kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

ইস্তাম্বুলে ঈদের দিন

তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাকিল রেজা ইফতি। সেখানে কেমন কাটে প্রবাসী শিক্ষার্থীদের ঈদ—জানাচ্ছেন তিনি

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইস্তাম্বুলে ঈদের দিন

ডরমিটরির শিক্ষার্থী বন্ধুদের সঙ্গে ঈদযাপন

ইস্তাম্বুল খুব সুন্দর, মানুষগুলোর মতোই। শহরের রাস্তায়, মোড়ের বাঁকে, সবখানে পুরাতন স্থাপত্যের নির্দশন। রমজানের শেষ কটা দিন পর্যটকের সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। ইতিহাসের পাতার সেই অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ, আয়া সোফিয়ার নিকটস্থ সবুজ চত্বরে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় তুর্কিরাও পরিবারসহ আসে, খোলা আকাশের নিচে একসঙ্গে ইফতার আয়োজনে অংশ নেয়।

শহরের ইউরোপীয় অংশের পুরনো আবাসিক এলাকাগুলোর প্রাচীন স্থাপত্য, তুর্কি মায়েদের ইফতার প্রস্তুতি, বাবাদের এলাকার চায়ের টঙে বসে গল্প, পড়ন্ত বিকেলে ইফতারের অপেক্ষা, টঙ আর বাসার পাশে পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তায় গোলাপের রাজ্য আর বেশ কিছু বিড়াল, বাসার ভাই-বোনদের সেই বিড়ালগুলোর সঙ্গে খেলা করা, দূর-দূরান্তের নতুন-পুরাতন মসজিদগুলো থেকে হালকা চালে ভেসে আসা আজানের শব্দ, আর এর সব কিছুর সঙ্গে মারমারা সাগরে স্নাত স্নিগ্ধ হাওয়া—সবটার মিশেলেই যেন সবার আড়ালে রচিত হয় কোনো কবির লেখা সেরা কবিতার ছন্দ। আর এই কবিতার মুগ্ধ পাঠক পৃথিবী নিজেই। নেপোলিয়নের অনুভবে ঠিক ধরা পড়েছে এর সবটা, বোধ হয় সে জন্যই তিনি বলেছিলেন—‘পুরো বিশ্ব একটা দেশ হলে, ইস্তাম্বুল হবে তার রাজধানী!’

এখানকার তরুণরা বেশ ফ্যাশন সচেতন। এই ফ্যাশন সচেতনতার জন্য খুব নিয়মিতভাবেই নতুন পোশাকে অভ্যস্থ তুর্কি তরুণরা। সেদিন বুরাককে ‘ঈদ শপিং কতদূর?’ প্রশ্ন করলাম; উত্তরে ওকে খুব অপ্রস্তুত হতে দেখলাম। বাঙালি তরুণদের ঈদ উপলক্ষে বিশেষ কেনাকাটার আনন্দ ওরা কি আর বুঝবে!

তবে ইস্তুম্বুলে আমার ডরমিটরির এলাকায় বিপুলসংখ্যক দেশান্তরিত সিরিয়ান জনগোষ্ঠীর বসবাস। পুরো এলাকায় সিরিয়ানদের খাবার, পোশাক-আশাকসহ বিভিন্ন খুদে ব্যবসায়ের দোকান। ঈদকে কেন্দ্র করে ওদের দোকানগুলোতে বিশেষ ছাড়ের আয়োজনসহ খুব উত্সবমুখরতা চোখে পড়ল। সিরিয়ান তরুণরাও ঈদে নতুন পোশাক কেনাকে ওদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখে। আমার দুজন সিরিয়ান ক্লাসমেটের কাছ থেকেও একই বিষয় জানলাম।

ঈদ উপলক্ষে বাঙালিদের অনেক পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম হলো আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায় বেড়াতে যাওয়া। তুরস্কে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক তুর্কি বন্ধু হয়েছে, খুব নিকট বন্ধু; কিন্তু কেউ বাসায় দাওয়াত করেনি! অন্তত ঈদে সেই আশা করেছিলাম। কিন্তু না, করেনি। শুনেছি তুরস্কের অন্যান্য শহরের মানুষ অন্য রকম। কিন্তু ইস্তাম্বুলের মানুষজন ক্যারিয়ার নিয়ে খুব ব্যস্ততার জন্যই হয়তো তুরস্কের সত্যিকারের আতিথেয়তার সংস্কৃতি থেকে একটুখানি চ্যূত। তবে যা হোক, মানুষগুলো যান্ত্রিক না। শহরের মোড়ে মোড়ে দেখা মেলে কনসেপচুয়্যাল সব ক্যাফের। এক কাপ চায়ের চুমুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা চালানো যায় সেগুলোতে বসে। আর আড্ডার তুর্কি সঙ্গীরা যখন ঈদ উপলক্ষে পরিবারসহ নিজ নিজ শহরে চলে গেছে, তখন আমার খুব নিয়মিত কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে মঞ্চনাটক দর্শন।

বছরজুড়ে তুর্কি দর্শকদের উপস্থিতিতে জমজমাট থাকে থিয়েটারগুলো, টিকিট পাওয়া খুব শক্ত। শোর প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে থেকে কেটে রাখতে হয় প্রবেশ কূপন। ঈদ উপলক্ষে ইস্তাম্বুল বেশ জনশূন্য আর শান্ত হয়ে যাওয়ায় টিকিট পাওয়াটাও খুব সহজ, আর তাই আমার এই সুযোগের সদ্ব্যবহার।

অনেক দেশের শিক্ষার্থীর বাস আমার ডরমিটরিতে। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু কসোভোর জেকারিয়া। বাঙালি সংস্কৃতি নাকি ওকে খুব টানে। শেষবার বাংলাদেশ থেকে ফেরার সময় ওর জন্য একটা পাঞ্জাবি এনেছিলাম। কী যে খুশি হয়েছে! জেকারিয়ার মতো যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মতো তুরস্কের নিকটবর্তী দেশগুলোতে পড়ালেখা করতে এসেছে, তাঁরা সামান্য চার-পাঁচ দিনের ছুটিতেই ছুটে যায় পরিবারের কাছে। আমার গ্রিক রুমমেট জেনের তো প্রতি সপ্তাহেই পারলে একবার করে ঘুরে আসে গ্রিস থেকে।

দূর পরবাসের নিঃসঙ্গ তারা গুনতে হয় আমাদের, যারা খুব দূরের দেশ থেকে এসেছি। নিঃসঙ্গতা যেন দ্বিগুণ হয়ে যায় ঈদের মতো বিশেষ সময়গুলোতে। সব রকমের সামাজিক, রাজনৈতিক দ্বিধা বিপত্তি কোন্দলের থেকেও আমাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক সামান্যতম মিল। এই যেমন খাবারের ধরনের মিল। এই মিলের জন্যই আমরা যারা বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা একই ডরমিটরিতে থাকি, উত্সবগুলোতে অন্তত রান্নাবান্নার পরিকল্পনাটা একসঙ্গে করি। বিদেশি শিক্ষার্থীরা সবাই মিলেমিশে যেন নিজেদের অজান্তেই হয়ে যাই একক একটি পরিবার। ঈদের কেনাকাটা একসঙ্গে করি, একসঙ্গে ঈদের নামাজে যাই, ঈদের ছুটিতে ফুটবল ম্যাচের পরিকল্পনা করি। কখনো আবার দূরের কোনো জায়গা থেকে একসঙ্গে ঘুরে আসি।

ঈদের দিন বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে সারা দিনের রান্নাবান্না, ঘুরাঘুরি শেষে বেশ ক্লান্তি যখন শরীরজুড়ে, দেশে সবার ঈদ প্রস্তুতির কথা ভেবে যখন মন খুব খারাপ হওয়ার পথে—ঠিক তখনই ই-মেইলের স্ক্রলে চোখে পড়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট ইস্তাম্বুলের মেইল। বাংলাদেশের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। কনস্যুলেট অফিসে। ছুটে যাই সেখানে। সমস্ত বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়, সালাম আর শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, বাঙালি খাবার খাওয়া হয়। এই তো! একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে এভাবেই জায়গা করে নেয় প্রবাসের ঈদ।

মন্তব্য