kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

যে আঁধার আলোর অধিক

ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় মানুষকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে, সুলতান কবীর তার চমত্কার উদাহরণ। অভাব অনটন তাঁকে দমাতে পারেনি। দৃষ্টিহীনতা রুখতে পারেনি জয়যাত্রা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই ছাত্র স্নাতকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সর্বোচ্চ সিজিপিএ পয়েন্টধারী। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে




যে আঁধার আলোর অধিক

ডান চোখে আলো নেই তাঁর। বাম চোখেও খুব একটা ভালো দেখেন না। জন্মের পর কোনো এক আঘাতের কারণে চোখে সমস্যা হয়েছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, অপারেশন করলে ঠিক হয়ে যাবে। হাজার পাঁচেক টাকার মতো লাগত। কিন্তু বাবা শাহীন উদ্দিনের তখন নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা। অপারেশন করা হলো না। ছোটবেলা থেকেই গঞ্জনা সয়েছেন সুলতান। ‘কানা’ বলে তাচ্ছিল্য করত লোকে। ক্রিকেট খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু বন্ধুরা দলে নিতে চাইত না। তিনি যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন, একদিন ব্যাট করছিলেন। আউট করতে না পেরে প্রতিপক্ষ এক খেলোয়াড় বলেছিল, ‘ওর চোখ বরাবর মার। বাম চোখটাও কানা হয়ে যাক।’ রাগে-দুঃখে চোখের জল ফেলতে ফেলতে সেই যে মাঠ ছেড়েছেন, আর কখনো ওই মুখো হননি। 

বইবন্ধু

বন্ধুদের অবহেলায় সুলতান বন্ধুত্ব পাতলেন বইয়ের সঙ্গে। ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলতে যা বোঝায়, ওর আসলে তাই। কোনো জিনিস একবার পড়লেই দাড়ি-কমাসহ সব বলে দিতে পারতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে রোল নম্বর ছিল ৯। পঞ্চম শ্রেণিতে হলেন সবার সেরা। সেই যে প্রথম হয়েছিলেন, এখন পর্যন্ত আর দ্বিতীয় হননি কখনো।

অঙ্কের উড়োজাহাজ

খয়ের হুদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সুলতানের প্রথম স্কুল। অঙ্ক শিক্ষক মফিজুর রহমান ওকে ডাকতেন ‘অঙ্কের উড়োজাহাজ’ বলে। কাগজ-কলম নয়, মুখে মুখেই পাঠ্য বইয়ের সব অঙ্কের সমাধান করে দিতে পারতেন সুলতান। আড়াই ঘণ্টার পরীক্ষা দিতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় নিতেন না। তেমনই একবার নির্ধারিত সময়ের আগে খাতা জমা দিয়ে পরীক্ষার হলের বাইরে এসেছিলেন। সেই ফাঁকে ক্লাসের সেকেন্ড বয় কায়দা করে ওর খাতার বেশ কয়েকটি অঙ্ক কেটে দিয়েছিল। খুব মন খারাপ হয়েছিল ওর। মফিজ স্যার বললেন, ‘মন খারাপ করিস না। তুই বৃত্তি পরীক্ষা দে। স্কুলে তো বটেই, থানায়ও ফাস্ট হবি।’ সেবার ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন সুলতান।

এক ইউনিফর্মে তিন বছর

ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির টাকা নেই। মফিজ স্যার এগিয়ে এলেন। কিন্তু হাই স্কুলে ইউনিফর্মের জন্য প্রায়ই কথা শুনতে হতো। মারও খেয়েছেন। সেভেনে ওঠার পর প্রথম ইউনিফর্ম পেলেন। এই ইউনিফর্মেই পরের দুটি বছর পার করলেন। অষ্টম শ্রেণিতেও বৃত্তি পেয়েছিলেন। ক্লাসের ফার্স্টবয় হয়েও নবম শ্রেণিতে বেছে নিলেন মানবিক বিভাগ। কারণ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার খরচ জোগাবেন কী করে!

ছোট কাঁধে গুরুভার

পরিবারের বড় ছেলে সুলতান। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন খবর পেলেন, বাবা হাসপাতালে। স্ট্রোক করেছেন। ডাক্তার জানালেন, ‘ভারী কাজ করা চলবে না। শুয়ে-বসে কাটাতে হবে বাকি জীবন।’ মা-বাবা আর বোনকে নিয়ে অথৈ জলে পড়লেন সুলতান। এত দিন না হয় অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটিয়েছেন। এবার? ১৪ বছরের এক বালকের কাঁধে সংসারের সব ভার! মা নিলুফা ইয়াসমিন ছিলেন এসএসসি পাস। বললেন, ‘আয়, আমরা টিউশনি শুরু করি।’ বাবা বিছানায়। ছোট বোন প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। মা-ছেলে টিউশনি শুরু করলেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দুজনে মিলে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতেন। যা পেতেন, তাই দিয়ে কোনোমতে চলে যেত। টিউশনি করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে ক্লাস মিস দিতে হতো। ফলাফল ২০১২ সালে জিপিএ ৪.৪৪ পেয়ে এসএসসি পাস করলেন। ভর্তি হলেন উথলী মহাবিদ্যালয়ে। কলেজের বন্ধুরা যখন আড্ডা দিচ্ছে, দল বেঁধে ঘুরতে যাচ্ছে কিংবা সিনেমা দেখছে, সুলতান তখন বিরামহীন টিউশনি করিয়ে গেছেন। রাত ১০টার আগে কখনো পড়ার টেবিলে বসতে পারেননি। শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি। কিন্তু ক্লান্তিকে পাত্তা দিলে সুলতানের চলবে কেন?

এক টাকার মূল্য

রাত ১০টা থেকে একটা-দেড়টা পর্যন্ত পড়তেন সুলতান। বললেন, ‘আমি জানি আসলে এক টাকার মূল্য কত!’ দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্লাসে একবার ইংরেজির শিক্ষক ঘোষণা দিলেন, ‘পরীক্ষায় যে প্রথম হবে, তাঁকে বই দেওয়া হবে।’ এর আগে খুব একটা ইংরেজির ক্লাস করেননি তিনি। তবু সেবার ২০০ জনের মধ্যে তিনিই প্রথম হয়েছিলেন। ক্লাসে ঢুকে শিক্ষক বললেন, ‘যে প্রথম হয়েছে, তাকে আমি ঠিকমতো চিনি না। তোমরাও না। সে ১০০ মধ্যে ৮৬ পেয়েছে। দ্বিতীয়জন পেয়েছে ৬৬।’ ক্লাসের সবাই হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিল সুলতানকে। বললেন, ‘সেই দিনের কথা কখনো ভুলব না। বুঝেছিলাম, পরিশ্রম করলে সেরা হওয়া যায়। সেই থেকে যেকোনো পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার নেশা পেয়ে বসেছিল আমাকে।’

তুই তো পাস করবি না

টেস্ট পরীক্ষার মাত্র তিন দিন আগে অর্থনীতির বই কিনেছেন। দোকানদার বলেছিল, ‘কাল বাদে পরশু পরীক্ষা। তুই তো পাস করবি না।’ অন্যদিকে এইচএসসির ফরম ফিলআপের ফি দুই হাজার ৮০০ টাকা। একটা ছাগল ছিল, সেটা বিক্রি করে ছেলের হাতে টাকা তুলে দিলেন মা। সেবার এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে যশোর বোর্ডে ২৬তম হয়েছিলেন সুলতান।

সুযোগ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

এইচএসসির পর গরু বিক্রির টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে সুযোগ পেলেন। কিন্তু উত্তীর্ণ হলেই তো হলো না। তাঁর জন্য পথে পথে কাঁটা বিছানো থাকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় এক শিক্ষক বলেছিলেন, ‘এটা অ্যারিস্টোক্রেটিক সাবজেক্ট। পুরো ইংলিশ ভার্সনে পড়াশোনা। তোমার চোখে সমস্যা। তুমি পারবে না!’ আত্মবিশ্বাসী সুলতান জবাব দিয়েছিলেন, ‘না স্যার, আমি পারব।’ একে ছিল অর্থসংকট, তার ওপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল আগে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হলো না তাঁর।

কোথাও কেউ নেই

ভর্তির আগে রাজশাহীতে আসেননি কখনো। উঠলেন স্টেশন বাজার মেসে। ক্যাম্পাসে একেবারেই নতুন। তার ওপর পোশাক-আশাক ফিটফাট না। ওকে কেউ-ই পাত্তা দিতে চাইত না। তাঁর সব সময় মনের ভেতর অজানা আতঙ্ক কাজ করত। ক্লাসেও তাল মেলাতে পারছিলেন না। বসতেন লাস্ট বেঞ্চে। বললেন, ‘বোর্ডে স্যার লিখতেন। অন্যরা সেটা টুকে নিত। কিন্তু দূরের জিনিস দেখতে পাই না বলে, বসে বসে কলম কামড়ানো ছাড়া আমার কিছুই করার ছিল না। অঝোরে কাঁদতাম।’ ক্লাস শেষে সহপাঠীদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি করতে গেলে সবাই তাচ্ছিল্যের সুরে কথা বলত। বললেন, ‘ফোন করলে কেউ ধরতে চাইত না। টেক্সট করলে উত্তর আসত না।’ রাগে-দুঃখে কয়েকবার বাসায় চলে গিয়েছিলেন। বাসায় গিয়ে বলতেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় দরকার নেই। আমাকে ডিগ্রিতে ভর্তি করিয়ে দাও।’ একপর্যায়ে সুলতানের মা-বাবা ক্যাম্পাসে এসে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি।

মায়ের জন্য

একবার এমন দুঃখে বাড়ি ফিরে গেলেন। পুরনো খাতাপত্র ঘাঁটতে গিয়ে দেখলেন, মায়ের ডায়েরির এক জায়গায় লেখা, ‘আমার ছেলেকে রহমত করো আল্লাহ। পড়াশোনা ওর মাথায় ঢোকাইয়া দাও।’ এটা পড়ে যেন উদ্যম ফিরে পেলেন সুলতান। নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন, ‘মা এত কষ্ট করেন, আর আমি কি না হাল ছেড়ে দিচ্ছি!’ ক্যাম্পাসে ফিরে প্রতিজ্ঞা করলেন—‘আমাকে পারতেই হবে।’

শিক্ষকের হাত

ক্লাস শেষে একদিন মন খারাপ করে বসে ছিলেন। ওকে ডাকলেন সহকারী অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম। বললেন, ‘কাল থেকে আমার ক্লাসে তুমি প্রথম বেঞ্চে বসবে। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে সোজা আমার রুমে চলে এসো।’ বেশ অনুপ্রাণিত হলেন সুলতান। এরপর প্রথম যে ক্লাস টেস্ট হলো, তাতে ১০-এ ৯ পেয়ে প্রথম হলেন সুলতান। স্যার বললেন, ‘ভয় পাস কেন? তুই তো ফার্স্ট হবি।’ স্যারের কথা ফলে গেল। প্রথম বর্ষের ফলে সুলতানই সবার সেরা। চতুর্থ বর্ষে এসেও সেটি ধরে রাখলেন। ৫ মার্চ প্রকাশিত অনার্সের চূড়ান্ত ফলে দেখা গেল, সিজিপিএ চারের মধ্যে ৩.৮০ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন তিনি। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোট ১১টি বিভাগের মধ্যে সবাইকে টপকে সর্বোচ্চ সিজিপিএধারী ছাত্রের নামও সুলতান!

বিদেশ থেকে ডাক

ইংরেজিতেও দারুণ দক্ষ সুলতান। ক্যাম্পাসের ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, ক্যারিয়ার ক্লাব ও ইউনিসেফের ইয়ুথ প্রগ্রামে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। স্নাতক সম্পন্ন হওয়ার আগেই অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও কানাডার বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন।

চন্দ্র নাথ ও বাদল সৈয়দ

‘আমার জীবনের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছেন দুজন মানুষ। একজন চন্দ্র নাথ স্যার (হিটাচি আমেরিকায় কর্মরত বাংলাদেশি প্রকৌশলী), অন্যজন পে-ইট ফরোয়ার্ডের পরিচালক বাদল সৈয়দ। চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় একদিন ফেসবুকে চন্দ্র নাথ স্যারের একটি অনুপ্রেরণামূলক পোস্ট পড়লাম। তাঁকে মেসেজ দিতেই উত্তর এলো। এরপর থেকে স্যারের সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করতাম। তিনি আমাকে সন্তানের মতো দেখেন। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ ফাউন্ডেশন থেকে বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। অন্যদিকে বাদল স্যারের কাছ থেকেও সব সময় মানসিক সমর্থন পেয়েছি।’

আকাশছোঁয়া স্বপ্ন

দেশের পাঠ চুকিয়ে পড়তে চান অক্সফোর্ড কিংবা কেমব্রিজে। হতে চান গবেষক। বললেন, ‘মানুষ যদি সত্ থেকে কঠোর পরিশ্রম করে, তাহলে কোনো কিছুই অজেয় নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আমি বদলে দিতে চাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা