kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

নিচে ক্লাস ছাদে বাগান

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার হাতিলেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ বাগানটা দেখার মতো। এটা তৈরির মূল কৃতিত্ব স্কুলের খুদে শিক্ষার্থীদের। জানাচ্ছেন মো. আব্দুল হালিম

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নিচে ক্লাস ছাদে বাগান

ছোটবেলা থেকেই ফুল ও ফল গাছ টানে মো. সিরাজুল ইসলামকে। যেখানে চাকরি করেছেন, সেখানেই গাছ লাগিয়েছেন। পলাশিহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বদলি হয়ে এলেন হাতিলেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানপত্রে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর আনতে যান। শিক্ষা কর্মকর্তা জীবন আরা বেগম তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনার কাছে আমাদের অনেক আশা, স্কুলটি নিজের মতো করে সাজাবেন ও পরিচ্ছন্ন রাখবেন, শিক্ষার্থীদের পরিপাটি রাখবেন, বিদ্যালয়ে দুটি বাগান করবেন। একটি ছাদ বাগান, আরেকটি মাটিতে।’ শিক্ষা অফিসারকে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর প্রতিটি কথাই রাখবেন। রেখেছেনও। গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এত সুন্দর পরিবেশ, চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না! বিদ্যালয় ভবনের ৭০ ফুট দৈর্ঘ্যের ও ২৬ ফুট প্রস্থের ছাদে করা হয়েছে ফুল ও ফলের দৃষ্টিনন্দন বাগান। ছাদ বাগানের বেশির ভাগ ফুল ও ফল গাছ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে লাগানো। শিক্ষার্থীরাই পরিচর্যা করে। শিক্ষকরা শুধু দিকনির্দেশনা দেন।

 

গ্রামের নাম হাতিলেইট

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণে রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে হাতিলেইট গ্রাম। ১৯৭০ সালে গ্রামের নামের সঙ্গে মিল রেখে ৫২ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা হয় হাতিলেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে স্কুলটিতে পাঁচজন শিক্ষক ও একজন নৈশপ্রহরী কাম দপ্তরি রয়েছেন। শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ২৭০ জন শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে।

 

বাগান শুরুর পরিকল্পনা

মো. সিরাজুল ইসলাম বিদ্যালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে প্রথমে নজর দেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন স্কুলসহ আশপাশে পরিষ্কার করা শুরু করেন। এর ফাঁকে শিশুদের কাছ থেকে বিভিন্ন গল্প শোনেন এবং গাছ ও পরিবেশ নিয়ে গল্প করেন। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বিদ্যালয় ভবনের ছাদে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা সাফ করেন। ছাদ পরিষ্কার করার পর একদিন বিদ্যালয়ের শিশুদের কাছে সবাই মিলে স্কুলে ফুল ও ফলের বাগান করার প্রস্তাব রাখেন। ছাত্র-ছাত্রীরাও খুশি মনে রাজি। বিদ্যালয়ের সামনে ও ছাদে বাগান করার পরিকল্পনা হয়ে গেল।

 

চারা সংগ্রহের কৌশল 

তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ফুল ও ফল গাছের চারা নিয়ে আলোচনা করেন সিরাজুল ইসলাম। তাদের বাড়িতে যেকোনো ফুল ও ফল গাছের চারা অব্যবহূত পটে লাগাতে বলেন। পট না থাকলে নারকেলের আইচার ভেতরে ৬০ শতাংশ মাটি ও ৪০ শতাংশ গোবর মিশিয়ে গাছ বা গাছের বীজ লাগানোর পরামর্শ দেন। অল্প পানি দিয়ে চার-পাঁচ দিন ছায়ায় ও পটের নিচে পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র রাখতে বলেন। চারা অথবা বীজ লাগানোর ঠিক এক মাস পর সবাইকে গাছগুলো বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে বলেন। চারা লাগানোর পদ্ধতি বিদ্যালয়ের সাদা বোর্ডে লিখে ও চিত্র এঁকে দেখিয়েছিলেন। এক মাস শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ফাঁকে খোঁজ নেন, কে কী গাছ লাগাচ্ছে, গাছ কী রকম হয়েছে, গাছের যত্ন কেমন করছে। এরই মধ্যে নিজেও বেশ কিছু ফুল ও ফল গাছের চারা কিনে আনেন। ঠিক এক মাস পর বিদ্যালয়ের ৪৭ জন শিক্ষার্থী ৪৭টি ফুল ও ফল গাছের চারা নিয়ে হাজির।

 

টব তৈরি ও জৈব সার উত্পাদন

লোহার পাত দিয়ে ছোট-বড় টব তৈরির ছয়টি ছাঁচ, ইটের সুরকি, সিমেন্ট ও বস্তায় ভরে বালু বিদ্যালয়ে আনা হয়। এর পর থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেরাই টব তৈরি শুরু করে। পনেরো দিনে গাছ লাগানোর জন্য এক শরও বেশি টব তৈরি হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে ব্যাগে করে জৈব সার নিয়ে আসে। বিদ্যালয়ের পাশে একটি পতিত ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করা হয় মাটি। মাটি ও জৈব সার একসঙ্গে করে ভরে বিদ্যালয়ের ছাদে রাখা হয়। তারপর সবাই মিলে ছাদ বাগানের টবে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও ফল গাছ লাগিয়ে দেয়। বাগানে ব্যবহারের জন্য শিক্ষার্থীরাই কেঁচো দিয়ে পরিবেশবান্ধব জৈব সার উত্পাদন করছে ছাদের এক কোনায় চাড়ির মধ্যে। এক শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে উন্নত জাতের ৩০টি কেঁচো নিয়ে এসেছিল স্কুলে। প্রথমে একটি চাড়িতে কেঁচোর সংখ্যা বাড়িয়ে নেওয়া হয়। তারপর তিনটি চাড়িতে কেঁচো সার উত্পাদন শুরু হয়। ১৫-২০ দিন পর পর কেঁচো সার বাগানের টবে ব্যবহার করা হয়।

 

ছাদ বাগানে আড়াই শতাধিক গাছ

হাতিলেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাদ বাগানে ফুটেছে বাহারি ফুল। বাগানে রয়েছে আম, মালটা, জাম্বুরা, লটকন, কদবেল, ড্রাগন, চেরি, করমচা, লিচু, সফেদাসহ স্থল পদ্ম, জুঁই, কামিনি, সিলভিয়া, হাসনাহেনা, চায়না টগর, দেশি টগর, চিতা লিলি, হাজারি বেলি, গন্ধরাজ, নীলকণ্ঠ দোপাটি, গোলাপ (১০ প্রকার), পুর্তুলিকা (১১ প্রকার), মরিচা ফুল, গাঁদা (৪ প্রকার), এলামুণ্ডা, পারুলসহ আড়াই শতাধিক ফুল ও ফল গাছ। ফলগাছগুলো বড় হয়ে উঠছে। আশা করা যায়, আগামী বছর থেকে ফল আসবে।

 

গাছের রেজিস্টার খাতা

শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে কে কী ফুল ও ফল গাছের চারা নিয়ে এসেছে, তা একটি রেজিস্ট্রার খাতায় লিপিবদ্ধ করা আছে। শিক্ষার্থীর নামের পাশে শ্রেণি ও রোল নম্বর এবং গাছের নামসহ পটের সিরিয়াল লেখা রয়েছে। যার যার গাছের চারা সে যেন পরিচর্যা করে, তাই এই ব্যবস্থা। ছাদ বাগান করার পর তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দিয়ে ১৫ জন করে একেকটি দল তৈরি করে দেন প্রধান শিক্ষক। যেদিন যাদের পালা, তারা বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগে চলে আসে। প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ৩০ মিনিট ছাদ বাগানের পরিচর্যা করে। এভাবে প্রতিটি গ্রুপ এক সপ্তাহ করে গাছের পরিচর্যা করে।

 

শিক্ষার্থীরা মহাখুশি

বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা তাদের লাগানো ফুলগাছগুলোতে ফুল ফোটায় মহাখুশি। মনের আনন্দে তারা ছাদ বাগানে গাছের পরিচর্যা করে। বাগানের প্রতি তাদের এক অন্য রকম ভালোবাসা। কথা হয় হাবিবা, আরিফা, হামিদা, কাকলী, ফাহিমা, ছাত্তার নোমান, রাকিব, সানিসহ অনেকের সঙ্গে। তারা বলে, ‘স্যার যে ছাদ বাগান করবেন প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি। আমাদের সঙ্গে ফুল ও ফল গাছ নিয়ে গল্প করতেন, প্রতিদিন বিদ্যালয়ের আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাতেন, স্যার নিজেও হাত লাগাতেন। তারপরই বললেন বাগানের কথা। এখন স্কুলে এসেই ছাদে গিয়ে খুঁজে দেখি কার কার গাছে ফুল ফুটেছে। এখন অনেক ফুল ও ফল গাছের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি। বাগানে মৌমাছি, ছোট ছোট পাখি ও প্রজাপতি আসে। দেখতে অনেক ভালো লাগে।’ এদিকে শিশুদের এই ছাদ বাগান করার খবর শুনে অভিভাবকরাও খুশি। তাঁদের মতে, হাতিলেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ বাগান অনুকরণীয় হতে পারে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে।

 

প্রধান শিক্ষক যা বললেন

কথা হলো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। বললেন, শনিবার শিশু শ্রেণি, রবিবার প্রথম শ্রেণি, সোমবার দ্বিতীয় শ্রেণি, মঙ্গলবার তৃতীয় শ্রেণি, বুধবার চতুর্থ শ্রেণি ও বৃহস্পতিবার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বাগান ভিজিটের মাধ্যমে ফুল, ফল ও ঔষধি গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গাছের প্রতি আগে থেকেই অনেকের দুর্বলতা ছিল। ছাদে বাগান শুরু করার প্রথমেই একটি ঘোষণা খুব কাজে দিয়েছে। তা হলো বার্ষিক পরীক্ষার সময় সৃজনী হিসেবে ঝাড়ু, সাবান, মগ, চালুন, কুলা ইত্যাদি দিতে হবে না বিদ্যালয়ে। গাছগুলোই সৃজনী। গাছের যত্নের ওপর সৃজনীর নাম্বার দেওয়া হবে। এতে শিক্ষার্থীরা উত্সাহিত হয়েছে। ‘কিষান সমন্বিত কৃষি উদ্যোগ’-এর স্বত্বাধিকারী কৃষক ড. আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স তাঁর বাগান থেকে ছাদ বাগান করতে বিভিন্ন ফুল ও ফল গাছ দেবার পাশাপাশি পরামর্শও দিয়েছেন। এ ছাড়া জার্মানপ্রবাসী মশিউর রহমান মারুফ তাঁর স্ত্রী মারুফা পারভীন মিতুর জন্মদিনে ড. আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাতিলেইট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লাগানোর জন্য ১০০ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফলগাছ কিনে দিয়েছেন। ছাদ বাগান করতে বিভিন্নভাবে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধান শিক্ষক।

ছাদ বাগানে গাছের পরিচর্যা করছেন প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা