kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

আনিশার অক্সফোর্ড জয়

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। তিনি আনিশা ফারুক। লন্ডন থেকে তাঁর এই গৌরবের কথা জানাচ্ছেন জুয়েল রাজ

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আনিশার অক্সফোর্ড জয়

আনিশা ফারুক

তিনি তুখোড় শিক্ষার্থী। তুখোড় নেত্রী। তবু নিজের সাফল্যের কথা নিজ মুখে প্রকাশ করতে তাঁর এক ধরনের দ্বিধা! তাঁর বৈশিষ্ট্যে এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। তবু তাঁর নেতৃত্বগুণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ কম। তিনি জলের দেশের কন্যা। পিতৃপুরুষের মাটি ভোলার চরফ্যাশন। এক পাশে বঙ্গোপসাগর, অন্য পাশে বহমান মেঘনা। জল-জোছনার দেশ সুনামগঞ্জের মেয়ে মা রেহানা চৌধুরী, জলের ফুলের নামেই তাঁর আদরের ডাকনাম রেখেছিলেন পদ্ম।

লন্ডনের বারহাম প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু হয় আনিশার। ওয়েম্বলি হাই টেকনোলজি কলেজ থেকে জিসিএসি ও এ-লেভেল পাস করেন। নেতৃত্বের গুণাবলি যেন তাঁর সহজাত ব্যাপার। কলেজে ছিলেন হেড গার্ল (কলেজ ক্যাপ্টেন)। জিসিএসি ও এ-লেভেলে ১৪ বিষয়ে ‘এ’ স্টার এবং ছয় বিষয়ে ‘এ’ মার্ক পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। স্কুলজীবনেই তাঁর লেখা ছেপেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন আনিশা। ছিলেন অক্সফোর্ড ইউনিয়নের নির্বাচিত নির্বাহী সদস্য। অক্সফোর্ড ইউনিয়ন মূলত ডিবেটিং ক্লাব, যেটি বৈশ্বিক নানা বিষয়ে বিতর্কের আয়োজন করে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এসে বক্তব্য দেন। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ১৯৭৩ সালে এই ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তবে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ও অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন—দুটি ভিন্ন সংগঠন। অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে।

আনিশা বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব পত্রিকা—‘দ্য অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট’র বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে ‘এডিটর ইন চিফ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি অক্সফোর্ড লেবার সাপোর্টার গ্রুপের প্রচারণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে কো- চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি লেবার ক্লাব (ওইউএলসি) মূলত লেবার পার্টির  মতাদর্শের ছাত্রসংগঠন। আনিশা এখানে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্টুডেন্ট কাউন্সিল শিক্ষার্থীদের একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর, যেখানে এর প্রতিনিধিরা একাডেমির কেন্দ্রে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন এবং স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নানা কার্যক্রমে সহায়তা করেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় অন্যদের সঙ্গে আনিশা

স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর সঙ্গে নানা নীতি প্রণয়নে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আনিশার। অক্সফোর্ড ফোরামের উইমেনস অফিসারের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। এই ফোরামটি শিক্ষার্থীদের বক্তৃতা ও বিতর্কে উত্সাহিত এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাঁদের যুক্ত করে। পাশাপাশি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের ট্রাস্টি বোর্ডের উইমেনস অফিসার, টিচ অ্যা চাইল্ড-আফ্রিকা দাতা সংস্থার ট্রাস্টি বোর্ড মেম্বার, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে বিতর্কে অংশ নেওয়াসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শাখায়ই আনিশার রয়েছে উজ্জ্বল উপস্থিতি।

১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু করা অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিন দফায় স্টুডেন্ট ইউনিয়নের এবারের বার্ষিক এই নির্বাচন শেষে ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েস্টন লাইব্রেরিতে ফল ঘোষণা করা হয়। প্রতিটি ধাপেই সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন কুইন্স কলেজের ইতিহাসের এই ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নির্বাচনে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আইভি ম্যানিং (স্বতন্ত্র প্রার্থী) ও ইলি মিলনে-ব্রাউনকে (অ্যাসপায়ার প্যানেল) হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট প্যানেলের প্রার্থী আনিশা। নির্বাচনে বিজয়ের পর আনিশা বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে এসেছি এবং বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। আশা করছি আমরা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব করতে পারব।’ আনিশা ফারুক এই গৌরব অর্জনকারী দ্বিতীয় এশিয়ান বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী। তাঁর আগে ১৯৯৩ সালে প্রথম জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে আকাশ মহারাজ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর ফারুক আহমেদ ও রেহানা চৌধুরীর মেয়ে আনিশা এখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কুইন্স কলেজে ইতিহাস বিষয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। একমাত্র ভাই জিবরান ফারুক লন্ডনে এ-লেভেলে পড়ালেখা করছেন। বাংলাদেশে বহুবার এসেছেন আনিশা ফারুক পদ্ম। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি গভীর মমতা তাঁর। প্রমিত বাংলা যেমন পারেন, তেমনি সিলেটি উচ্চারণেও কথা বলতে পারদর্শী তিনি। সুনামগঞ্জের দরগাপাশা গ্রামে আনিশার নানাবাড়ি। নানা জহরুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর চাচাতো ভাই। দাদার বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায়। দাদা মরহুম সিদ্দিক উল্লা মিয়া। আনিশার বাবা মেজর (অব.) ফারুক বলেন, ‘‘আমার মেয়ে খুবই প্রচারবিমুখ স্বভাবের। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে রেকর্ড পরিমাণ ‘এ’ স্টার পেয়েও তাঁকে কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশনে সাক্ষাত্কার দেওয়ানো যায়নি!’’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা