kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

উদ্যোগ

টিফিনের টাকায় কাশফুল

টিফিনের টাকায় গড়ে ওঠা এক প্রতিষ্ঠানের খবর জানাচ্ছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

৯ মে, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টিফিনের টাকায় কাশফুল

দেয়ালে আটকে রাখা ফ্রেমগুলোতে ফুটে উঠেছে শহর ও গ্রামের নানা দৃশ্য। দর্শকরা কামরাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ছবি দেখছে। যাদের ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে কিছু আলোকচিত্রীর বয়স একেবারেই কম। তাদেরও দেখা যাচ্ছে। দৃক গ্যালারিতে চলছিল দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত শিশু-কিশোর আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা। এখানে ৪ থেকে ৫ মে এ দুই দিন হয় ‘ন্যাশনাল চিলড্রেন ফটোগ্রাফি ফেস্টিভাল’ নামে ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন। সমাপনী অনুষ্ঠানে সম্মাননা দেওয়া হয় সেরা আটজন আলোকচিত্রীকে। কথা হলো তাদেরই একজন নবম শ্রেণিপড়ুয়া মাহী হাসান অরণ্যর সঙ্গে। ‘বেশির ভাগ ফটো কন্টেস্টে বয়স্ক ফটোগ্রাফারদের ছবি নেওয়া হয়। আমরা তেমন সুযোগ পাই না। কিন্তু এই আয়োজনে শিশু-কিশোরদের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এটা আমাকে অনুপ্রেরণা জোগাবে।’ আয়োজকদের কাছে জমা পড়া এক হাজার ৬০০ ছবির মধ্যে প্রদর্শনীর জন্য মনোনীত হয় ৫২টি। সর্বকনিষ্ঠ আলোকচিত্রী হিসেবে পুরস্কার পায় ১১ বছর বয়সী এক খুদে আলোকচিত্রী। আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি শিশু-কিশোরভিত্তিক হলেও দেখতে আসেন নানা বয়সের লোকেরা। আর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে কাশফুল ফ্যাক্টরি নামের একটি সংস্থা। মজার বিষয় হলো, কাশফুল ফ্যাক্টরি আর এই পুরো এক্সিবিশনের পেছনে আছে স্কুল-কলেজেপড়ুয়া তিন কিশোর-কিশোরী। মজার ঘটনা, কাশফুল ফ্যাক্টরির সব খরচ জোগায় তারাই নিজেদের টিফিন ও হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে। এবার বরং এই তিনজনের কাশফুল ফ্যাক্টরি গড়ে তোলার পেছনের কাহিনি জানা যাক।

ফেব্রুয়ারি ২০১৭। আরিয়ান-সিয়ামদের বিকেলের আড্ডায় যুক্ত হলো নতুন একটি বিষয়। তা হলো, এমন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যাতে মেধাবীরা তাদের মেধাকে শাণিত করার সুযোগ পায়। তবে দুই কিশোরের কাছে ব্যাপারটা বাস্তবায়ন করা ছিল স্বপ্নের মতোই। একদিন আরেক বন্ধু মিমোর সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করে তারা। আর তখন থেকেই তিন কিশোর-কিশোরী—সিয়াম, আরিয়ান ও মিমো মিলে শুরু করে তাদের প্রজেক্ট। ‘আমরা ভেবেছিলাম নতুন কিছু করতে হবে। তখনই ভাবলাম, এমন কিছু করব, যার মাধ্যমে সৃজনশীলতা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। দেখলাম, বাকি দুজনও একমত।’ এভাবেই তাদের প্রজেক্ট শুরুর সময়কার কথা বলল সিয়াম। তিনজনের ছোট্ট এই সংস্থার নাম রাখা হয় ‘কাশফুল ফ্যাক্টরি’। অনেক ভেবেচিন্তে তারা একটি ছবি প্রতিযোগিতার আয়োজনের কথা ভাবে। ‘আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা বা প্রদর্শনীগুলো সবই হয় বড়দের নিয়ে। ছোটরা যদি ভালো ছবি তুলেও ফেলে, তবুও এর জায়গা হয় না প্রদর্শনীগুলোতে। আর এটা মাথায় আসতেই হুট করে প্ল্যান করে ফেলি আমরা। আর্থিক ও মানসিকভাবে কেউই আমাদের পাশে থাকবে না এটা মাথায় ছিল আগেই। নিজেরাই জমানো শুরু করলাম টিফিনের ও হাতখরচের টাকা। অংশগ্রহণকারীদের থেকে ফ্রেমের সামান্য কিছু খরচ বাদে ২০১৭ সালে সম্পূর্ণ নিজেদের টাকায় আয়োজন করি একটি আলোকচিত্র উৎসব। যাতে অংশ নিতে পারে শুধু ১৮ বছরের কম বয়সী আলোকচিত্রীরা। কাজে নেমে পড়ার পর মনে হলো, ঝোঁকের বশে কাজটা করা মোটেও ঠিক হয়নি। আমাদের কে-ই বা ছবি দেবে! আর ১৮ বছরের কম বয়সী কয়জনই বা শখ করে ছবি তোলে! তবুও ভাবলাম, শেষ দেখে ছাড়ব।’ জানাল আরিয়ান। ফলাফলটা ছিল একেবারেই পিলে চমকানো। সম্পূর্ণ নতুন ও অখ্যাত সংস্থা ‘কাশফুল ফ্যাক্টরি’র আয়োজনে আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ছবি জমা পড়ে তিন হাজারের মতো। বিচারকদের নিয়ে বাছাই করে ১২৬টি ছবি প্রদর্শিত হয় দর্শকদের জন্য। তাদের জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। দুই দিনের আলোকচিত্র উৎসবে দর্শক আগমন ঘটেছিল দেড় হাজারেরও বেশি। আর জাতীয় পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের নিয়ে করা আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার আইডিয়াটা ছিল একেবারেই নতুন। এরই ধারাবাহিকতায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পুরস্কৃত করা হবে সবচেয়ে কনিষ্ঠ আলোকচিত্রীকে। প্রথম জাতীয় শিশু-কিশোর আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পায় সাত বছর বয়সী একটি মেয়ে।

বাধাবিপত্তি ছিল। সিয়াম বলল, ‘প্রথম প্রথম স্পন্সর খুঁজতাম অনেক। সারা দিনই ঘুরতে হয়েছে এ-অফিস ও-অফিস। কিন্তু কেউই পাত্তা দিত না। আমরা ভাবতাম, হয়তো নিজেরা কিছুই করতে পারব না। তবে মনোবল নিয়েই আমরা কাজ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ! সফলও হয়েছি।’

প্রথম সফল ইভেন্টের পর ফেসবুকে ‘কাশফুল ফ্যাক্টরি নেটওয়ার্ক’ নামের একটি গ্রুপ খোলে তারা। এর সদস্যরা তাদের সৃজনশীল বিষয়গুলো এই গ্রুপের মাধ্যমে চর্চা করছে। এতে সবার মতামত পাওয়ার পাশাপাশি আলোচনা-সমালোচনারও সুযোগ পাওয়া যায়। ছোট্ট এই উদ্যোগ তাদের ধীরে ধীরে পরিচিত করে তোলে।

এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করা হলো ন্যাশনাল চিলড্রেন ফটোগ্রাফি ফেস্টিভাল। এ ছাড়া কাশফুল ফ্যাক্টরি ‘তারুণ্যের আড্ডা’ নামে আরেকটি অনুষ্ঠান করে থাকে। সেখানে সমাজের সফল তরুণরা আড্ডার মাধ্যমে তাদের গল্প বলে থাকে। আর ভবিষ্যতে কাশফুল ফ্যাক্টরির মতো ক্ষুদ্র উদ্যোগ কিভাবে বড় স্তরে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে চলে বিস্তর আলোচনা। ওই তারুণ্যের আড্ডায় অংশগ্রহণ করতে পারে কিশোর বয়সী যে কেউ।

মুনিরা মাহজাবিন মিমো

পড়ছে একাদশ শ্রেণিতে, ঢাকা সিটি কলেজে। ছোটবেলা থেকেই জনসেবা করার ইচ্ছা থেকে বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করছে। স্বেচ্ছাসেবকদের দলনেতা হিসাবেও কাজ করে নিয়মিত। স্কাউটিং করে। কাশফুল ফ্যাক্টরির আয়োজনে জাতীয় শিশু আলোকচিত্র উৎসবের ফেস্টিভাল ডিরেক্টর সে। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটাতেই ভালোবাসে।

আলিফ আল সিয়াম

এবার সবে এসএসসি পাস করল খিলগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। অল্প বয়সেই বেশ ভালো ভিডিও এডিটিং, ডিজাইনিং এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করে কামিয়েছে সুনাম। কাজ করছে সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে। গানেও পটু। স্কুলের প্রতিটি অনুষ্ঠানে নিয়মিত গায়ক বনে গেছে সিয়াম। বিভিন্ন নতুন নতুন অ্যাপ নিয়ে কাজ করছে।

রাফিদ আরিয়ান

পড়ছে একাদশ শ্রেণিতে, বিএএফ শাহীন কলেজে। ডিজাইনিং, প্রগ্রামিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ। নিজে কয়েকটি অ্যাপও বানিয়েছে। তার তৈরি অ্যাপের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘সবুজের কাছাকাছি’। যার সাহায্যে ঘরে বসেই বনায়ন ও বৃক্ষ নিয়ে তথ্য পাওয়া সম্ভব। ডিজাইনের ক্ষেত্রেও কাজ করে যাচ্ছে সে। খুব অল্প এলিমেন্ট ব্যবহার করে মূল বক্তব্য ফুটিয়ে তোলে নকশায়। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টও করে। কাশফুল নিয়ে বিশাল কাজ করার ক্ষেত্র তৈরি করতে চাচ্ছে শিশুদের জন্য, যেখানে তারা কাজ শিখতেও পারবে আবার কাজের যথাযথ সম্মানীও পাবে।

মন্তব্য