kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অপুর স্কুল

আরেফিন অপু নামের এক প্রবাসী দরিদ্র শিশুদের পড়ালেখা শেখাতে গড়ে তুলেছেন ‘স্মাইলিং বেবি ফাউন্ডেশন’। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মোস্তাফিজ নোমান

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অপুর স্কুল

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে স্কুলের শিক্ষিকারা

ফেব্রুয়ারির এক শনিবার। কয়েকজন শিক্ষিকাকে দেখা গেল বীররামপুর গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঘুরে খবর নিচ্ছেন তাঁদের শিক্ষার্থীদের। কে কী করছে, খাওয়াদাওয়া হয়েছে কি না জানতে চাচ্ছেন। মায়েরাও হেসে উত্তর দিচ্ছেন। শিক্ষিকারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে কথা বললেন কারো কারো সঙ্গে। কাউকে খাইয়ে দিলেন নিজের হাতে। দৃশ্যটি বেশ অবাক করা হলেও ‘স্মাইলিং বেবি ফাউন্ডেশনে’র শিক্ষিকা বা শিক্ষার্থীদের কাছে এটা নতুন কিছু নয়। স্কুলটা গড়ে তুলেছেন আরেফিন অপু।

 

শুরুর কথা

২০০১ সাল। আরেফিন অপু ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একটি প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরি করছেন। স্ত্রীর কোলজুড়ে এলো দম্পতির প্রথম সন্তান; কিন্তু শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মারা গেল সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই। ২০০৫ সালে পুনরাবৃত্তি হলো একই ঘটনার। আবারও জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেল দম্পতির আরেকটি সন্তান। অপু কষ্ট পেলেন খুব। একই সঙ্গে মনে মনে সংকল্প করলেন শিশুদের জন্য কিছু একটা করার। তবে তখনই সম্ভব হলো না। এর মধ্যেই বিদেশে স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করছিলেন। ২০০৬ সালে বৃত্তি নিয়ে চলে গেলেন অস্ট্রেলিয়ায়। একপর্যায়ে সেখানকার নাগরিকত্বও পেলেন। চাকরি নেন অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীতে। কিন্তু সাগরে দস্যু দমনসহ আরো নানা ধরনের কাজে মন টিকল না। যোগ দিলেন একটি বেসরকারি ফার্মে। দেশের মায়ায় ফিরলেন ২০১৫ সালে। দেশে ফিরতেই পুরনো ইচ্ছাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অসহায় শিশুদের জন্য একটা কিছু করতে হবে। গড়ে তুললেন ‘স্মাইলিং বেবি ফাউন্ডেশন’।

 

উদ্দেশ্য

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার অবহেলিত অসহায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করে ‘স্মাইলিং বেবি ফাউন্ডেশন’। ফাউন্ডেশনের স্কুলগুলো পরিচিত স্মাইলিং বেবি স্কুল নামে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোই মূল উদ্দেশ্য।

 

ফাউন্ডেশনের শিক্ষিকা ও কর্মীরা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে অসহায় শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে সেসব শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্কুলে নিয়ে আসেন। যেসব অসহায় দরিদ্র শিশুদের এই স্কুলে ভর্তি করানো হয়, সেসব শিশুর সব ধরনের খরচ বহন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নিজের সন্তান হারানোর বেদনা ভুলে থাকতেই এই ছিন্নমূল অসহায় শিশুদের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন আরেফিন অপু। এই মহত্ উদ্যোগে সব সময় সাহায্য করে যাচ্ছেন তাঁর স্ত্রী সাবিহা আরেফিন।

 

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে আরেফিন অপু

স্কুল নির্মাণ

ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর ও বীররামপুর উজানপাড়ায় ২০১৫ সালে তৈরি করা হয় স্মাইলিং বেবি স্কুল। শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয় এই দুই স্কুলে। রয়েছে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে দরিরামপুর ক্যাম্পাসে দুই শরও বেশি এবং বীররামপুর কেন্দ্রে রয়েছে শতাধিক শিক্ষার্থী। দেশের প্রচলিত সিলেবাসের সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বেবি কেয়ারের আদলে মায়ের মমতায় শিক্ষা দেওয়া হয় শিশুদের। ব্যবস্থা করা হয় চিত্তবিনোদনের। আছে বৃত্তির ব্যবস্থা। আবার স্কুলের কোনো শিশু অসুস্থ হলে তার চিকিত্সারও ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্কুলে শিশুদের লেখাপড়া চলে। পাশাপাশি স্কুলে কর্মরত শিক্ষিকারা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের খোঁজখবর করেন, নানা বিষয়ে সাহায্য করেন মায়েদের। মজার ঘটনা এই স্কুলগুলোতে শিক্ষাদান করেন শুধু নারীরা। এর কয়েকটি কারণ আছে। অপু চেয়েছেন নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন মায়ের স্নেহ পায় সেটাও নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। তা ছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর নেওয়া নারী শিক্ষকদের পক্ষেই সহজ।

তা ছাড়া ভাসমান পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যেও কাজ করে এই ফাউন্ডেশনটি। যেমন বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের নিয়েও কাজ করে তারা। এ ছাড়া স্মাইলিং বেবি ফাউন্ডেশন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি স্কুল পরিচালনা করছে।

 

অর্থ আসছে কোথা থেকে

‘স্মাইলিং বেবি ফাউন্ডেশন’ পাটের ব্যাগসহ নানা ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করে। এই কাজে নিয়োজিত আছে ২৪ জন নারীকর্মী। এই সামগ্রীগুলো দেশে বিক্রি না করে বিক্রি করা হয় অস্ট্রেলিয়ায়। অপু ও তাঁর প্রবাসী বন্ধু, পরিচিতরা যে যখন অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান, তখন ব্যাগগুলো নিয়ে যান এবং সেখানে বিক্রি করে মুনাফার টাকা পাঠিয়ে দেন এই ফাউন্ডেশনে। একটি চটের ব্যাগ তৈরি করতে এ দেশে খরচ হয় প্রায় ১০০ টাকা। এই ব্যাগটি অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি করা যায় ১০০ থেকে ৩০০ ডলারে। তাই এই অর্থ থেকে স্কুলটি পরিচালনা করা সহজ বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষিকারা যা বললেন

সোমবার সকালে দরিরামপুরে স্মাইলিং বেবি স্কুলে গিয়ে দেখা যায় শিক্ষিকারা বিভিন্ন খেলাধুলার সামগ্রী, খাবারসহ সব ধরনের শিশুবান্ধব সামগ্রী নিয়ে মেতে উঠেছেন শিশুদের সঙ্গে। শিক্ষিকারাও যেন ওই সময়টা শিশু হয়ে যান। এতে শিশুরা যেমন আনন্দ পায়, তেমনি পড়াশোনার কথা বললে বেশ আগ্রহের সঙ্গেই শেষ করে। কোনো ধরনের শাসন করা হয় না তাদের। কর্কশ ভাষায় কথাও বলা হয় না। শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াগুলো সুন্দরভাবে শেষ করে ম্যাডামের সামনে হাজির হয় খেলাধুলা করার জন্য। কখনো শিশুরা ক্লাস করতে না চাইলে খোলা আকাশের নিচে তাদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন শিক্ষিকারা।

শিক্ষিকাদের একজন সুরাইয়া আক্তার। ময়মনসিংহের মুমিনুন্নেছা কলেজ অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন এই প্রতিষ্ঠানে। তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের দুই শিফটের মাধ্যমে ক্লাস নিয়ে থাকি। যেসব শিশুর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কম, তাদের বাড়ি গিয়েও আমরা কাজ করি। এলাকার অসহায়, দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলগামী করতে অভিভাবকদের বুঝাই। শিক্ষার্থীদের মাতৃস্নেহে লালন-পালন করা হয় এখানে।’

স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জিহাদ জানালো তার ভালো লাগার কথা, ‘আমাদের ম্যাডামরা সব সময় আদর-ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখেন। আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে কখনো কখনো বাড়িতে পড়াশোনাও করান ম্যাডামরা। আমাদের সঙ্গে খেলাধুলা করেন, নানা ধরনের গিফট দেন।’

 

অভিভাবকদের সন্তুষ্টি

স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থীর মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শিশুদের বাড়ি থেকে আনা হতে শুরু করে তাদের পৌঁছে দেওয়া, বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেওয়াসহ সব দায়িত্বই পালন করে থাকেন শিক্ষকরা।

বীররামপুর এলাকার রুপালী চন্দ দে বলেন, ‘আমার চার সন্তান। ওদের বাবা দিনমজুর। সন্তানদের লেখাপড়া করানোর খরচ দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। এই স্কুলের মাধ্যমে আমার দুই সন্তান লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের অন্য সব ব্যয়ভার বহন করে থাকে স্কুলটি।’

 

ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা

ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরেফিন অপু বলেন, ‘নিজের সাধ্যমতো ত্রিশাল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা ও চিকিত্সার দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করি এখানে এমন একটি শিশুও থাকবে না, যে টাকার অভাবে স্কুলে যেতে পারছে না। সত্যিকারের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্যই মাঠে কাজ করে যাচ্ছি। এই কাজে আমাকে সব সময় অনুপ্রেরণা দেয় আমার স্ত্রী সাবিহা আরেফিন। অসহায় শিশুদের খুঁজে বের করার জন্য সে নিজেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে দরিদ্র পরিবারগুলোতে খবর নেয়।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা