kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

রাজধানীর বুকে প্রাণোচ্ছল এক সবুজ ক্যাম্পাস

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



রাজধানীর বুকে প্রাণোচ্ছল এক সবুজ ক্যাম্পাস

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)। এটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম হিসেবে হয়েছে তালিকাভুক্ত। রাজধানীর মাদানি এভিনিউর ইউনাইটেড সিটিতে ২৫ বিঘা জমিতে রয়েছে এটির ১৩ তলাবিশিষ্ট নিজস্ব ক্যাম্পাস। এর মধ্যে রয়েছে ২০ বিঘার বিশাল সবুজ মাঠ। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপপরিচালক ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আবু সাদাতের সহযোগিতায় সবুজ এই ক্যাম্পাসের কথা জানাচ্ছেন জামিল মাহমুদ

 

শাটল বাস

শাটল ট্রেনের নাম শুনলেও ইউআইইউতে ভর্তি হয়ে এবারই প্রথম শাটল বাসের কথা শুনলেন ফাতেমী আহমেদ রুমী। সিএসই দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন তিনি। জানালেন, প্রতিদিন বাড্ডার নতুনবাজার মোড় থেকে শাটল বাস ছাড়ে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে। পৌঁছতে লাগে পাঁচ মিনিট। সকালে ক্লাসের পর মাঝখানে বিরতি দিয়ে বিকেলে আবার ল্যাবের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস থাকে। রুমীর বাসা নতুনবাজারেই। তাই বিরতির সময়ে শাটল বাসে চড়ে নিমেষেই বাসায় যাতায়াত করতে পারেন। এ জন্য গুনতে হয় না বাড়তি ভাড়া। শাটল বাস ছাড়াও এ ক্যাম্পাসে রয়েছে ১২টি দ্বিতল বাস। ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করে এগুলো।

কিছুদিন আগে, এক সকালে বাড্ডার নতুনবাজার মোড় থেকেই শাটল বাসে চড়ে রুমীর সঙ্গে এলাম ইউনাইটেড সিটিতে থাকা ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সবুজ প্রাঙ্গণে। ঘড়ির কাঁটা গুনে মাত্র পাঁচ মিনিটই লাগল। চোখের সামনেই এ সিটিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লাল ইটে মোড়া আট লাখ বর্গফুটের ১৩তলা নান্দনিক ভবন। সামনে ২০ বিঘা জায়গায় সবুজ খোলা মাঠ। এ মাঠে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলা যায়। এর উত্তর পাশে দেখা মিলবে লেকের। নগরজীবনে পড়াশোনা করতে এসে প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যায়—এমন পরিবেশেই নির্মাণ করা হয়েছে এই সবুজ ক্যাম্পাস।

 

একনজরে ইউআইইউ

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতেই শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়েছে এই ক্যাম্পাসে। এর আগে ২০০৩ সালে রাজধানীর ধানমণ্ডির ১৫ নম্বরে ৭৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু। এখন ছয় হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আছেন দুই শতাধিক শিক্ষক। এর মধ্যে বুয়েট, উত্তর আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক আছেন ৪৫ জন। এখানে পড়ানো হয় ব্যবসায় প্রশাসন, বিবিএ ইন অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, ইকোনমিকস, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং। এ ছাড়া শিগগিরই ইংরেজি, ফার্মেসি ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট চালু হবে। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে রয়েছে এমবিএ, ইভিনিং এমবিএ, অর্থনীতিতে মাস্টার্স, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, মাস্টার ইন ইন্টারন্যাশনাল এইচআরএম ও কম্পিউটার সায়েন্সসহ ছয়টি বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি নেওয়ার সুবিধা। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ক্যাম্পাসে রয়েছে ৭০০ আসনের অডিটরিয়াম।  আরো আছে স্টাডি কর্নার, নামাজের ঘর, আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ জিমনেশিয়াম, খেলার রুম, স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন এবং মেয়েদের জন্য আলাদা কমনরুম।  রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের মাল্টিমিডিয়া ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ১০০টি স্মার্ট ক্লাশরুম। ওয়াই-ফাই ও সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রিত। নিচতলায় রয়েছে বিক্রমপুর, খান কিচেন ও অলিম্পিয়া ক্যাফে। এগুলোর দেয়ালে ঝোলানো আছে খাবারের মূল্যতালিকা।

আইবিইআর : ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (আইবিইআর) ও বিএসএইচআরএমের যৌথ উদ্যোগ এখানে পিজিডিএইচআরএম ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হয়। এ ছাড়া চাকরির বাজারে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন ধরনের সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনা করা হয়। 

সিডিআইপি : বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অব আইটি প্রফেশনালসের (সিডিআইপি) মাধ্যমে ইউআইইউয়ের আইটি শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রি উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রফেশনাল আইটি ট্রেনিং দেন অভিজ্ঞ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ চলাকালে ইন্ডাস্ট্রির বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদানের লক্ষ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হয়।

বর্তমানে সিডিআইপিতে রয়েছে গ্রাফিকস ডিজাইন, মোবাইল অ্যাপলিকেশন ডেভেলপমেন্ট, এএসপি ডট নেট এমডিসি, প্রফেশনাল পিএইপি ও ওপি, পাইথন জাঙ্গো, বিগ ডাটা অ্যানালিসিস, প্রফেশনাল সি প্লাস, ্ওয়েব ডিজাইন, গেম ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, অ্যাকাউন্টিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রফেশনাল জাভা প্রশিক্ষণসহ ১০টি কোর্স।

ভিএলএসআই : চালু আছে ভিএলএসআই কোর্স। এ জন্য ২২ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে ক্যাডেন্স টুল। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অ্যানালগ ও ডিজিটাল—উভয় ধরনের ইন্টেগরেটেড সার্কিট (আইসি) তৈরি করতে পারেন। গত এক বছরে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণটি দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে অ্যাডভান্সড ইনটেলিজেন্ট মাল্টি ডিসিপিলিনারি সিস্টেমস বা এইমস ল্যাব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণার জন্য আছে সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ বা জ্বালানি গবেষণা কেন্দ্র। এ ছাড়া আছে সার্কিট ল্যাব, ফিজিক্যাল ল্যাব, কেমিস্ট্রি ল্যাব, কম্পিউটার ল্যাব, মেশিন অ্যান্ড পাওয়ার সিস্টেম ল্যাব, কমিউনিকেশন ল্যাব, ডিজিটাল ডিজাইন ল্যাব, মাইক্রোপ্রসেসর ল্যাব, ইলেকট্রনিকস ল্যাবসহ ৩০টি ল্যাব।

 

এইমস ল্যাব

কম্পিউটার সায়েন্স, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণা ও উন্নয়নে কাজ করছে এইমস ল্যাব। পুরো নাম অ্যাডভান্সড ইনটেলিজেন্ট মাল্টি ডিসিপিলিনারি সিস্টেমস ল্যাব। ২০১৪ সালে এই ল্যাবের যাত্রা শুরু। ল্যাবে মেশিন লার্নিং, ডাটা মাইনিং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োইনফরমেটিকস নিয়েও গবেষণা করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে তিনটি আইসিটি অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল সিডস্টার আয়োজিত বিশ্বের সেরা ১২টি উদ্ভাবনীর মধ্যে একটির জন্য পুরস্কার পেয়েছে এইমস ল্যাব। এই ল্যাবের গবেষণার ফসল সিএমইডি স্বয়ংক্রিয় ডিভাইসের মাধ্যমে শরীরের রক্তচাপ, ব্লাড সুগার এবং বিএমআই নিরূপণ করতে পারে। অন্ধ ও বিকলাঙ্গদের জন্য নতুন অ্যাপস ও ডিভাইস তৈরি করেছে এই ল্যাব। ল্যাবের পরিচালক খন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা নতুন প্রযুক্তি তৈরি ও প্রতিবন্ধীদের কাছে নানা ধরনের প্রাযুক্তিক সুবিধা পৌঁছে দিতে বিজনেস মডেল তৈরি করি। এরই মধ্যে এটুআইয়ের অর্থায়নে অটিজম স্ক্যানিং ডিভাইস বানিয়েছি। ফলে কোনো শিশু অটিজমে আক্রান্ত কি না তা সহজে পরীক্ষা করা যাবে। এখন আইসিটি মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় দরিদ্র শিশুদের স্বাস্থ্যগত সুবিধা দেওয়ার জন্য গবেষণা করছি।’

 

পাশে দাঁড়ায় শিক্ষা বৃত্তি

‘সবচেয়ে বেশি শিক্ষা বৃত্তি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া হয়’—বলছিলেন উপপরিচালক ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আবু সাদাত। তিনি জানালেন, প্রতিবছর স্প্রিং, সামার এবং ফল সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ২৫ শতাংশ এবং গোল্ডেন ৫ পাওয়াদের জন্য ৫০ শতাংশ পর্যন্ত টিউশন ফি ছাড়ের সুবিধা। প্রতি সেমিস্টারের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৃত্তি লাভ করে। এর মধ্যে ৪ শতাংশ শতভাগ, ৬ শতাংশ ৫০ ভাগ আর বাকি ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী পায় ২৫ ভাগ বৃত্তি। ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বৃত্তি। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থাও।

গবেষণায় দুরন্ত সিইআর

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক দোকান ও বাড়িতে জ্বলছে সৌরবিদ্যুতের আলো। ২০১৪ সাল থেকে ইডকলের সহায়তায় এখানে সৌরশক্তি ব্যবহার করে ১৪১ কিলোওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হচ্ছে। অন্যদিকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের পলাশী-ফতেহপুর গ্রামে উত্পাদিত হচ্ছে ১৪১ কিলোওয়াট এবং ভোলার মনপুরা উপজেলার বাংলাবাজার, মাস্টারহাট ও আশপাশের এলাকায় ১৭৭ কিলোওয়াট বিদ্যুত্। ফলে ৬৬১ জন গ্রাহকের বাড়ি, দোকান ও দুটি বাজার আলোকিত হয়েছে, একটি বরফকল চলছে। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহীর গ্রামে চালু আছে এসব প্রকল্প।

নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি গবেষণার জন্য ইউআইইউতে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের (সিইআর)। এর উদ্দেশ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, নীতিমালা গঠন এবং এর যথাযোগ্য ব্যবহারের উপায় নিয়ে গবেষণা করা। এ জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু মোকাবেলায় ৫০টি প্রকল্প পরিচালনা করা হয়েছে গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ সোলার হোম সিস্টেমের বাতি, চার্জার, এসি-ডিসি কনভার্টার ও ব্যাটারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এই ল্যাবে। এ ছাড়া সোলার প্রযুক্তির ওপর দেড় হাজার প্রকৌশলীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সিইআরের পরিচালক ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি ‘স্মার্ট ভিলেজ ন্যানোগ্রিড’ প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং একটি ‘সোলবক্স মিটার’ তৈরি করেছেন। এই মিটার দিয়ে গ্রাহকরা সৌরবিদ্যুত্ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবেন। ২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তাঁর ‘পিয়ার-টু-পিয়ার স্মার্ট ভিলেজ গ্রিড’ গবেষণা প্রকল্প মরক্কোতে জাতিসংঘের ২২তম জলবায়ু সম্মেলনে ‘ইউএন মোমেন্টাম ফর চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০১৬ সালের ২২-২৪ জুন জার্মানির মিউনিখে ‘ইন্টার সোলার অ্যাওয়ার্ড ২০১৬’ জিতেছে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সপ্তাহ ২০১৬’ উপলক্ষে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় ইউআইইউর ‘অটোমেটেডে ইরিগেশন সিস্টেম ইয়ুথ স্মার্ট মনিটরিং’ প্রকল্পটি ‘অদম্য বাংলাদেশ-২০১৬’ পুরস্কার জিতে নেয়। গত বছরের ৫ ও ৬ জুলাই মুম্বাইতে অনুষ্ঠিত সপ্তম ওয়ার্ল্ড এডুকেশন কংগ্রেসে শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী অর্জন করেন সম্মানজনক ‘এডুকেশনাল লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি, ভোলার মনপুরায় বিদ্যুত্ ছিল না। সন্ধ্যা হতেই মানুষের সব কাজ থেমে যেত। লোকজন বাড়ি চলে যেতেন। এখন সেখানে এই প্রকল্পের মাধ্যমে সব জায়গায় আলো জ্বলছে।’

তাঁর সঙ্গে সহকারী গবেষক হিসেবে কাজ করেন কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ছাত্র। এর মধ্যে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক ছাত্র রাশেদুল হাসান ছিলেন ‘নেট মিটারিং’ ডিভাইস তৈরির টিম মেম্বার। এটি বিদ্যুত্ অফিসে স্থাপন করা হবে। সংযোগ দেওয়া বিদ্যুত্ লাইনে ত্রুটির অবস্থান এটির জিপিএস জানিয়ে দেবে। এ ছাড়া অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগের খবর পৌঁছে দেবে বিদ্যুত্ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে। সোলার স্টোভ উদ্ভাবনের টিমে কাজ করেছেন আরেক গবেষক আরিফুর রহমান। এ চুলায় সূর্যের আলো ব্যবহার করে পাঁচ সদস্যের পারিবারিক রান্না ও দৈনন্দিন জীবনের সব কাজ করা সম্ভব। তিনি বললেন, ‘রান্নার সময় যে ধোঁয়া বের হয়, সেটি নলের মাধ্যমে আরেকটি চুলার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে সেই গরম তাপেই অন্য চুলায় রান্না করা যাবে। এই চুলা ব্যবহার করতে খরচ পড়বে ৩০০-৩৫০ টাকা।’

অন্যদিকে ‘সৌরচালিত সেচ পদ্ধতি’ উদ্ভাবনের টিমে কাজ করেছেন মাহমুদ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘এক কেজি বোরো ধানের জন্য সাধারণত সাড়ে তিন থেকে চার হাজার লিটার পানি খরচ হয়। আমার এই পদ্ধতিতে প্রয়োজন হবে এক-দেড় হাজার লিটার পানি।’ এ জন্য জমিতে একটি তাপমাত্রা পরিমাপক ডিভাইস রাখা হবে। সেটি চাষি বা জমির মালিকের মোবাইলে সংযুক্ত থাকবে। ফলে কখন জমিতে পানি লাগবে, তা এসএমএসের মাধ্যমে তাঁকে জানানো হবে। ডিভাইসটির মাধ্যমে জমির আর্দ্রতা, আবহাওয়াগত তথ্য ও মাটির তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হবে। তাই কোন জমিতে কী ধরনের ফসল ভালো হবে, সহজেই জানা যাবে। এ ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য আলট্রাসনিক সেন্সরসংবলিত সাদা ছড়িও বানাচ্ছেন তিনি।

আলো ছড়ানো একজন শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এই সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ (সিইআর) গবেষণাগারটি বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও গবেষণায় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে।

বইয়ের ভুবন

টেবিলে ল্যাপটপ রেখে খাতায় কিছু একটা লিখছেন মারুফ হোসাইন। আছেন মো. ইব্রাহিম, আবদুল্লা আল মামুন, সারোয়ার হাসানও। তাঁরা ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। মারুফ বলেন, ‘ক্লাস শেষে প্রতিদিন লাইব্রেরিতে চলে আসি। নিরিবিলি পরিবেশ, হাত বাড়ালেই পাই প্রয়োজনীয় বইপত্র।’ বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ভবনের নিচতলায় অবস্থান ১৬ হাজার ৫৫০ বর্গফুটের এই লাইব্রেরিটির। মূল ফটকের দুই পাশে রয়েছেন পাঁচজন গেটকিপার। তাঁরা লাইব্রেরি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত বই, ব্যাগ, ছাতা ইত্যাদি যা লাইব্রেরিতে নিয়ে ঢোকা নিষেধ—সেগুলো সযত্নে রেখে দেন। ডান পাশে ওয়াই-ফাই সংযোগসহ আছে ১৫টি কম্পিউটার। দেয়ালে রয়েছে উইলিয়াম শেকসপিয়ার, নিউটন, আইনস্টাইন, জয়নুল আবেদিন, জসীমউদ্দীন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ছবি। এরপর রয়েছে নিউজপেপার কর্নার, এই কর্নারটি সাজানো হয়েছে আকর্ষণীয় আসবাব দিয়ে। এর পাশেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, যা গ্রন্থাগারকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মুক্তিযুদ্ধ কর্নারটি সাজানো হয়েছে তিনটি বইয়ের আঙ্গিকে; যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে  ‘হিস্টোরি অব বাংলাদেশ’, ‘দ্য ফাদার অব নেশন’ এবং ‘দ্য লিবারেশন ওয়ার ১৯৭১’। সেই সময়ের কিছু ছবি তুলে ধরা হয়েছে তিনটি বইয়ের প্রচ্ছদে। বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুসংক্রান্ত সব উল্লেখযোগ্য বইয়ের সংগ্রহ দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে এই কর্নারটি। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’,  ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’, ‘মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান’,  ‘মুক্তিযুদ্ধপঞ্জি’, ‘বীরাঙ্গনা সমগ্র’, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘২৬৬ দিনে স্বাধীনতা’, ‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আর এক নাম’, ‘সংবাদপত্রে ভাষা আন্দোলন ১৯৪৭-১৯৫৬’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি রয়েছে, যা ব্যবহারকারীরা গ্রন্থাগারে বসে দেখতে পারেন অথবা বাড়িতে ইস্যু করে নিয়ে যেতে পারেন।

গ্রন্থাগারের হাতের বাঁয়ে রয়েছে ৮৪টি বুকশেলফ। খুব সহজে পাঠোপকরণগুলোর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যবহারকারীদের জন্য ডিউই ডেসিমেল ক্লাসিফিকেশন (ডিডিসি) অনুসরণ করে কল নম্বর অনুযায়ী বই সাজানো হয়েছে এই শেলফগুলোতে। গ্রন্থাগারে গ্রন্থ সংগ্রহ ক্রমবর্ধমান। গ্রন্থাগারে সম্পদগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যবসা প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা, কম্পিউটার বিজ্ঞান, অর্থনীতি, পরিবেশগত গবেষণা, বাংলা এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মনোবিজ্ঞান, ধর্ম, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি। এখানে বর্তমানে ১৪,৭২৮টি বই আছে; জার্নাল- ম্যাগাজিন আছে ৬৫৩১-এর বেশি। দেশি-বিদেশি সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত জার্নাল-সাময়িকী ছাড়াও পুরনো সংখ্যাগুলো বাঁধাই করে গ্রন্থাগারে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবহারকারীদের সহায়ক সেবা প্রদানের জন্য রয়েছে গবেষণা প্রতিবেদন, বিশ্বকোষ, অভিধান, হ্যান্ডবুক, ম্যানুয়েল ও এনজিও প্রকাশনা।

ইউআইইউ গ্রন্থাগার গবেষণা এবং শিক্ষার সমর্থনে ইলেকট্রনিক সম্পদের (ই-রিসোর্স) বিশাল পরিসীমা অ্যাকসেস সরবরাহ করে। ইউআইইউয়ের সব শিক্ষার্থী, অনুষদ ও কর্মকর্তা-কর্মচারী ই-রিসোর্স অ্যাকসেস করতে পারেন। ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য চলমান চাহিদা স্বীকার করে গ্রন্থাগার ইলেকট্রনিক সম্পদ সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এখানে ব্যবহারকারীরা ই-বুক, ই-জার্নাল ও ই-ম্যাগাজিন পড়তে ও ডাউনলোড করতে পারেন। এখানে এখন ৩৫০০০ ই-বুক ও ১১৭৫০০০ ই-জার্নালের গ্রাহক। ব্যবহারকারীরা তাঁদের নাম ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে যেকোনো স্থান থেকে রিমোট অ্যাকসেস সেবা ও ডিসকভারি সেবার মাধ্যমে এই রিসোর্সগুলো অ্যাকসেস করতে পারেন।

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শেষ বর্ষে পড়ছেন মোমিনুল ইসলাম ও আফরিন মাকসুদ। তাঁরা জানালেন, এখানে একটি বিষয়ের ওপর একাধিক বই পাওয়া যায়। এ কারণে গ্রন্থাগারে বসে নোট নেওয়া তাঁদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

ইউআইইউ গ্রন্থাগার তার ব্যবহারকারীদের স্বয়ংক্রিয় তথ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য লাইব্রেরি সফটওয়্যার ‘কোহা’ চালু করেছে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা গ্রন্থাগারে না এসেও যেকোনো বইয়ের শিরোনাম, লেখক, কল নম্বর, কি-ওয়ার্ড, প্রকাশক ও প্রকাশকাল অনুযায়ী বিশদভাবে সার্চ করতে পারেন।

লাইব্রেরিটির ব্যবস্থাপনায় আছেন পাঁচজন অফিস সহকারীসহ মোট ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। সহকারী গ্রন্থাগারিক দীবা ফারখুন্দা বানু জানান, গ্রন্থাগারের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সপ্তাহে পাঁচ দিন সকাল ৮:৩০টা থেকে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত খোলা রাখা হয় এবং পরীক্ষার সময় প্রতিদিনই গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করা হয়। গ্রন্থাগারে ৪০০ জন ছাত্র-ছাত্রী একসঙ্গে বসে পড়াশোনা করতে পারেন। প্রতিটি সদস্য রেফারেন্স বই এবং সংরক্ষিত উপকরণ ছাড়া দুটি বই আট দিনের জন্য ধার নিতে পারেন এবং সেই সঙ্গে দুদিনের জন্য নিতে পারেন একটি সিডি/ডিভিডি। এ ছাড়া আইডি কার্ড জমা রেখে একটি বই সারা দিনের জন্য নিজের কাছে রাখতে পারেন। শিক্ষকদের জন্য রয়েছে গ্রন্থাগারে পৃথক বসার ব্যবস্থা, যেখানে একসঙ্গে ১৬ জন শিক্ষক বসে পড়াশোনা এবং তাঁদের গবেষণার কাজ করতে পারেন। একাডেমিক আইডি কার্ড জমা দিয়ে বই নেওয়া যায়; ফলে বই নেওয়ার জন্য আলাদা কোনো কার্ডের প্রয়োজন পড়ে না।

 

মন্তব্য