kalerkantho

সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ ফাল্গুন ১৪২৬। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বিনিয়োগের টাকা আনতেও বাধা

২০ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



বিনিয়োগের টাকা আনতেও বাধা

জাপানের আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্রিড গ্রুপ নিজ দেশের বাইরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের আবাসন খাতে ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের বসুন্ধরা গ্রুপ ও জেমস গ্রুপের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে এ দেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ করছে। বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশে আরো বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ক্রিড গ্রুপ। সরকার বিদেশি বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেও বিদেশ থেকে ঋণের অর্থ এনে বিনিয়োগের অনুমতি পাচ্ছে না জাপানি প্রতিষ্ঠানটি। আবার ব্যবসা ও বিনিয়োগ সচল রেখে মুনাফার অর্থ ফেরত নেওয়ারও সুযোগ পাচ্ছে না। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে যে মধুর অভিজ্ঞতা তাদের ছিল, বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ড, যৌথ মূলধনী কম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি), বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আমলাতান্ত্রিক জটিলতার প্যাঁচে পড়ে তিক্ততায় রূপ নিয়েছে তা। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এসে যেসব বাধার মুখে পড়েছে, তা তুলে ধরে সমাধানের জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে ক্রিড গ্রুপ। গত শুক্রবার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ কার্যালয়ে এসে জাপানি প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নির্বাহীরা বলেন, সরকার বাধাগুলো দূর করলে বাংলাদেশে আরো বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করবেন তাঁরা। জাপান থেকে আসবে আরো অনেক বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এসে তাঁরা যেসব তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, সেসবের বর্ণনা তুলে ধরেছেন আমাদের প্রতিবেদক আবুল কাশেম, রাজীব আহমেদ ও শেখ শাফায়াত হোসেন

 

এখানে বিনিয়োগ করলে খুবই ভালো সাড়া পাবেন

আবু তৈয়ব

উপদেষ্টা (গণমাধ্যম),বসুন্ধরা গ্রুপ

বসুন্ধরা গ্রুপের ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ায় আপনাদের স্বাগতম। ২০১০ সালে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ যাত্রা শুরু করে। এখন আমাদের দুটি বাংলা দৈনিক, একটি ইংরেজি দৈনিক, একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল আছে।

আমাদের একটি টেলিভিশন চ্যানেল ও একটি এফএম রেডিও নিয়ে আসছি। আশা করছি, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ২৪ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ২৪ এবং ক্যাপিটাল রেডিও নামে এফএম রেডিও চালু হতে যাচ্ছে। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের একটি প্রেস (ছাপাখানা) আছে, যা দেশের সবচেয়ে বড়। আপনাদের সময় থাকলে তা দেখে যেতে পারবেন।

গণমাধ্যমে আমরা অল্প সময়েই অনেক উন্নতি করেছি। জনপ্রিয়তা বেড়েছে, প্রভাব তৈরি হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই আমাদের অবস্থা ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। বসুন্ধরা গ্রুপের আবাসন ব্যবসাও খুবই বড় ও সফল। এখানে বিনিয়োগ করলে আপনারা খুবই ভালো সাড়া পাবেন।

 

 

বসুন্ধরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্পগোষ্ঠী

নঈম নিজাম

সম্পাদক,বাংলাদেশ প্রতিদিন

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিন এখন দেশের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা। পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। আমাদের আরেকটি পত্রিকা হলো কালের কণ্ঠ। এটি দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রচারিত দৈনিক।

আমাদের দি সান নামের একটি ইংরেজি দৈনিক আছে, যেটি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক। আমাদের বাংলানিউজ২৪ডটকম নামের একটি নিউজ পোর্টাল আছে।

আমাদের নিউজ২৪ নামের একটি টেলিভিশন চ্যানেল আগামী ফেব্রুয়ারি মাসেই সম্প্রচারে আসতে পারে। এ ছাড়া রেডিও ক্যাপিটাল নামের একটি রেডিও ওই সময় নাগাদ প্রচারে আসবে। আমাদের দেশজুড়ে কার্যালয় আছে। এ ছাড়া দিল্লি, লন্ডন, নিউ ইয়র্কের মতো প্রধান প্রধান শহরেও কার্যালয় আছে। এ ছাড়া আমরা বিশ্বের বড় সব বার্তা সংস্থার সংবাদের গ্রাহক। জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে বাঙালি সম্প্রদায়ের খবরও আমাদের প্রতিনিধিরা পাঠান।

বসুন্ধরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্পগোষ্ঠী। তেমনি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপও দেশের সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম মালিক প্রতিষ্ঠান।

 

বিনিয়োগের জন্য বিদেশ থেকে অর্থ আনাও কঠিন

মানিওসি তসিহিকো

প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ক্রিড গ্রুপ

আমি বাংলাদেশে এসেছি দুই বছর আগে। আমার কাছে ঢাকা শহর একটি ‘এক্সাইটিং’ শহর বলে মনে হয়েছে। তবে এখানকার বড় সমস্যা যানজট। যানজটই ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমরা প্রথমে মতিঝিল, পান্থপথ গিয়েছিলাম।

সেগুলো খুবই ভালো জায়গা। তবে যানজট অনেক বেশি। এ ছাড়া গুলশান, বারিধারায়ও গিয়েছি। সেগুলোও অনেক ভালো জায়গা। অনেক বেশি ব্যয়বহুল এলাকা। সেখানেও যানজট রয়েছে। ঢাকায় জমির দাম অনেক বেশি এবং যানজট বড় একটি সমস্যা। বিমানবন্দর থেকে সেখানে যেতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে।

শেষ পর্যন্ত আমরা বসুন্ধরায় এলাম। এটা বিমানবন্দরের কাছে। অবকাঠামো ভালো। নিরাপত্তাও ভালো। এর পাশেই পূর্বাচল নামে সরকারের একটি প্রকল্প আছে। পাশেই আছে সেনা আবাসন প্রকল্প। সব দিক বিবেচনায় ঢাকা শহরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিনিয়োগ করাটাই উত্তম হবে বলে আমরা মনে করি। এ কারণে আমরা বসুন্ধরাকে বেছে নিলাম। প্রথমে আমরা খুবই ছোট এক খণ্ড জমি কিনে পরীক্ষামূলকভাবে বিনিয়োগ করলাম। কিন্তু দেখলাম এ দেশে বিনিয়োগের জন্য বিদেশ থেকে অর্থ আনা খুবই কঠিন। দেখলাম আমাদের শুধু নগদ টাকা বিনিয়োগ করতে হবে, ঋণ নেওয়া যাবে না। এ ছাড়া টাকা ফেরত নেওয়াও কঠিন। আমরা যদি সহজেই আমাদের মুনাফার অর্থ নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আরো অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত রয়েছি।

আমরা বিদেশ থেকে ঋণ আনতে পারলে বড় বিনিয়োগ করতে পারব। সরকার অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু আবাসন খাতের বিনিয়োগ অন্য খাতের মতো নয় যে দীর্ঘসময় ধরে অপেক্ষা করা যাবে। আমরা এ দেশে নতুন প্রযুক্তি, নকশা ও উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে চাই। এ ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এলে তা আমাদের বাড়তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।

 

এক মাস অপেক্ষার পর অর্থ ফেরত পাঠাতে হয়েছে

মাসানবু কামিয়ানা

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ক্রিড গ্রুপ

ক্রিড গ্রুপ একটি জাপানি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এটি ১৯৯৬ সালে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১১ পর্যন্ত আমাদের ব্যবসার ফোকাস জাপানে ছিল। তখন পর্যন্ত জাপানের আবাসনের বাজার বাড়ছিল।

এরপর আমরা দেশের বাইরে নজর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ ২০১১ সালের পর থেকে জাপানের অর্থনীতি গতি হারিয়েছিল। জনসংখ্যা কমছিল। ওই সময় থেকে এখন জাপানের বাইরে পাঁচটি দেশে আমাদের বিনিয়োগ আছে। দেশগুলো হলো—মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ। আমাদের মোট ১৪টি প্রকল্প আছে। বিদেশে এখন পর্যন্ত আমরা ১১ হাজার ইউনিট (অ্যাপার্টমেন্ট) তৈরি করেছি। আর বাংলাদেশে নির্মাণ করেছি ৪৯টি ইউনিট।

বাংলাদেশে আমরা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বিনিয়োগ শুরু করি। প্রথমে আমরা মাত্র ছয় কাঠা জমি কিনে বিনিয়োগ করেছি। এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৯টি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করেছি। পাঁচটি দেশে আমাদের মোট বিনিয়োগ ৩০ কোটি ডলার। এর ৫ শতাংশও বাংলাদেশে নয়। তবে বাংলাদেশে ব্যবসার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এ দেশটি বিনিয়োগের আকর্ষণীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ এখানে জনসংখ্যার বড় অংশ উঠতি বয়সী। বাংলাদেশের অর্থনীতিও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে আবাসনের বিরাট চাহিদা তৈরি হবে। বাংলাদেশে বিদ্যমান আবাসন কাঠামোর চেয়ে আমরা অনেক ভালোমানের আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারব বলে মনে করি।

বাংলাদেশে ব্যবসার বড় সুযোগ আছে। মিয়ানমারে বিনিয়োগ খুবই কঠিন। সেখানকার অর্থনীতিও জটিল অবস্থায় রয়েছে। অনেক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে আমাদের বিনিয়োগের খুব সামান্য অংশ এ দেশে এসেছে। এর বড় কারণ আমরা বিদেশ থেকে ঋণ আনতে পারছি না। আমরা বেশ কয়েকবার বিদেশ থেকে ঋণ আনার অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছি; কিন্তু অনুমোদন দেওয়া হয়নি। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, আমরা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেছি বলে বৈদেশিক ঋণ অনুমোদন দেওয়া হবে না। একজন বিনিয়োগকারীর জন্য পুরো বিনিয়োগ মূলধন আকারে করা কঠিন। ঋণ নিতেই হয়। আমরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ তিন-চার গুণ বাড়াতে চাই। এ দেশে আমরা কমপক্ষে এক হাজার অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করতে চাই। এ জন্য ঋণ আনতে দিতে হবে। আমরা ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে যেভাবে বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছি। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কারণে সেটি এখানে সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে অন্য কোনো দেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ করতে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু সিঙ্গাপুর থেকে আমরা ঋণের অর্থ বাংলাদেশে আনতে পারিনি। এক মাস অপেক্ষা করে সেই অর্থ ফেরত পাঠাতে হয়েছে।

সরকার যদি আমাদের শুধু মূলধন বিনিয়োগ করতে বলে, তাহলে আমরা বড় বিনিয়োগ করতে পারব না। বিদেশ থেকে একটি কম্পানি মূলধন বা ঋণ, যা-ই নিয়ে আসুক—সবই বিদেশি বিনিয়োগ। এ সুবিধা শুধু আমাদের জন্য নয়, সব বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্যই চাচ্ছি।

এ দেশ থেকে অর্থ ফেরত নেওয়াও যাচ্ছে না। বিনিয়োগের পাঁচ বছরের পর ছাড়া অর্থ ফেরত নেওয়া যায় না। নিতে হলে কম্পানি বন্ধ করে নিতে হয়। এ রকম হলে একেকটা প্রকল্পের জন্য একটি করে কম্পানি খুলতে হবে। এরপর সেই কম্পানি বন্ধ করে অর্থ ফেরত নিতে হবে। এটা ব্যবসা নয়। আমরা আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। আমরা আবাসন নির্মাণ করব, তা বিক্রি করে লাভ নিয়ে যাব। আবার প্রয়োজনে বিদেশ থেকে অর্থ এনে বিনিয়োগ করব। এটাই নিয়ম হওয়া উচিত। কিন্তু এ দেশে তা সম্ভব হচ্ছে না। ক্রিড গ্রুপ জাপানের অন্যতম বৃহৎ আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। গ্রুপটির বাৎসরিক লেনদেনের (টার্নওভার) পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ডলার। বাংলাদেশে আমাদের বড় বিনিয়োগের ইচ্ছা রয়েছে। তবে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা যে ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়েছি, সেগুলো দূর হলেই কেবল তা সম্ভব। আমাদের এ সমস্যার কথা আমরা ঢাকাস্থ জাপানি দূতাবাস কিংবা ঢাকায় জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্লাটফর্ম ‘জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ইন ঢাকা’কে জানাইনি। কারণ আমরা মনে করি, এটি বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমরা সরকারের কাছেই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার বিষয়ে সহযোগিতা চাচ্ছি।

 

ক্রিড গ্রুপের ভবন মানুষের জীবন উন্নত করে

হিসায়া সুজিয়ামা

স্থপতি ও পরিচালক, এআইএ জাপান

আমি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত একজন স্থপতি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা করেছি। ক্রিড গ্রুপের সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। প্রতিষ্ঠানটি এমন ধরনের ভবন নির্মাণ পছন্দ করে, যা মানুষের জীবনকে উন্নত করে এবং আনন্দ দেয়।

বাংলাদেশেও আমরা নতুন ডিজাইন ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবন নির্মাণ করতে চাই, যা এ দেশের আবাসন খাতে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে। মানুষ হয়তো তা গ্রহণও করবে।

এ দেশে আমি দেখেছি নির্মাণের ধরনগুলো মোটামুটি একই রকম। নির্মাণশৈলীতে তেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই।

যেমন এ দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপকরণ হিসেবে ইট ব্যবহার করা হয়। এতে বেশি দক্ষতার দরকার হয় না। কিন্তু ইটের বাড়ির নকশায় বাড়তি সৌন্দর্য আনার সুযোগ সীমিত। এতে নির্মাণে সময়ও অনেক বেশি লাগে, যা নির্মাতার জন্য ক্ষতিকর। এর বদলে আরো কিছু উপকরণ ব্যবহার করা সম্ভব, যা একটি ভবন নির্মাণে সময় কম লাগাবে। এতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপার্টমেন্ট দ্রুত বিক্রি ও হস্তান্তর করতে পারবে।

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের শপিং সেন্টারগুলোও ক্রেতা উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি আছে। এ দেশে দোকানগুলো ছোট ছোট। কেনাকাটা সব সময় মজার হওয়া উচিত। কিন্তু এ দেশের শপিং সেন্টারগুলো কেনাকাটাকে মজার করে তোলে না। শপিং সেন্টারগুলোর ছাদ অনেক নিচু। এটি আরো উচ্চতায় হওয়া উচিত, যা ক্রেতাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়। বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের মতো করে নকশা করছে, ভবন নির্মাণ করছে। আমি ভিন্ন দেশে কাজে অভিজ্ঞ। জাপানি কিংবা অন্য দেশের ডিজাইন ও ভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে ভবন নির্মাণ করলে তাতে ভিন্নতা আসবেই। সেটি এ দেশের মানুষ গ্রহণ করবে বলে আমার বিশ্বাস রয়েছে।

বাংলাদেশে আরেকটি জিনিস আমি দেখেছি, সেটি হলো আলাদা টয়লেট। এখানে অফিসের আয়তন ছোট। তার মধ্যেই নিজস্ব টয়লেট থাকে। তা সম্ভবত কর্মকর্তাদের জন্য। কেন এখানে সবার জন্য একটি কমন টয়লেট থাকে না। নিজস্ব টয়লেটের মাধ্যমে সম্ভবত বিশেষ কোনো মর্যাদা বোঝানো হয়।

 

শুধু হিসাব খোলার ফরমে স্বাক্ষর দিতে ঢাকা আসতে হয়

ইকবাল হোসেন চৌধুরী

চেয়ারম্যান,জেমস গ্রুপ

২০০৮ সাল থেকে আমরা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় আছি। আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল বসুন্ধরা। শুরু থেকে আমরা বসুন্ধরার সঙ্গে অনেক প্রকল্প করে আসছি। ২০১৪ সাল থেকে আমরা ক্রিড গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করি।

তাদের মতো আরো কয়েকটি জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা আছে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা আমাদের চোখে পড়েছে।

কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে প্রথমেই তাঁকে এ দেশে একটি ‘প্রপোজড অ্যাকাউন্ট’ খুলতে হয়। কিন্তু অনেক ব্যাংকের শাখা ম্যানেজাররাই এ ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলার সঙ্গে অভ্যস্ত নন। এ বিষয়ে অনেক ব্যাংক কর্মকর্তারই কোনো ধারণাই নেই। এ ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াও বেশ কঠিন। ‘প্রপোজড অ্যাকাউন্ট’ খোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন রয়েছে—অনেক ব্যাংকের ব্যবস্থাপক এটা সঠিকভাবে জানেন না। সে জন্য অনেক বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্ট আমরা খুলতে পারি না। আবার এই অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য নির্দিষ্ট ফরমে যার নামে অ্যাকাউন্ট হচ্ছে, তার স্বাক্ষর দরকার হয়। ফলে শুধু একটি হিসাব খোলার ফরমে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্যই বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আসতে হচ্ছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিরক্ত হচ্ছেন।

বিদেশি মুদ্রা টাকায় রূপান্তর করতে গিয়েও আমাদের অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এক ডলারে দিচ্ছে ৭৭.৮০ টাকা, কোনো কোনো ব্যাংক দিচ্ছে ৭৭.৯০ টাকা। যখন একসঙ্গে অনেক বিদেশি মুদ্রা আসে, তখন ব্যাংক ভেদে টাকার অঙ্ক কম-বেশি হয়। ফলে কোন ব্যাংকে গেলে বেশি টাকা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে ভাবতে হয়। সব ব্যাংকেই বৈদেশিক মুদ্রার একটাই বিনিময়মূল্য থাকা উচিত।

এ ছাড়া জয়েন্ট স্টক কম্পানিতে আমরা যখন নিবন্ধনের জন্য যাই, তখন অনেক বেশি সময় লেগে যায়। অনেক ধরনের জটিলতা রয়েছে। বাংলাদেশে আলাদা আলাদাভাবে বিনিয়োগ বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, জয়েন্ট স্টক কম্পানি ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে বিনিয়োগকারীদের অনেক দিন ধরে ঘুরতে হয়। এসব সংস্থার কার্যক্রম যদি একটি জায়গায় করতে পারতাম তবে চার থেকে পাঁচ মাসের পরিবর্তে এক সপ্তাহেই আমাদের অনুমোদনের কাজটি হয়ে যেত। এটা জাপানসহ উন্নত বিশ্বে হচ্ছে। এ জন্য সরকারের উচিত সংস্থাগুলোর কাজ দ্রুত ও সহজতর করতে এবং বিনিয়োগকারীদের অস্বস্তি দূর করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে একসঙ্গেই সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম সম্পন্ন করে ফেলা। কোনো কোনো খাতের জন্য এ ব্যবস্থা রয়েছে। আবাসন খাতের জন্যও এ ব্যবস্থা চালু করা দরকার। কারণ, বাংলাদেশে আবাসনের বিরাট চাহিদা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

গত কিছুদিন আগে সিঙ্গাপুর থেকে ক্রিড গ্রুপের একটি বিনিয়োগ ঋণ হিসেবে এসেছিল কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ ও বিনিয়োগ বোর্ডের মৌখিক একটি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও এক মাস চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত ঋণটি ফেরত চলে যায়। এ কারণে বিদেশি এই বিনিয়োগকারীরা মনে কষ্ট পান। তাঁদের ঋণের অর্থ ক্রিড গ্রুপের আরেকটি কম্পানি ও বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে এসেছিল। এভাবে একই গ্রুপের আরেক কম্পানি থেকে ঋণ নেওয়ার রীতি সারা বিশ্বেই আছে। ক্রিড গ্রুপের অন্যান্য কম্পানির কাছে প্রচুর অর্থ আছে। সেগুলো বাংলাদেশে আনার সুযোগ পেলে তারা বড় বিনিয়োগ করতে পারবে।

আমাদের দেশে ব্যাংকঋণের সুদের হার অনেক বেশি। বিদেশের ব্যাংকগুলোতে সুদের হার খুবই কম। ১-২ শতাংশের মতো। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি নিজ দেশ বা দেশের বাইরে থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে চায় তাহলে তাদের সে সুযোগ দেওয়া উচিত। অন্তত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিদেশি ঋণের অনুমোদন চায় জাপানি এই ব্যবসায়ী গ্রুপটি।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সমস্যার আরেকটি দিক হলো আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে বিনিয়োগের পর মুনাফার টাকা পাঁচ বছরের আগে নিজ দেশে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এই নিয়মও পরিবর্তন করা দরকার। অন্তত পাঁচ বছরের বদলে তা তিন বছর করার দাবি জানিয়েছেন জাপানি বিনিয়োগকারীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, একটি ভবন নির্মাণ ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করতে দুই বছরের বেশি সময় লাগে না। এ ক্ষেত্রে পাঁচ বছর অপেক্ষা করা কঠিন। এসব কারণে তাঁরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

ক্রিড গ্রুপ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে ২৪ কাঠা জমিতে ভবন নির্মাণ করবে। এ ছাড়া বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে ক্রিড গ্রুপ ২০০০ অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করতে আগ্রহী। এসব অ্যাপার্টমেন্ট হবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য। অ্যাপার্টমেন্টগুলোর আকার হবে ৭০০ থেকে ১০০০ বর্গফুটের। মাদানী এভিনিউসংলগ্ন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ক্রিড গ্রুপ ৩০ থেকে ৪০ বিঘা জমিতে এসব অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। সরকার বিদেশ থেকে ঋণ আনার সুযোগ দিলে তারা দ্রুতই এখানে বিনিয়োগ বাড়াবে।

 

দ্বার উন্মুক্ত হলে গোটা বিশ্ব থেকে বিনিয়োগ আসবে

মো. শাহাদত হোসেন

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জেমস গ্রুপ

আমাদের দেশে বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত হলে আরো অনেক বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। শুধু জাপানই না, গোটা বিশ্ব থেকে বিনিয়োগ আসবে। আমরা উন্নতি করতে পারব, এখানে অনেকের চাকরির সুযোগ হবে।

আমরা চাচ্ছি বিনিয়োগ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে বিদেশি বিনিয়োগের মূলধন মুনাফাসহ নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার সে ধরনের সুযোগ সরকারের তরফ থেকে করে দেওয়া হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

 

আয়কর আইনের ১৯-এর খখ ধারা সংশোধন করতে হবে

তৌহিদুল ইসলাম

নির্বাহী পরিচালক, ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট (প্রা.) লিমিটেড

বর্তমানে আবাসন খাতের বাজারের অবস্থা ভালো নয়। এ খাতে বিনিয়োগ করতে গেলে অর্থের উৎস নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করে।