kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘আমরা তোমাদের ভুলব না’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রথম জাদুঘর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’। সেটি ঘুরে এসে লিখেছেন আলী ইউনুস হূদয়। ছবি তুলেছেন অন্তর রায়

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




‘আমরা তোমাদের ভুলব না’

জাদুঘর ঘুরে দেখছেন শিক্ষার্থীরা

দুটি শিশু ঘুমিয়ে আছে। পরনে লুঙ্গি, খালি গা। বিছানায় টাঙানো মশারির এক পাশের দড়ি খুলে অর্ধেকটা ঝুলে আছে। শিশু দুটির নিষ্পাপ মুখের দিকে চোখ পড়লে মনে হবে, এই বুঝি তাদের ঘুম ভেঙে যাবে! নতুন সকালের লাল সূর্যের আলো গায়ে মেখে তারা হেসে উঠবে। কিন্তু সেই ভোর আর দেখা হয়নি তাদের। তারা ঘুমিয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই। আজও তাদের ঘুম ভাঙেনি। ভাঙবে কী করে! রাতের অন্ধকারে পাকিস্তান আর্মি ঘুমন্ত অবস্থায়ই গুলি করে মেরেছিল তাদের। বিছানায় রক্তের লালচে জমাট দাগ। আর শিশুর কোমল দেহে হানাদারদের ছোড়া বুলেটের ক্ষত। এমন সব মর্মস্পর্শী চিত্রের দেখা মিলবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’য়। দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এই জাদুঘরে এমন হাজারো দুর্লভ আলোকচিত্র, তৈলচিত্র, প্রতিকৃতি, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষক, কর্মচারী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের পোশাক-পরিচ্ছদ এবং আসবাবপত্রের নিদর্শন আমাদের যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় একাত্তরের রক্তস্নাত দিনগুলোতে।

বুকের ভেতর ইতিহাস ধরে রাখা শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সব আন্দোলন-সংগ্রামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁরা অবদান রেখেছেন। অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী শহীদ ও আহত হয়েছেন। সেসব বীর সন্তানের আত্মত্যাগ আর যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন স্মরণীয় করে রাখতে এই সংগ্রহশালার যাত্রা শুরু হয়। এটি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯৭৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন কমিটির সভায়। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের তত্কালীন শিক্ষা উপদেষ্টা আবুল ফজল। ৬৬০০ বর্গফুটের এই সংগ্রহশালায় রয়েছে তিনটি অত্যাধুনিক গ্যালারি। মুক্তিযুদ্ধের সংগৃহীত নিদর্শন নিয়ে এটি যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের আন্দোলন-সংগ্রামের নিদর্শনও এখানে জায়গা পেয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ডের মানুষের সামগ্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের একটি চমত্কার সংগ্রহশালা।

ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয় ভাস্কর্যে রূপ নেওয়া গাড়িটি

কিছুদিন আগের কথা। সংগ্রহশালাটিতে গিয়ে দেখি, ক্লাস শেষে দল বেঁধে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। সেই দলে আছেন দোলা, মিনহাজ, শশী, খায়রুল, তহুরা, শাহীন, জীবন ও সাগর হালদার। প্রত্যেকেই গ্যালারি ঘুরে দেখছেন। কেউ অপলক দৃষ্টিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ছবি দেখছেন। কেউ শহীদদের ব্যবহূত জিনিসপত্র দেখে অবাক হচ্ছেন। জানা গেল, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সংগ্রহশালা সবার জন্য খোলা থাকে। এ ছাড়া জাতীয় দিবসগুলোতেও খোলা থাকে এটি। এর মূল ভবনের সঙ্গে রয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ। সেখানে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করে।

কথা হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসতাক আহমেদের সঙ্গে। তিনি দাবি করলেন, ‘আমাদের সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের গুরুত্ব ও তাত্পর্য সম্পর্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ জনগণকে জানাতে হলে সংগ্রহশালার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।’

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সংগ্রহশালার কিউরেটরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ড. সফিকুল ইসলাম। তিনি জানালেন, ‘মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের কোনো নিদর্শনের সন্ধান পেলে আমরা যাচাই-বাছাই করে সংগ্রহ করি।’ তিনি আরো বললেন, ‘এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ এক গ্রন্থাগার। তাতে রয়েছে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সব আন্দোলন-সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বইপত্র। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিষয়ক বই ও দলিল-দস্তাবেজও রয়েছে। তাই বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন দেখাতে, সঠিক ইতিহাস জানাতে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে সংগ্রহশালাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

 

আর কী কী আছে এখানে?

রাজশাহীতে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি, ভাষাশহীদদের প্রতিকৃতি, খালি পায়ে মিছিল, রাজপথে নেমে আসা উত্তাল জনতা, ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল—যাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তখনকার প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা, সাত বীরশ্রেষ্ঠ, বীর বিক্রম, বীর প্রতীক, সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, পঁচিশে মার্চ রাতে পাকিস্তানি আর্মির অতর্কিত হামলা এবং বীর বাঙালির বিজয়োল্লাসের ছবি আছে এখানে। আরো আছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রতিলিপি, বাঁধাইকৃত মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত পোস্টার ‘আমরা সবাই বাঙালী’ এবং চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবী, শামসুল আলম, হাশেম খান, রশীদ চৌধুরী ও দেবদাস চক্রবর্তীর চিত্রকর্ম। রয়েছে শহীদ অধ্যাপক মমিনুল হকের ব্যবহূত পোশাক, স্যুট, ছাতা, লাঠি ও ব্যাগ; পাকিস্তানি আর্মির ব্যবহূত পরিত্যক্ত বুলেট, শেল, গ্রেনেড, রকেট লঞ্চার, কাঠের লাঠি ও পাদুকা; শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিনের ডায়েরি ও পাণ্ডুলিপি। এ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলচিত্র, শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকের ছবি এবং তাঁদের ব্যবহূত জিনিসপত্রও রয়েছে এখানে। আরো রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি থেকে সংগৃহীত নাম না-জানা শহীদদের মাথার খুলি, হাড়গোড় ও ব্যক্তিগত ব্যবহূত জিনিসপত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষক সুখরঞ্জন সমাদ্দার ও মীর আব্দুল কাইয়ুমের স্থিরচিত্র এবং শহীদ কর্মচারী মালেক, এমাজউদ্দিন, এস এম সাইফুল ইসলাম ও ওয়াজেদ আলীর ছবি, তাঁদের ব্যবহূত গ্লাস ও থালা-বাসনও যত্নে রয়েছে এখানে। রয়েছে কর্নেল আবু তাহেরের ব্যবহূত ক্র্যাচ এবং শহীদ ড. শামসুজ্জোহার গবেষণাপুস্তক, ব্যবহূত টাই, প্যান্ট ও কোর্ট।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা