kalerkantho

শখের মুদ্রা

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও শরিয়াহ অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। শখ থেকে একটু একটু করে মুদ্রা ও ডাকটিকিটের এক দারুণ সংগ্রহ ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন। তাঁর কথা জানাচ্ছেন অনি আতিকুর রহমান

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শখের মুদ্রা

সংগ্রহভাণ্ডার হাতে ওয়ালিউল্লাহ

একবার মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ছয়টি অস্ট্রেলিয়ান মুদ্রা (কয়েন) পেয়েছিলেন ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই। পরে ছোট ভাইকে সেগুলো উপহার দেন। সেই যে ছয়টি মুদ্রা এলো তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া ওয়ালির হাতে, সেই শুরু। মুদ্রা সংগ্রহের শখ পেয়ে বসল তাঁকে।

নতুন জগতের সন্ধান : ওয়ালি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন। খালার কাছ থেকে ভারত, পাকিস্তান আর ব্রিটেনের কিছু মুদ্রা এলো তাঁর হাতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হলো ‘বাংলাদেশ নিউমিসম্যাটিক কালেক্টর সোসাইটি’র সদস্য রবিউল ইসলামের সঙ্গে। তখনই তিনি মুদ্রা সংগ্রহের গুরুত্ব বুঝতে পারলেন। বিষয়টা আর শখের মধ্যে আটকে থাকল না।

প্রাচীন বাংলার ছাপাঙ্কিত মুদ্রা (খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক)

ক্রয়, বিনিময় ও উপহার : মূলত ক্রয়, বিনিময় ও উপহার পাওয়ার মাধ্যমেই মুদ্রা সংগ্রহ করেন তিনি। জানালেন, ‘পরিচিত ও আত্মীয়-স্বজন অনেকের কাছ থেকেই উপহার হিসেবে মুদ্রা পেয়েছি। আবার টাকা জমিয়ে কিনেছি, কখনো কখনো অন্যদের সঙ্গে করেছি বিনিময়ও।’ এখন তাঁর জন্মদিনে কাছের মানুষরা অন্য কিছু নয়; বরং তাঁকে মুদ্রা উপহার দিতেই পছন্দ করে। বিষয়টি খুব ভালো লাগে তাঁর, ‘মুদ্রার পেছনে ছুটতে ছুটতে আলাদা একটা জগতের দেখা পাই আমি। ঢাকা ও কলকাতার নিলাম ডাক; তাঁতি বাজারের স্বর্ণের দোকান—এসব জায়গা থেকেও অনেক মুদ্রা সংগ্রহ করেছি।’

আগ্রহ প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রায় : একটা সময় যা পেতেন, সেটাই সংগ্রহ করার অভ্যাস ছিল ওয়ালির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন চিনতে শিখলেন এই রাস্তার অলিগলি, তখন প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিলেন প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রা। নিজ শেকড় সম্পর্কে জানতেই তাঁর এই আগ্রহের সৃষ্টি।

৯৭ দেশের মুদ্রা : নিজ দেশের ‘এক পয়সা থেকে ৫ টাকা’ সব ধরনের মুদ্রা সংগ্রহে রয়েছে তাঁর। রয়েছে বিশেষ সময়ে প্রকাশিত ‘স্মারক নোট’। এ ছাড়া শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত কাগুজে নোটের সবই রেখেছেন নিজ সংগ্রহশালায়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার সব, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এবং ইউরোপ-আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোসহ মোট ৯৭ দেশের মুদ্রা রয়েছে তাঁর কাছে।

শখের কারণ : ছোটবেলায় না বুঝে সংগ্রহ শুরু করলেও পরিণত বয়সে এতেই পেয়েছেন তিনি ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অন্য রকম খোঁজ। ওয়ালি জানান, ‘একটি মুদ্রা থেকে সে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ঐতিহ্যের কথা জানা সম্ভব। প্রাচীন মুদ্রা দেখে বোঝা যায় সেটি কোন সময়ের, কোন শাসকের আমলের, সেই শাসক কেমন ছিলেন, সে সময় রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা কী ছিল, সাংস্কৃতিক অবস্থা কেমন ছিল—এমন অনেক কিছু।’

রাজা দ্বিতীয় রুদ্র সেনার মুদ্রা (২৬৫-২৭৮ সাল)

বাবার স্নেহ : ওয়ালি জানালেন, এ পর্যন্ত তাঁর সংগ্রহে ২২০ ধরনের ১৩৮০টি দেশি-বিদেশি মুদ্রা, কাগুজে নোট ও স্মারক নোট রয়েছে। ডাকটিকিট ও অন্যান্য সংগ্রহ মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার নিদর্শনে পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত আর্কাইভ। সংগ্রহের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বললেন, ‘আমার বাবা ছিলেন রাশভারি স্বভাবের। তাঁকে খুবই ভয় পেতাম। আমার এই শখকে সমর্থন দিয়ে, তিনি নিজেও হজ করতে গিয়ে সৌদি মুদ্রা এনে দিয়েছেন আমাকে।’

প্রাচীন মুদ্রা : প্রায় দুই ডজন প্রাচীন রাজবংশের মুদ্রা সংগ্রহে আছে ওয়ালির। ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো জনপদ গান্ধার মুদ্রা, প্রাচীন বাংলার ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, হরিকেল রৌপ্য মুদ্রা, কিদারা রাজবংশের রাজা বিনয়াদিত্যের কাঁচা সোনার মুদ্রা, পাঞ্চাল জনপদের রাজা ইন্দ্র মিত্র এবং অচ্যুতের মুদ্রা, মগধ জনপদের মুদ্রা, গুপ্ত রাজবংশের রাজা শ্রীগুপ্ত ও স্কন্দগুপ্তের মুদ্রা, শুঙ রাজবংশের মুদ্রা, পশ্চিম ক্ষত্রপা রাজবংশের রাজা ভুমাকা, রাজা দ্বিতীয় রুদ্র সেনা ও রাজা দামা সেনার রৌপ্য মুদ্রা, কুষান সাম্রাজ্যের রাজা বাসুদেবের মুদ্রা, সাতবাহন রাজ্যের রাজা যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণীর মুদ্রা, মৈত্রক রাজবংশের রাজা ভাতারকার মুদ্রা, নাগ রাজবংশের গনপতি নাগের মুদ্রা, ইন্দোগ্রিক রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় এপালোডোটাসের মুদ্রা, মৌর্য সাম্রাজ্যের মুদ্রা—আরো কত যে! এ ছাড়াও রয়েছে চৌহান, চালুক্য, প্রতিহার, মাদুরা, কাংরা, ট্রাভানকোর, বারুদা, মেওয়ার, হায়দ্রাবাদসহ বেশকটি স্বাধীন রাজবংশের মুদ্রা। রয়েছে প্রিন্সলি স্টেটের মুদ্রা এবং ইতিহাসখ্যাত বীর মহীশুরের টিপু সুলতানের মুদ্রাও।

আছে ডাকটিকিটও : ডাকটিকিটেও মিশে থাকে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাফল্যের চিত্র। তাই মুদ্রার পাশাপাশি ডাকটিকিট সংগ্রহ শুরু করেছেন তিনি। প্রায় অর্ধশত দেশের ১৪০০ ডাকটিকেট জমা আছে তাঁর সংগ্রহশালায়। ওয়ালি জানালেন, “সুইজারল্যান্ড প্রবাসী বরকত আল রহমান চন্দনের সঙ্গে সংগ্রাহক হিসেবেই আমার পরিচয়। আমাকে তিনি ‘ছোট ভাই’ বলে ডাকেন। ভালোবেসে তিনি একাই আমাকে ৪৫টি দেশের ১০০০ ডাকটিকেট সংগ্রহ করে দিয়েছেন।’

শখের বন্ধু : মুদ্রা সংগ্রহের টানে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও অনেকের সঙ্গে বন্ধত্ব হয়েছে তাঁর। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশের বন্ধুর সঙ্গেই বিনিময় মুদ্রা বিনিময়।

হারানোর ভয় : হাসিমুখে ওয়ালি জানালেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার যে মেসে থাকি, একবার সেটির সামনে এক লোককে সন্দেহজনকভাবে ঘুরাঘুরি করতে দেখলাম। ভয়ে মুদ্রার ব্যাগটি নিয়ে মেস থেকে চলে এসেছিলাম ক্যাম্পাসে, বন্ধুদের রুমে। সারা রাত সেখানেই ছিলাম।’ আসলে মুদ্রার ব্যাগটি সবসময়ই সঙ্গে রাখেন তিনি। কারণ একবার হারিয়ে ফেললে টাকা দিয়েও তো কেনা যাবে না!

সুরক্ষা ভাবনা : ওয়ালির জন্ম ও বেড়ে ওঠা মাগুরা জেলার শ্রীপুরের খামারপাড়া গ্রামে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা; মা গৃহিণী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। জানালেন, ‘মাগুরায় যদি সরকারি উদ্যোগে কোন আর্কাইভ কিংবা মিউজিয়াম তৈরি হয়, আমার সংগ্রহগুলো সেখানে দিয়ে দিতে চাই। এতে এগুলো যেমন নিরাপদে থাকবে, আবার অন্যদের উপকারও হবে।’

শিক্ষক জানান : বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রেবা মণ্ডল বলেন, “ওয়ালিউল্লাহ খুবই মেধাবী ছাত্র। আমি আদর করে ওকে ‘কালেক্টর সাব’ বলে ডাকি। ভালোলাগা থেকে সে যে কাজটি করছে, সেটি অসামান্য। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য যখন ডুবতে বসেছে, এমন সময় প্রাচীন মুদ্রা সংগ্রহের মাধ্যমে তাঁর এই ইতিহাসচর্চা খুবই ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ।’

মন্তব্য