kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

রায়হানের জীবন সংগ্রাম

বাহার উদ্দিন রায়হান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পড়েন। তাঁর জীবন গল্পকেও হার মানায়। বলছেন রবিউল হোসাইন। ছবি তুলেছেন শাহেদ চৌধুরী জনি

২৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রায়হানের জীবন সংগ্রাম

‘তুমি পা দিয়ে লেখো না কেন? অনেকেই তো লিখছে। ভেঙে পড়লে কি চলবে?’ তবে বিদ্যাকে পা দিয়ে স্পর্শ করবেন না বলে হাতের কনুইয়ের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে লেখা শুরু করলেন। কিছুদিন চেষ্টা করে লেখা রপ্ত করে ফেললেন

বাবাকে হারিয়েছেন জন্মের আগেই। মা খালেদা বেগমের কোলেই মানুষ বাহার উদ্দিন, ডাকনাম রায়হান। জন্ম তাঁর কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। তাঁরা লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের জহিরপাড়ার মানুষ। আর দশটি ছেলেমেয়ের মতোই ছিল তাঁর শৈশব। তবে হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় জীবনটিই বদলে গেল তাঁর। রায়হান তখন ক্লাস ফাইভে পড়েন। এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় দেখলেন, বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারে একটি পাখি ঢুকে গেছে। সেটিকে বাঁচানোর জন্য খুঁটি বেয়ে উঠতে লাগলেন তিনি। আগেও কয়েকবার উঠেছেন বলে ভয় ছিল না কোনো। তবে সেদিন টান্সফরমারে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল। তারে হাত দিতেই ছিটকে পড়ে গেলেন। ঝলসে গেল দুটি হাত, বুক, পায়ের তালু। অজ্ঞান ছেলেটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পাঁচ দিন চেষ্টা করেও চিকিৎসকরা দুটি হাত বাঁচাতে পারলেন না। একটি হাত পুরোপুরি কেটে ফেলে দিতে হলো, অন্য হাতের কনুই পর্যন্ত চিরতরে হারালেন। তবে এসবের কিছুই জানে না ১০ বছরের ছেলেটি। ১৫ দিন পর তার জ্ঞান ফিরে এলো। নানির কান্না তাকে জানিয়ে দিল সব। ছয়টি মাস চট্টগ্রাম মেডিক্যালেই কেটে গেল। চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যেতে বললেও অন্যের জমিতে বর্গাচাষি মায়ের পক্ষে সম্ভব হলো না। তিনি ধারদেনা করে ছেলেকে চিকিৎসা করালেন। এরপর বাড়ি ফিরে এলেও দেড় বছর রোগব্যাধি আর অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করেই গেল মা-ছেলের।

তাঁকে ফের লেখাপড়া শুরুর বুদ্ধিটি দিয়েছিলেন খালাতো বোন মুসলিমা। বলেছিলেন, ‘তুমি পা দিয়ে লেখো না কেন? অনেকেই তো লিখছে। ভেঙে পড়লে কি চলবে?’ তবে বিদ্যাকে পা দিয়ে স্পর্শ করবেন না বলে হাতের কনুইয়ের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে লেখা শুরু করলেন। কিছুদিন চেষ্টা করে লেখা রপ্ত করে ফেললেন। ফুফু  সৈয়দা লুত্ফুন্নেসাকে একদিন বলে ফেললেন, ‘আমি লিখতে পারি, লেখাপড়া শিখতে চাই।’ অনেকে মানা করলেন। অনেকের অনেক নেতিবাচক কথাও তাঁকে দমাতে পারেনি। কয়েক বছর লেখাপড়ার বাইরে ছিলেন বলে অনেক কিছু ভুলে গেছেন। তাঁকে এলাকার আল রায়েদ ইন্টারন্যাশনাল একাডেমিতে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে হলো। তবে স্কুলে আসা-যাওয়া, বেসরকারি স্কুলে পড়ার খরচ জোগাড় করতে পারছিলেন না বলে সিদ্ধান্ত নিলেন, সরকারি স্কুলে ভর্তি হবেন। তত দিনে ষষ্ঠ শ্রেণি পাস করে ফেলেছেন। নানা ডা. কামাল উদ্দিনকে বললেন, ‘আপনি খরচ দেন। আমি পড়ব।’ নাতিকে নিয়ে চকরিয়া সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে গেলেন তিনি। স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির চৌধুরী ভর্তির টাকা দিলেন। লাইব্রেরি থেকে বাড়তি এক সেট বইও দিলেন। এভাবেই আবার লেখাপড়ার হলো শুরু। সেই দিনগুলোতে খুব সাহায্য করেছেন স্কুলের জামাল উদ্দিন ও শাহজালাল স্যার।

তাঁর জীবনের গল্প নতুন মোড় নিল হঠাৎ করেই। সাদা স্কুলপোশাকের এই ছেলেটিকে পথেই দেখে কেন জানি ভালো লেগে গেল নুরুল আমিন বাহাদুরের। তাঁর জীবনের গল্প খানিকক্ষণ শুনলেন। এরপর বললেন, ‘আমাদের বায়তুশ শরফে এসো।’ এই ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে তিনি শিখলেন, প্রতিবন্ধিতাকে জয় করতে হলে একতাবদ্ধ থাকতে হয়। নিজের অধিকার নিজেকেই আদায়ের জন্য সোচ্চার হতে হয়। এরপর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অর্থায়নে বায়তুশ শরফে আয়োজিত অ্যাডভোকেসি লিপারশিপ ট্রেনিংয়ে রায়হান তাঁর অধিকার ও প্রাপ্য সম্পর্কে আরো পরিষ্কারভাবে জানলেন। জেএসসি পরীক্ষার সময় কারো সাহায্য না নিয়ে একা একা পরীক্ষা দিলেন। এই দৃশ্য দেখে খুশি হয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁকে উপবৃত্তির টাকা বরাদ্দ করলেন। তবে লালফিতা পেরিয়ে সেই টাকাও সময় মতো পাননি। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির চৌধুরী তাঁর লেখাপড়ার খরচ দিয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি বদলি হয়ে গেলে মামাদের টাকায় পড়েছেন রায়হান। ২০১৪ সালে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। তাঁর জিপিএ ছিল ৩.৪১।

এরপর কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করে অভাবের সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন। তবে টাকার অভাবে সেটি পারলেন না। অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে কোনো এক দোকানে কাজ করে আয় করতে বললেও সেদিকে গেলেন না। খুব শখ তাঁর, লেখাপড়া শিখবেন। পড়তে কম খরচ বলে মানবিকে ভর্তি হলেন। তখন রায়হান থাকেন নানার বাড়িতে, ভর্তির টাকাগুলো মায়ের দেওয়া। চকরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম গিয়াস উদ্দিন বেতন মাফ করে দিলেন। ইন্দ্রজিৎ বড়ুয়া বিনা ফিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ইংরেজি দেখিয়ে দিতেন। স্যারদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে বই জোগাড় করেছেন তিনি। কয়েকটি প্রকাশনীও বিনা মূল্যে বই দিয়েছে তাঁকে। ক্লাসে ফ্যান ঘুরছে না, টয়লেটে পানি নেই—এমন নানা সমস্যার সমাধানে বন্ধুরা তাঁকে ঠেলে পাঠিয়ে দিতেন শিক্ষকদের কাছে। সেসব দাবি নিয়ে কথা বলতেন তিনি। এভাবেই পরিচিতি আরো বেড়ে গেল তাঁর। কলেজে তিনি বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন।  

রায়হানের ভেতরে নিজেকে বদলানোর শিক্ষাটি দিল ‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট’। চার দিনের অ্যাকটিভ সিটিজেন প্রশিক্ষণে তিনি নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানোর উপায়গুলোও শিখলেন।

বাড়ি ফিরে এসে তাঁদের জহিরপাড়াতে ‘স্মাইল ফর চিলড্রেন’ ও ‘জহিরপাড়া ছাত্র ফেডারেশন’ নামে ক্লাব গড়ে তুললেন তিনি। শিশু সংগঠনের মাধ্যমে এলাকার শিশুদের স্বাস্থ্যসচেতনতা, লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তা জানাতে লাগলেন। নিজের জমানো টাকায় পুরনো কম্পিউটার কিনে কম্পিউটার শেখা শুরু করলেন। অবসরে এলাকার শিশুদের নিজের কম্পিউটার খুলে কম্পিউটার চালানো শেখান। তরুণদের ক্লাবও এলাকায় নানা ধরনের কাজ করেছে। ইউটিউবের টিউটরিয়াল দেখে তিনি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ভিডিও এডিটিং শিখেছেন।

নিজের একটি ইউটিউব চ্যানেলও আছে তাঁর—Bahar Raihan. সেখানে তাঁর ফুটবল খেলা, সাইকেল চালানো ও লেখালেখির ভিডিও আছে। ফেসবুকে তিনি গ্রামে যেসব কাজ করতেন, সেগুলোর ছবি আপলোড করতেন। এসব কর্মকাণ্ড দেখে হাঙ্গার প্রজেক্টের চট্টগ্রাম এরিয়া কর্মকর্তা মইনুল হোসেন তাঁকে বিভিন্ন কর্মশালায় নিয়ে যাওয়া শুরু করলেন। নিজের চকরিয়া সরকারি কলেজ থেকে শুরু করে বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, টেকনাফ, রামুসহ অনেক কলেজে প্রশিক্ষণ কর্মশালায় গেছেন তিনি। সেগুলোতে বলেছেন, আমাদের হাতের কাছে যেসব সুবিধা আছে, সেগুলো কাজে লাগাতে চাই না বলেই আমরা পিছিয়ে পড়ি। টেকনাফ সরকারি কলেজে তিনি কর্মশালা পরিচালনার পর সেখানে ছাত্রছাত্রীরা কলেজের ভেতরের ডাস্টবিনটি পরিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালের একদিন মইনুল বললেন, আগামী ২৭ অক্টোবর ঢাকায় যেতে হবে। জীবনে কোনো দিন রাজধানীতে যাননি বলে কিভাবে যেতে হবে, কোথায় যাত্রা বিরতি দিতে হবে, খাবারের হোটেলগুলো কোথায় আছে—এমন খুঁটিনাটি তথ্য অনেক খুঁজেও পেলেন না তিনি। সেই থেকে যাতায়াতের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরির কথা ভাবতে লাগলেন রায়হান।

ধীরে ধীরে তৈরি করে ফেললেন কেমনেযাব.কম (kemnejabo.com)। এটি এখন পরীক্ষামূলকভাবে চালু আছে। এই সাইটের জন্য মা ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের বাস কাউন্টার ঘুরে ঘুরে রায়হান তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সেখানে বাংলাদেশের সাতটি বিভাগের জন্য ‘কোথায় যাবেন’ নামে একটি সার্চ অপশন আছে। ‘কোথা থেকে যাবেন’ সেই অপশনও আছে। ‘রাস্তার খোঁজখবর’, ‘কক্সবাজার স্পেশাল’ নামে এমন কিছু বিভাগও চালু করেছেন তিনি। কোন এলাকা কেন বিখ্যাত তাও ভবিষ্যতে দেওয়া হবে বলে জানালেন তিনি। তবে তিনটি বিভাগের কাজ পুরো শেষ হলেও বাকিগুলোর কাজ টাকার অভাবে আটকে আছে। ফলে সাইট চালু করতে পারছেন না রায়হান।

গত বছর তিনি ২.৩৩ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করেছেন। এরপর অনেক খুঁজেও চাকরি পাননি। হতাশ হয়ে পড়া ভাগ্নেকে তখন মামা আবদুল মোমেন ডেকে বলেছেন, ‘আবার লেখাপড়া শুরু করো।’ বন্ধু মোর্শেদের কাছ থেকে বই ধার করে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পড়া শুরু করলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে সুযোগ পেলেন। ভর্তি পরীক্ষায় কোনো শ্রুতলেখক নেননি তিনি। এমনকি অন্য প্রতিবন্ধীদের মতো বাড়তি ১৫ মিনিটও নেননি। ফলে শুরুতেই শিক্ষকদের নজরে পড়ে গেলেন। এমন অদম্য ছাত্র দেখে ভর্তির দিন কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. সেকান্দার চৌধুরী বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এখানে ভর্তি হও। লেখাপড়া বা অন্য কোনো বিষয়ে কোনো সমস্যা হলে আমরা তোমাকে দেখব।’ আত্মীয়দের দেওয়া সাত হাজার টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন বাহার উদ্দিন রায়হান।   

রায়হান এখন শহরের চাক্তাই খালের মুখে নতুন ব্রিজে এলাকায় মামার বাসায় থাকেন। বাসা থেকে টেম্পোতে চড়ে রেল স্টেশনে আসেন। এরপর শাটলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্গাচাষি মায়ের দেওয়া মাসে দেড় হাজার টাকায় তাঁর লেখাপড়া চলে। অনেক দূর থেকে এত অল্প টাকায় আসা-যাওয়া করতে পারেন না বলে প্রায়ই ক্লাস মিস দিতে হয়। তার পরও লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

মন্তব্য