kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

চট্টগ্রামে অবৈধ লটারি-বাণিজ্য

* প্রতিদিন ৪০ হাজার টিকিট বিক্রি * লাভ পাঁচ লাখ টাকা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৭ এপ্রিল, ২০১২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চট্টগ্রামে মেলায় অনুমোদনহীনভাবে প্রতিদিন রাতে কয়েক লাখ টাকার লটারি-বাণিজ্য চলছে। স্বাধীনতা ও বৈশাখীর নামে আয়োজিত এ মেলা চলছে নগরের আউটার স্টেডিয়ামে। মেলায় প্রতিদিন ২০ টাকা মূল্যের লটারি বিক্রি হচ্ছে। এই লটারি জিতলে প্রথম পুরস্কার হিসেবে এক লাখ এবং দ্বিতীয় পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুরস্কার হিসেবে আরো ৪৯টি নিম্নমানের ইলেকট্রনিক সামগ্রী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। লাখ টাকা পুরস্কার জেতার আশায় লটারির টিকিট কিনে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। কিছু ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে মেলায় এলেও ক্রেতার ভিড় নেই। তবে রাত ৮টার পর থেকে ভিড় জমে লটারি মঞ্চ ঘিরে। তাদের বেশির ভাগই লটারি কেনে। অন্য প্রান্তের আরেকটি মঞ্চে সার্কাসের পর অশ্লীল নৃত্য দেখে দর্শনার্থীরা। যদিও মেলায় কোনো ধরনের অশ্লীল নৃত্য দেখানো যাবে না_এমন শর্তে সিএমপির কমিশনার মো. আবুল কাশেম মেলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। মেলা কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানিয়েছে, র‌্যাফল ড্র নাম দিয়ে লটারি বিক্রির জন্য 'নিউ জোনাকি র‌্যাফল ড্র' কর্তৃপক্ষের কাছে আট লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। গত ৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই র‌্যাফল ড্র চলবে আগামী ১০ মে পর্যন্ত। ঢাকার ব্যবসায়ী রফিক উদ্দীন এই লটারির মূল উদ্যোক্তা হলেও চট্টগ্রামের দুজন অংশীদার আছেন। তাঁরা হলেন জাকির উদ্দীন সর্দার ও পিন্টু। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মার্কেটের এক প্রান্তে একটি মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। মঞ্চের সামনে 'নিউ জোনাকি র‌্যাফল ড্র' ব্যানার টাঙানো হয়েছে। আশপাশের প্রায় ৩০টি টেবিলে ক্রেতারা ভিড় করছে। পাঁচটি ভিন্ন রঙে 'ক' থেকে 'ঙ' পর্যন্ত সিরিজের কাগজে অফসেট প্রিন্টে ছাপা প্রতিটি লটারির মূল্যমান ২০ টাকা। এই প্রতিবেদকও ৩৪৬০০৯ ক্রমিকের একটি লটারি কেনেন। লটারি বিক্রেতারা জানান, তাঁরা প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে মজুরি পান। সকাল ১০টা থেকে কাউন্টারে লটারি বিক্রি শুরু করেন। কাজ শেষ করতে করতে রাত ২টা পার হয়। টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আনা শতাধিক যুবককে। এ ছাড়া সকাল ৯টা থেকে অন্তত ৫০টি রিকশা নিয়ে মাইকিং করা হয় নগরের অলিগলিতে। এ সময় অনেক মহিলাও এই টিকিট কেনেন। ফলে টিকিট বিক্রির হার অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে। লটারির ড্রয়ের সময় দেখা গেছে, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত দুই-তিন হাজার লোক মঞ্চ ঘিরে আছে। রাত ১২টায় ড্রয়ের সময় তাৎক্ষণিকভাবে লাখ টাকা পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তিকে দেখা যায়নি। মোবাইল ফোন নম্বরটিও পুরোপরি ঘোষণা করা হয়নি। অন্য কয়েকটি পুরস্কার কয়েকজনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। লটারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, প্রতিদিন অন্তত ৪০ হাজার টিকিট বিক্রি করে আট লাখ টাকা আয় হয়। এ থেকে লটারির বিপরীতে পুরস্কার হিসেবে ব্যয় হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। মাইকিং, কর্র্মীদের মজুরি, প্রশাসনকে ম্যানেজে ব্যয় ইত্যাদি বাবদ আরো এক লাখসহ প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়। বাকি পাঁচ লাখ কর্তৃপক্ষের লাভ। এই হিসাবে গত ১৮ দিনে প্রায় ৯০ লাখ টাকা লাভ করেছে নিউ জোনাকি কর্তৃপক্ষ। লটারির অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে নিউ জোনাকির মালিক মো. রফিক উদ্দীন বলেন, 'সম্ভবত অনুমোদন আছে। এ বিষয়ে জাকির উদ্দীন বিস্তারিত জানেন।' এ বিষয়ে নিউ জোনাকির ব্যবস্থাপক আবদুস সালাম বলেন, 'আমি ব্যবস্থাপনার কাজ করি। লাভের বিষয়টি মালিকরা জানেন।' লটারির অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো ধরনের লটারির অনুমোদন থানা পুলিশ কাউকে দেয়নি। সিএমপির সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'শুরুতে এই মেলার অনুমোদন সিএমপি কমিশনার দিতে চাননি। কিন্তু সরকারি দলের কয়েকজন নেতার জোর সুপারিশের কারণে কমিশনার শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দিয়েছেন। এখন মেলায় অশ্লীল নৃত্য ও লটারির নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ আসছে।' প্রতিদিন পাঁচ-ছয়টি করে লটারি কিনেও কোনো পুরস্কার না পাওয়ায় হতাশ হয়ে নগরের আসকার দীঘির পাড়ের একটি সেলুনের কর্মী গোবিন্দ শীল বলেন, 'আমি প্রতিদিন লটারি কিনি, কিন্তু কিছুই পাইনি।' লটারি কেনার সময় মো. হাবিব উল্লাহ নামের এক যুবক বলেন, 'আমি গত সোমবার ৫০টি টিকিট কিনেছিলাম। ফল শূন্য।' প্রতিদিন গড়ে ২০টি করে লটারি কিনে কিছুই না পেয়ে হতাশ ক্ষুদ্র মুদি ব্যবসায়ী মো. রহিম বক্স বলেন, 'আজকের পর আর লটারি কিনব না।'


সাতদিনের সেরা