kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১         

উদ্যোগ
শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য

৫ টাকায় লাঞ্চ

রাজশাহীর বাঘায় শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচ টাকায় দুপুরের খাবার সরবরাহ করে স্থানীয় এক হোটেলের মালিক বিপ্লব সরকার। জানাচ্ছেন মো. লালন উদ্দীন

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৫ টাকায় লাঞ্চ

শিক্ষার্থীদের খাবার পরিবেশন করছেন বিপ্লব সরকার

রোজার আগের এক দুপুর। শহরের আড়ানি পৌর বাজারের তালতলায় অন্নপূর্ণা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে আসতেই চোখে পড়ল অন্য রকম এক দৃশ্য। হোটেলে যারা খাবার খাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই স্কুল ড্রেস পরা ছাত্র-ছাত্রী। এত ছাত্র-ছাত্রী একসঙ্গে হোটেলে দুপুরের খাবার খাচ্ছে, এটা দেখে আশ্চর্য হবে যে কেউ। তবে বিষয়টি জানা থাকায় অবাক হলাম না।

১৯৭১ সালে বিপ্লব সরকারের বাবা শ্যামল সরকার আড়ানি বাজারে এই খাবারের হোটেল দেন। সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের কখনো কখনো খাবার সরবরাহ করতেন শ্যামল সরকার। পরে হোটেলে যোগ দেন ছেলে বিপ্লব সরকার। আর তিন বছর ধরে হোটেলটিতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের শুধু পাঁচ টাকায় খাবারের ব্যবস্থা করে আসছেন তিনি। প্রথম দিকে বাবাকে না জানিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার সরবরাহ করতেন। জানতে পেরে বাবা এ নিয়ে বকাঝকাও করেছেন। কিন্তু বিপ্লব সরকারকে থামানো যায়নি। বাবা যখন দুপুরের দিকে বাড়িতে চলে যান, এ সময় মূলত দোকানে বসেন বিপ্লব। টিফিনের সময় আড়ানি সরকারি মনোমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয় ও আড়ানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খাবার খেতে আসে হোটেলে। পাঁচ টাকার বিনিময়ে পরিমাণমতো ভাত, ডাল, একটু ভাজি ও ভর্তা দেওয়া হয়। সপ্তাহে এক দিন মাছ ও মাংস দেওয়া হয়। যারা স্কুল ড্রেস পরে আসে, শুধু তাদের মধ্যে পাঁচ টাকার এ খাবার দেওয়া হয়। যারা ড্রেস পরে আসে না, তাদের খাবার দেওয়া হয় না।

কথা হলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফা তাসফিয়া তাহসিনের সঙ্গে। বলল, ‘আমরা নিয়মিত এ হোটেলে পাঁচ টাকা দিয়ে দুপুরে খাই। এত কম দামে ভালোমতো খেতে পারায় আমাদের জন্য খুব সুবিধা হয়েছে।’

অন্যদিকে একই শ্রেণির শিক্ষার্থী মেধা, জয়, সেজান যোগ করল, ‘সব দিন বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। যেদিন টিফিন আনতে পারি না, সেদিন বিপ্লবদার হোটেলে গিয়ে দুপুরের খাবার খাই।’

বিপ্লব সরকার বলেন, ‘নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের পর আর পড়ালেখা চালানো সম্ভব হয়নি। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে হোটেলে বাবাকে সহযোগিতা করা শুরু করি। এখন বাবার অনেক বয়স হয়েছে। তাঁকে এখনো সহযোগিতা করি। আমি লেখাপড়া করতে পারিনি। ছোট ছেলে-মেয়েদের দুপুরে এ টাকার বিনিময়ে খাবার দিতে পেরে ভালো লাগে।’ উদ্যোগটা শুরু কিভাবে হলো জানতে চাইলে বলেন, ‘ছাত্ররা প্রায় দিন টিফিনের সময় দুপুরে হোটেলে শিঙাড়া খেতে আসত। তৈলাক্ত জিনিস খেলে সমস্যা হবে ভেবে তাদের কাছ থেকে পাঁচ টাকা নিয়ে ভাত খেতে দিতাম। শিক্ষার্থীরা বেশ অবাক হয়েই খেয়ে চলে যেত। এভাবে বিষয়টি নিয়মে দাঁড়িয়ে গেল। এখনো দিচ্ছি। প্রতিদিন হোটেলে ৬০ থেকে ৮০ জন ছাত্র পাঁচ টাকার বিনিময়ে ভাত খায়।’ হোটেলের পাশাপাশি বিপ্লব সরকারের লেপ-তোশকের দোকান রয়েছে।

বিপ্লব সরকারের বাবা শ্যামল সরকার বলেন, ‘ছেলের এ কাজ প্রথমে দেখে তাকে অনেক বকাবকি করতাম। বকাবকি করেও যখন কোনো কাজ হলো না, হোটেলের দায়িত্ব ছেলেকে দিয়ে দিলাম। তবে ভালো চলছে।’

এ বিষয়ে আড়ানি সরকারি মনোমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় কুমার দাস বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে বিপ্লব সরকার পাঁচ টাকার বিনিময়ে দুপুরে শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার দেয় এটা শুনেছি।’

এদিকে আড়ানি পৌরসভার মেয়র মুক্তার আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি মাঝেমধ্যে তার হোটেলে দুপুরে খেতে যাই। সেখানে স্কুলের ছেলে-মেয়েরা ভাত খাওয়ার জন্য ভিড় জমায়। কিছুদিন পর জানতে পারি পাঁচ টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়া হয় এখানে। এতে হোটেল মালিকের কিছু লোকসান হয়। তাই আড়ানি পৌরসভার পক্ষ থেকে হোটেল মালিককে প্রতি মাসে কিছু আর্থিক সহযোগিতা করার কথা ভেবেছি।’

এদিকে রোজা ও ঈদের কারণে স্কুলগুলো বন্ধ। তাই গত কিছুদিন হোটেলে পাঁচ টাকার খাবার কার্যক্রমও চোখে পড়েনি। তবে স্কুল খুললেই আবার পুরোদমে এ ব্যবস্থা শুরু হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা