্টে প্লাস্টিক ভাঙার ফ্যাক্টরি পেলেও সেখানকার লোকটি খুচরা বিক্রি করতে নারাজ। অনেক বুঝিয়ে তাঁকে রাজি করাতে পেরেছিলাম। কিন্তু তিনি ১০ কেজি প্লাস্টিকের দাম চাইলেন ১০ হাজার টাকা। সেখান থেকে নেওয়া হলো না। খানিকটা এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল প্লাস্টিকের হাজারো দোকান। সেখানকার এক দোকান থেকে ৪৩ টাকা কেজি ধরে কিনে আনলাম।’

এরপর বাধল আরেক বিড়ম্বনা। কিনে আনা প্লাস্টিক তো গলছে না! একসময় তাঁরা জানতে পারলেন, হার্ড অ্যাসিটোনের মধ্যে রাখলে প্লাস্টিক গলে যায়। অনেক খুঁজে অ্যাসিটোন সংগ্রহ করলেন তাঁরা। কিন্তু অ্যাসিটোন তো নিজেই প্লাস্টিকের বোতলে থাকে! এটা কিভাবে প্লাস্টিক গলাবে? একপর্যায়ে প্লাস্টিকের চিন্তা বাদ দিলেন। পিভিসি শিট দিয়ে শুরু করলেন কাজ।

সাভারের নিরিবিলি ফাগুনি হাউজিংয়ের একটি ল্যাবে আড়াই মাসের পরিশ্রম শেষে এখন একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে মানবাকৃতির রোবটটি। রিফাত বললেন, ‘এটি এখনো রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আরো অনেক দক্ষতা যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এখনই এটি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে এবং বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। এ ছাড়া ব্যবহারকারীর ই-মেইল পাঠানো, ফেসবুক নোটিফিকেশন দেখা, কারো পছন্দের গান বাজানো, নির্দিষ্ট কাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া, দৈনিক ও আগাম আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানিয়ে দেওয়া, সময় ও তারিখ জানানোসহ বিভিন্ন ধরনের ভার্চুয়াল কাজ করতে পারে।’

মাহতাবুর রহমান সবুজ বললেন, ‘রোবটটি শুধু ভার্চুয়াল কাজেই নয়, শারীরিক কাজেও দক্ষ। এটি আঙুল, কনুই, কাঁধ, ঘাড়, মাথাসহ বিভিন্ন অঙ্গ নাড়াতে পারে। হাই-ফাইভ অথবা হ্যান্ডশেক করা, কফির কাপ ধরে রাখা, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করাসহ আরো বেশ কিছু কাজে এটি পটু। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের গেম খেলতে এবং কৌতুক শোনাতেও পারে মিরা।’

রোবট মিরার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য মনে রেখে পরবর্তীকালে সে অনুযায়ী কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে। মাথা থেকে কোমরের ওপর পর্যন্ত তৈরি হয়েছে। এখনো পা বসানো হয়নি বলে মিরা হাঁটতে পারে না। রিফাত বললেন, ‘রোবট মিরা তৈরিতে আমরা জাভা, পাইথনসহ বিভিন্ন ধরনের প্রগ্রামিং কোড ব্যবহার করেছি। এ ছাড়া ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মার্কআপ ল্যাঙ্গুয়েজ (এআইএমএল) কোড এবং হার্ডওয়্যার কনফিগারেশনের জন্য ‘ডট কনফ (কনফিগারেশন) কোড’ ব্যবহার করেছি। সব মিলিয়ে কোডের দৈর্ঘ্য ১১-১২ হাজার লাইন। রোবটটি পোর্টেবল ও অটোমেটেড। এটি কোনো এক্সটারনাল কন্ট্রোল ছাড়াই কাজ করতে সক্ষম।’

রিফাত আরো বললেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম রাসবেরি পাই (সিঙ্গল বোর্ড মিনি কম্পিউটার) দিয়ে ওর ব্রেন বানাব। কিন্তু অনেক ধরনের ডাটা ও অ্যালগরিদম একসঙ্গে প্রয়োগ করে কাজ শুরুর পর খেয়াল করলাম, সিঙ্গল বোর্ড কম্পিউটার সব কিছু নির্ঝঞ্ঝাটভাবে সামলাতে পারে না; বরং ওভারলোড ও ওভার হিট হয়ে যায়।’ অন্যদিকে দলের আরেক সদস্য মারুফের কোর আই-৭ ল্যাপটপটি ব্রেন হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। তাই এ ক্ষেত্রে সেটিই ব্যবহার করেছেন তাঁরা।

মাহমুদা আক্তার নিঝুম বললেন, ‘আমাদের রোবটটি অনেকটা মানুষের আকৃতির। এ জন্য শুধু সিএসই বিষয়ে জ্ঞানই যথেষ্ট ছিল না। চিকিৎসাবিজ্ঞান, বিশেষ করে হিউম্যান অ্যানাটমি নিয়েও আমাদের পড়াশোনা করতে হয়েছে। এ ছাড়া মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েও ভাবতে হয়েছে। থ্রিডি প্রিন্টার না থাকায় বিকল্প উপায়ে রোবট মিরার স্ট্রাকচার তৈরি করেছি আমরা।’

মিরার আরেক কারিগর শারমিন নাহার তোহফা বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা রোবটটিতে বাংলা ভাষা যুক্ত করব। এ ছাড়া ফুল টিন সাইজ অ্যান্ড মুভেবল বডি তৈরি করা, টেলি প্রেজেন্স ক্যাপাবিলিটি যুক্ত করাসহ নানা পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’

মিরা প্রসঙ্গে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. করম নেওয়াজ বলেন, ‘এটি একটি অত্যাধুনিক রিসার্চ ওয়ার্ক। ছাত্র-ছাত্রীদের এই উদ্ভাবনে আমরা গর্বিত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা