kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

বাংলাদেশকে গ্রেট করবে কে?

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির তড়িত্ ও কম্পিউটার কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহদী রহমান। তিনি গবেষণা করেন আলো ও বায়োমেডিক্যালের জটিল কিছু বিষয় নিয়ে। সম্প্রতি ‘ইউনিভার্সাল সায়েন্টিফিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্ক প্রাইজ ২০১৯’-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন তিনি। লিখেছেন মাহবুবর রহমান সুমন

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশকে গ্রেট করবে কে?

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় ১৩তম হয়েছিলেন মাহদী। পড়েছেন ইলেকট্রনিকস ও তড়িত্ কৌশলে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র হলেও পদার্থবিদ্যা তাঁকে টানত বেশি। তাই বুয়েটে অধ্যয়নরত অবস্থায় সময় পেলেই ছুটে যেতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম দস্তগীর আল-কাদেরীর কাছে। পদার্থবিদ্যার নানা বিষয়ে মনে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর সমাধান জেনে নিতেন। সেই থেকে আগ্রহ জন্মেছে পদার্থবিদ্যায় গবেষণার প্রতি। স্নাতক শেষে পিএইচডি সম্পন্ন করেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর থেকে। পিএইচডি শেষে ২০১৭ সালের শুরুতে যোগ দিয়েছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বুয়েটে অধ্যয়নকালেই গবেষণায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তখন বুয়েটের কিছু বড় ভাই এবং শিক্ষক গবেষণার বিষয়ে সাহায্য করেছিলেন মাহদীকে। স্নাতক পর্যায়ে পড়ার সময় মেটা ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি প্যাঁচ অ্যান্টেনার সাইজ ছোট করার ওপর তাঁর কিছু গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল আইইটি মাইক্রোওয়েব অ্যান্ড অ্যান্টেনা জার্নাল, প্রগ্রেস ইন ইলেকট্রনিকসের মতো বৈজ্ঞানিক জার্নালে। ফলে মাস্টার্স ডিগ্রি ছাড়াই সরাসরি পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের তড়িত্ ও কম্পিউটার কৌশল বিভাগে। পিএইচডির বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা। আলো এবং আলো ফেলে বস্তুর নতুন সব চরিত্র ও তাদের নিয়ন্ত্রণের ওপর গবেষণা শুরু করেছিলেন তিনি।

সেই থেকে আলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে একের পর এক তাক লাগানো সব গবেষণা করে যাচ্ছেন তিনি। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর ২৩টি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। নেচার পাবলিশিং গ্রুপের লাইট : সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশনস এবং এসিএস ন্যানো এই দুই আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নালে ২০১৫ ও ২০১৭ সালে প্রকাশিত তিনটি গবেষণা নিবন্ধের অন্যতম লেখক তিনি।

গবেষণার বিষয় আসলে কী? তিনি বললেন, ‘যখন কোনো বস্তুর ওপর আলো ফেলা হয়, তখন সেই বস্তুটি সাধারণত আলোর দিকে বা বিপরীত দিকে যেতে থাকে, যেটা বস্তু এবং মাধ্যমের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে।’ এই বিষয়টি নিয়েই নতুনভাবে ভাবতে থাকেন মাহদী। আলো দিয়ে আলোকিত করা বস্তু অন্য কোনো দিকে কেন যায় না? কী ধরনের বস্তু হলে বা কী করলে সেটা দিক বদলাতে পারে? এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে থাকেন মাহদী। বললেন, কোনো কেমিক্যাল ইউজ না করেই শুধু অপটিক্যাল ফোর্স দিয়েই কিভাবে ডাই-ইলেকট্রিক কিংবা কাইরাল পার্টিক্যালকে আলাদা করা যায়, সেটা দেখাতে চেয়েছি আমি।

কাইরাল বস্তুকে যদি অর্ধেক পানিতে ডোবানো হয় এবং অর্ধেক বাতাসে রেখে সাধারণ আলোকরশ্মি দিয়ে আলোকিত করা হয়, তবে সেটি পার্শ্বীয় বল অনুভব করে। অর্থাত্ এটি আলোর দিকে বা বিপরীত দিকে না গিয়ে আলোকরশ্মির সঙ্গে লম্বভাবে বাঁয়ে বা ডানে সরে যেতে থাকে। কিন্তু কাইরাল এর বদলে ডাই-ইলেকট্রিক বস্তু হলে সেটি আলোর বিপরীত দিকের বল অনুভব করে।’

এখন তিনি গবেষণা করছেন অপটিকস, ফটোনিকস এবং বায়োমেডিক্যাল নিয়ে। আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর ২৩টি গবেষণা নিবন্ধ ছাড়াও এসব বিষয়ে রয়েছে তাঁর ৯টি রেফারড কনফারেন্স আর্টিকল। এ ছাড়া ‘আল্ট্রাওয়াইডব্যান্ড অ্যান্ড শর্ট ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস’ বইয়ে তাঁর লেখা একটি চ্যাপ্টারও রয়েছে। যেটি প্রকাশিত হয়েছে স্প্রিঞ্জার পাবলিকেশনস থেকে। গুগল স্কলারে তাঁর প্রকাশনাগুলো উদ্ধৃত হয়েছে ৫০০-এর কাছাকাছি।

মাহদী রহমান বললেন, ‘বায়োমেডিক্যাল গবেষণা নিয়েও আমি প্রচণ্ড আশাবাদী। আলো দিয়ে বিভিন্ন ন্যানো পার্টিক্যাল নিয়ন্ত্রণ আমাদের মূল গবেষণার বিষয় হলেও পদার্থবিদ্যার এই শাখাকে আমরা বায়োমেডিক্যালেও প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছি, যা দিয়ে কেমিক্যালের সাহায্য ছাড়াই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ইমেজ প্রসেসিংসের কিছু আইডিয়া ব্যবহার করে সহজে রোগ নির্ণয় করা যেতে পারে।’

স্বীকৃতিও মিলেছে। পুরস্কার হিসেবে কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদানও পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ইতালির ‘দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স (টিডাব্লিউএএস) ইন্টারন্যাশনাল গ্র্যান্ট ২০১৯।’ এটি একটি মেধাভিত্তিক পুরস্কার, উন্নয়নশীল দেশের বিজ্ঞান গবেষণায় যাঁরা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন, সেই সব গবেষককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও রিসার্চ গ্র্যান্ট পেয়েছেন তিনি।

মাহদী কয়েক দিন আগেই মনোনীত হয়েছেন ইউনিভার্সাল সায়েন্টিফিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্ক প্রাইজ ২০১৯-এর জন্য। ‘তরুণ বিজ্ঞানীদের নোবেলখ্যাত’ এই পুরস্কার সংক্ষেপে ‘ইউএসইআরএন প্রাইজ’ নামে পরিচিত। সারা বিশ্বে ৪০ বছরের কম বয়সী গবেষকদের উল্লেখযোগ্য গবেষণা এবং নিজের গবেষণাক্ষেত্রে বিশ্বে যাঁরা প্রথম সারিতে আছেন, তাঁরাই এই পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পান। ইউএসইআরএনকে পৃথিবীব্যাপী বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার মিলনকেন্দ্র বলা হয়ে থাকে। ইউএসইআরএনের সুপারিশ কমিটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী এবং নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তরা থাকেন।

গবেষক মাহদীকে তো জানা গেল; কিন্তু শিক্ষক হিসেবে মাহদী কেমন? এমন প্রশ্নে মুচকি হেসেই উত্তর দিলেন মাহদী। বললেন, ‘জীবনে খুব কম শিক্ষক পেয়েছি, যাঁরা ক্লাসে ছাত্রদের আনন্দ দিয়ে পড়াতে পারেন। আমি বরাবরই এমনভাবে পড়াতে চেষ্টা করছি, যাতে শিক্ষার্থীরা বিষয়ের গভীরে ঢুকতে পারে এবং সানন্দে গবেষণায় আগ্রহী হয়।’

মাহদী আরো বলেন, পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরে আসার প্রধান কারণ ছিল দেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা। পিএইচডিরত অবস্থায় আমি বুয়েটের বিভিন্ন ব্যাচের ছাত্রদের থিসিসে গাইডেন্স দিয়েছি। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর আমি এনএসইউ অপটিকস অ্যান্ড ফটোনিকস অ্যান্ড বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ গ্রুপ তৈরি করি। এই গ্রুপ নিয়ে অনেক কাজ করেছি। পাশাপাশি বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়েও গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছি নিয়মিত। নর্থ সাউথে আমি ইসিই এবং ম্যাথ অ্যান্ড ফিজিকস—দুটি বিভাগেই ক্লাস নিয়ে থাকি।

চাইলেই বিদেশে থেকে যেতে পারতাম। পিএইচডি শেষে দেশে ফেরায় বন্ধু-বান্ধবদের অনেকে হতাশ হয়েছিল। আত্মীয়-স্বজনদের অনেকে বলেছিল, ‘এই দেশে কী হবে?’ জবাবে মজা করে বলেছিলাম, ‘যদি আমাদের দেশের মেধাবীরা শুধু আমেরিকাকে গ্রেট করার জন্য পড়াশোনা করে, তবে আমার নিজের দেশ বাংলাদেশকে গ্রেট কে করবে? গবেষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই।’

মন্তব্য