kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

আলো ছড়ায় অরং

আবু দাউদ   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আলো ছড়ায় অরং

খাগড়াছড়ির পানখাইয়াপাড়া সড়ক লাগোয়া পুরনো এক জনপদ ‘চাইহ্লাউপাড়া’। এই ছোট্ট পাড়ার ছেলে উহ্লাপ্রু মারমা। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা শুরু করার সময়ই বই পড়ার নেশা পেয়ে বসে তাঁকে। দিনে দিনে বই সংগ্রহ করাটাও তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়ে ওঠে। এটা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ও শেষের ঘটনা। উহ্লাপ্রু টিফিনের জন্য মা ও দাদির দেওয়া পয়সাটিও রেখে দিতেন। টাকার পরিমাণ কিছুটা বাড়লেই ওই টাকায় বই কিনতেন। এমনও গেছে যে টাকা ধার করে হলেও বই কিনেছেন। রাজনৈতিক দর্শন, বিশ্ব ইতিহাস, মনীষীদের জীবন কাহিনি, আদিবাসী জীবন-সংস্কৃতি, প্রকৃতিনির্ভর বইগুলোর প্রতি ছিল অন্য রকম আকর্ষণ। এ সময় নিজের ঘরেই বই পড়ার ব্যবস্থা করলেন উহ্লাপ্রু। কেউ কেউ বই নিয়েও যেত। একটা সময় ছোট রেজিস্টার খাতা খোলেন। সেখানে পাঠকের নাম, ঠিকানা ও বইয়ের নাম লিপিবদ্ধ করে বই নিয়ে যেত স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। যোগ হন এলাকার বড়রাও।

১৯৯৯ সালের দিকে দাদি উক্রা মগিনীর অনুমতি নিয়ে পুকুরে মাছ ছাড়ার উদ্যোগ নিলেন উহ্লাপ্রু। এক বছরেই মাছ বিক্রিতে লাভ হলো ১৫ হাজার টাকা। জেলা শহরের পুরনো ‘গণি লাইব্রেরিতে’ গিয়ে পুরো টাকা দিয়ে বই কিনে আনলেন।

উহ্লাপ্রু মারমা বলেন, ‘২০০৩ সালের পাহাড়ে বর্ষবরণ উত্সবের সাংগ্রাইয়ে এসেছিলেন ভ্রমণ লেখক মাহবুব আলম পল্লব (বর্তমানে কালের কণ্ঠ’র সাংবাদিক)। তাঁর উত্সাহে হঠাত্ হঠাত্ চলে যাওয়া শুরু করলাম ঢাকায়, উদ্দেশ্য বই সংগ্রহ। পল্লব ভাই ঢাকার অনেক লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও প্রকাশকের কাছে বইয়ের আবেদন জানিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন। তারপর অনেকেই আমার জন্য বই পাঠালেন। কারো কারো বাসায় গিয়েও বস্তা ভর্তি করে বই এনেছি।’

অবশেষে বই পড়াকে আন্দোলনে রূপ দিতে ২০০৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর এলাকার আরো কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরি গড়ে তোলেন উহ্লাপ্রু। নাম দেওয়া হয় ‘অরং লাইব্রেরি’। মারমা ভাষায় ‘আলো লাইব্রেরি’। দাদি উক্রা মগিনী লাইব্রেরির জন্য দুই শতক জমি দান করেন। প্রথম দিকে বাঁশের বেড়া আর টিন দিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে জেলা পরিষদের ২০ হাজার টাকার অনুদান আর নিজেদের অর্থে ভবন তৈরি করা হয়। বই পড়া কর্মসূচি ছাড়াও মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা রাখে এই লাইব্রেরি। ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের একজন ভান্তে বিনা পারিশ্রমিকে মারমা বর্ণমালা শেখাতেন। মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, পাখি মেলা, পাঠচক্র, চিত্রাঙ্কন, আর্ট প্রদর্শনীসহ নানা সৃজনশীল কাজ হাতে নেওয়া হয়। 

অরং লাইব্রেরির স্বপ্নদ্রষ্টা উহ্লাপ্রু মারমা জানান, মাহবুব আলম পল্লব ছাড়াও রেমন পাবলিকেশনের পরিচালক রাজন, সাংবাদিক গনি আদম বই সংগ্রহ করে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। শাহাদাত ও সাথোয়াইয়ের পরামর্শ, উশচিং, নিউক্রা, রিম্রচাই, বাঁশরি মারমার অবদানের কথাও বলতে ভোলেননি।

লাইব্রেরিতে বই আছে এক হাজারের বেশি।

অরং লাইব্রেরিতে এসে বই পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠছেন অনেক ছাত্র-ছাত্রীই। খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির কেথিন মারমা জানায়, কয়েক বছর ধরেই সে লাইব্রেরিতে এসে বই পড়ছে। এতে ক্লাসের পড়ার বাইরেও জ্ঞানের পরিধি বাড়ছে।  নতুন কুঁড়ি হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র চমং রাখাইন জানাল, নিজের পাড়ায় লাইব্রেরির কারণে তার বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে। 

উহ্লাপ্রু মারমা এখন জেলার মহালছড়ির দুর্গম গঙ্গামাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের এখনো বই পড়তে উত্সাহ দেন।

তবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ আর মোবাইলের কারণে বই পড়ায় আগ্রহ কিছুটা কমেছে বলে তার ধারনা। তার পরও অরং লাইব্রেরি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। লাইব্রেরিটি অবশ্য সপ্তাহের প্রতিদিন খোলা থাকে না এখন।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা