kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

স্বপ্নবাজদের পাঠশালা

মো. আব্দুল হালিম   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বপ্নবাজদের পাঠশালা

শুরুটা করেছিলেন জিল্লুর রহমান রিয়াদ নামের এক কিশোর। ছোট থেকেই বই পড়ার প্রতি তাঁর ভীষণ আগ্রহ ছিল। যেখানেই বই পেতেন, ধার করে নিয়ে পড়তেন। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে পছন্দের বই কিনতেন। স্বপ্ন দেখতেন গ্রামে একটি লাইব্রেরি করার। আর এই স্বপ্ন থেকেই বন্ধু শোয়াইব হাসান শিবলীসহ বই পড়ায় আগ্রহী ছেলে-মেয়েদের খোঁজ করা শুরু করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী কবির, সোয়াদ, তামিম, নাহিদ, মাসুদ, সোহান, তুষার, জাহিদ, সুন্নান, তায়্যিব, মিঠুন, মেহেদি, মিঠু, সিফাত, কিমিয়া, সারওয়ার ও আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে একসময় প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাগ্রত আছিম গ্রন্থাগার’।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হয় শিক্ষানগরী। আর এর মূল কেন্দ্র হচ্ছে আছিম নামের এলাকাটি। উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণে এর অবস্থান। রিয়াদ ২০১৪ সালে ‘জাগ্রত আছিম’ নামে একটি ফেসবুক আইডি খোলেন। সেখানে বই পড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রচারণা চালান। এটা এলাকার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়।

২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল তারা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এস এম সাইফুজ্জামানের শরণাপন্ন হয়। আছিম-পাটুলি ইউনিয়নের পুরনো কার্যালয়টি লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দেন তিনি। অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়। সংস্কার করা হয় পুরনো ইউপি ভবনটি। ২০১৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘জাগ্রত আছিম গ্রন্থাগার’। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লীরা তরফদার লাইব্রেরিটি পরিদর্শনও করেছেন। বিকেলে গ্রামের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সংবাদপত্র ও বই পড়ার আড্ডা বসে অনেকটা গ্রন্থাগারটি ঘিরেই। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন লেখকের কয়েক শ বইও রয়েছে। জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা রাখা হয়। স্কুল শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরির সদস্য হয়ে বিনা মূল্যে বাড়িতে বই নিয়ে পড়তে পারে। কলেজের শিক্ষার্থীরা সদস্য হওয়ার পর বাড়িতে বই নিয়ে পড়তে চাইলে মাসে ৩০ টাকা (বাধ্যতামূলক নয়) দিতে হয় পাঠাগারের ফান্ডে। শিক্ষক, চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীরাও নিয়মিত বই ও পত্রিকা পড়েন।

সেদিন গিয়ে দেখলাম, গ্রন্থাগারটিতে স্কুল-কলেজের আট থেকে ১০ শিক্ষার্থী বসে গল্পের বই, পাঠ্য বই ও পত্রিকা পড়ছে।

আছিম আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র শাকিল আহামেদ বলল, লাইব্রেরিটিতে গল্প, কবিতা, উপন্যাস পড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় কাটাই। এলাকার শিক্ষক এবং বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা আসেন। তাঁদের কাছে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন এবং উচ্চশিক্ষার গল্প শুনি। আছিম শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নান মহসিনা বলে, সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন লাইব্রেরিতে আসা হয়। গ্রামের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই উচ্চ মাধ্যমিকের একাডেমিক পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে যেকোনো একজন লেখকের বই কেনে। এখানে একই বিষয়ে একাধিক লেখকের বই পড়া যায়।

আছিম আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হাকিম বলেন, আগে দেখতাম ক্লাসের ফাঁকে শিক্ষার্থীরা মাঠে আড্ডা দিচ্ছে। এখন অনেকেই গ্রন্থাগারে গিয়ে বই ও পত্রিকা পড়ে সময় কাটায়।

কথা হলো জাগ্রত আছিম গ্রন্থাগার কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি মো. হুমায়ুন কবির এবং সাধারণ সম্পাদক শোয়াইব হাসান শিবলীর সঙ্গে। জানতে পারলাম, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রচনা, বিতর্ক ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন, নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজন করা হয় পাঠাগারটির পক্ষ থেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন মানুষকে বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করেন তাঁরা।

গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা জিল্লুর রহমান রিয়াদ বলেন, ‘আমাদের বইয়ের সংখ্যা কম। বই রাখার জন্য শেলফের প্রয়োজন অনেক দিন থেকেই। পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই। তা ছাড়া পরিত্যক্ত সরকারি ভবন ব্যবহার করার কারণে ঝুঁকিতে থাকতে হয়। এত কিছুর পরও তরুণ, উদ্যমী পাঠকরা এই গ্রন্থাগারকে আরো অনেক দূর নিয়ে যাবে বলে আশা করি।’

 

 

মন্তব্য