kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

পররাষ্ট্রনীতি

আগামী ৫০ বছর হবে অনেক কঠিন

এম হুমায়ুন কবির

১৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আগামী ৫০ বছর হবে অনেক কঠিন

বৈরী পৃথিবীতে যদি আমরা শান্তির জায়গা অন্বেষণ করতে চাই তাহলে আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতাও বাড়াতে হবে। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের গল্প দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার, আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার। আগামী দিনগুলোতে হবে উন্নত বাংলাদেশের গল্প। সেই গল্পটা গত ৫০ বছরের গল্প থেকে একেবারেই ভিন্ন হবে। এই সেই বাংলাদেশ, যাকে হেনরি কিসিঞ্জারের একজন আন্ডারসেক্রেটারি বলেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’।

বিজ্ঞাপন

কিসিঞ্জার বলেছিলেন, এটি যেন আমাদের জন্য ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ না হয়। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৩৩তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।

আজ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক। প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কিভাবে সম্পর্কে ভারসাম্য রাখছি? আমাদের সামগ্রিক প্রয়োজনের আলোকে যার কাছে যেটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন, সেই সহযোগিতা নিয়ে তাদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে আমরা সবার সঙ্গে আছি। আর এর মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রয়োজনের নিরিখে তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখছি।

আবার প্রশ্ন আসতে পারে, ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে কি না? আমি বলব, সমস্যা তো থাকবেই। এখানে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়াই তো কূটনীতির কাজ। যে জায়গায় সমস্যা বা যে জায়গাগুলোতে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় না, সেই জায়গাগুলোতে আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সামঞ্জস্য বা সাযুজ্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের দিক থেকে বলব, আমরা এখন পর্যন্ত মোটামুটি সবার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি, তেমন কোনো জটিলতায় পড়িনি। আশা করি, আমাদের কূটনৈতিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ মাথায় রেখে আগামী দিনগুলোতেও সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করব।

আমরা বিশ্বের সঙ্গে কিভাবে সংযুক্ত থাকতে পারি এবং এই সংযুক্তির মাধ্যমে কিভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ স্বপ্ন বা লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারি তার দৃষ্টান্ত গত ৫০ বছরে তৈরি হয়েছে। ১৯৭১ সাল আজ তরুণ প্রজন্মের কাছে অনেকটাই গল্পের মতো শোনায়। তখন থেকেই আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। প্রথমত, আমরা জাতি হিসেবে দাঁড়াতে পারব কি না তা নিয়ে বিশ্বে সংশয় ছিল। পাকিস্তান বলছিল, কিছু বিভ্রান্ত তরুণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, পাকিস্তান ভাঙার জন্য ষড়যন্ত্র করছে।

আমাদের চ্যালেঞ্জ ছিল, আমাদের বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, সুশাসনের স্বপ্নের গল্পগুলো বিশ্বের মানুষ শুনতে পাচ্ছিল না। দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র সংগ্রামের সময় আমাদের বন্ধুদের সমর্থন আমরা কতটা পেয়েছিলাম? কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলছি, ভারতের জনগণ, ভারতের সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল সে সময়। সেখানেও আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ যা ছিল—বাংলাদেশের গল্পটা কোথায়? এটি পাকিস্তান-ভারত সমস্যার জালে আটকা পড়েছিল।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ কিন্তু তখন দরিদ্র দেশ ছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতি এতই দুর্বল ছিল তখন, শুধু কৃষি অর্থনীতির বাইরে আমাদের কোনো অর্থনীতি ছিল না। সেই জায়গায় একটি দেশ স্বাধীন হলে সে দাঁড়াবে কিসের ভিত্তিতে? যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ কিভাবে চলবে? আমার নিজের সম্পদ ছিল না। বাজেটের অর্থের বড় অংশই অন্যের কাছ থেকে ধার করে আনতে হয়েছে। এ রকম একটা অর্থনীতিতে কিন্তু বাংলাদেশের যাত্রা। সেই জায়গা থেকে আজকে আমরা অভ্যন্তরীণভাবে, সামাজিকভাবে আমাদের জীবনযাত্রার মান, মানুষের গড় আয়ু, মাথাপিছু আয় থেকে শুরু করে সার্বিক জিডিপি অনেক দূর এগিয়েছি। এই অসাধারণ অর্জনগুলোর কারিগর সাধারণ মানুষ। সব সরকারই সেগুলোর সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সম্মিলিত প্রয়াসের ফল হিসেবেই কিন্তু আজ ৫০ বছর পর আমরা যখন সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করছি, তখন আমাদের আনন্দটা অনেক বেশি মাটি-মানুষের আত্মত্যাগ ও প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশিরা বিশ্বের ১৬০টি দেশে আমাদের অগ্রগতি, আত্মপরিচয় পৌঁছে দিচ্ছে। আজকের পৃথিবীতে বাংলাদেশের নামটা আর অপরিচিত, অবহেলিত নয়। আমাদের নিয়ে বিশ্বের দ্বিধাদ্বন্দ্বও কিন্তু আর নেই। কাজেই পররাষ্ট্রনীতির জায়গাটায় এ পর্যন্ত ইতিবাচক কাজগুলো আমরা সম্পন্ন করতে পেরেছি।

আমরা যখন ৫০ পেরিয়ে যাচ্ছি, তখন আমাদের সামনে কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। আমরা এলডিসি থেকে বেরিয়ে এখন উন্নয়নশীল দেশের জায়গায় যাচ্ছি। কিন্তু আমরা যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছি সেই অর্জনটা কি সুষম? বৈষম্য তো বাড়ছে। আমাদের যে শ্রমশক্তি তার প্রায় ৯০ শতাংশ এখনো অপ্রচলিত খাতে কাজ করে। তাদের শ্রমের বা জীবনযাত্রার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদের জীবনযাত্রার একটা ন্যূনতম নিশ্চয়তা তৈরি করার জন্য আমরা কি অর্থনীতিটাকে কাজে লাগাতে পারছি? অথচ তারাই তো অর্থনৈতিক বড় একটা চালিকাশক্তি।

আমরা যখন উন্নয়নশীল দেশের কাঠামোতে যাচ্ছি, তখনো আমাদের এক-পঞ্চমাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এক কোটিরও বেশি মানুষ, যারা বাইরে বাস করে, তাদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমরা এখনো করতে পারিনি। গার্মেন্টের জন্য, যেখানে ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করে, তাদের জন্যও কিন্তু আয়-রোজগারের নিশ্চয়তা বা ন্যায্য আয় যেটি হবে, সেটি আমরা সুনিশ্চিত করতে পারিনি। এ বিষয়গুলো আমাদের আগামী ৫০ বছরের অর্থনীতি যেটি হবে, সে জায়গার জন্য চাহিদা হিসেবে থাকবে।

আজ আমরা বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের অনেক গল্প বলি। কিন্তু আমরা কি এটাও দেখি না যে নারীদের নিরাপত্তা এখনো সুনিশ্চিত নয়। এখনো বাংলাদেশ নারীদের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ নয়। নারীরা যদি আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক হয়ে থাকে, তাদের জন্য যদি আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ, সম্মানজনক বাংলাদেশ তৈরি করতে না পারি, তাহলে সেই বাংলাদেশকে কি আমরা সামাজিকভাবে শিষ্টাচারের বাংলাদেশ বা নিরাপদ বাংলাদেশ বলব?

এখনো শিশুদের জন্য আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ তৈরি করতে পারিনি। মানুষের মৌলিক যে জায়গাগুলো আছে, যেগুলোর সঙ্গে সামাজিক অনেক বিষয় জড়িত, সেই জায়গাগুলো আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আছে। এগুলো শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। আগামী দিনে উন্নয়নশীল দেশের কাঠামোতে যখন যাব, তখন কিন্তু মানুষ উঁকি দিয়ে দেখবে এই জায়গাগুলোতে আমরা কতটা অগ্রগতি সাধন করতে পারলাম।

আমরা গণতান্ত্রিক দেশ, ন্যায়বিচার, মানুষের সম্মানের কথা বলছি। সেটা কি আমরা পারছি? সাম্প্রতিককালের যে ঘটনাগুলো আমরা দেখছি, এটা কি আমাদের জন্য খুব সম্মানজনক? আমি যখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাব তখন কিন্তু অন্য দেশগুলো জানতে চাইবে, তোমার এখানে ন্যায়বিচার আছে কতটা? এখানে গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী? কতটা অসাম্প্রদায়িক? সবার জন্য বাসযোগ্য দেশ আমরা তৈরি করতে পেরেছি কি? ভুলে গেলে চলবে না, এই সবগুলো কাজের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দরকার। আমরা যখন সবার জন্য একটা দেশ গড়তে চাই শান্তিপূর্ণ, সহনশীল, সবার প্রতি সম্মানভিত্তিক; সেটা করার ব্যবস্থাটাই তো গণতান্ত্রিক হতে হবে। সে জায়গাটায় আমরা কোথায় আছি সেটাও কিন্তু বিশ্বের মানুষ দেখবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সেটার ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কথা বলবে।

এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে যে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমরা যদি ‘জিএসপি প্লাস’ পেতে চাই, তাহলে এসব সুবিধা—মানুষের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক অধিকার, ন্যায়বিচার, মর্যাদা বা বড় অর্থে যদি মানুষের নিরাপত্তা, এটা কতটা অগ্রগতি হলো সেটা তারা মূল্যায়ন করে দেখবে। যদি আমরা মূল্যায়নে উত্তীর্ণ না হই তাহলে ‘জিএসপি প্লাস’ পাওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

আমরা এত দিন একপাক্ষিকভাবে যেসব সুবিধা পেয়ে আসছি, যেমন—বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অধিকার, ঋণের, অভিবাসনের সুবিধা—আগামী দিনে এসব সুবিধা কিন্তু দিতে হবে এবং নিতে হবে। দ্বিপাক্ষিকতার বিষয় কিন্তু তখন উঠে আসবে। তখন সেই দ্বিপাক্ষিকতাটা দেওয়ার জন্য আমি কি অভ্যন্তরীণভাবে যথেষ্ট উৎপাদনশীল হতে পেরেছি? আমি কি যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে আমার পণ্য ও সেবা তৈরি করতে পারছি?

আমরা কি শুধু সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে আমাদের রপ্তানি কাঠামোকে দাঁড় করিয়েছি? নাকি বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনার ওপর, মানুষের মেধার ওপর সেটাকে দাঁড় করাচ্ছি? আগামী দিনের পৃথিবীটা তো জ্ঞানভিত্তিক হবে। সেখানে কিভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবটিক, বিগডাটার বড় ভূমিকা থাকবে। সেখানে নতুন প্রজন্মকে কিভাবে সম্পৃক্ত করে তাদের আগামী পৃথিবীর জন্য তৈরি করেছি? নাকি আমরা ডিজিটাইজেশনকে খুবই সংক্ষিপ্ত বা স্বল্পমেয়াদি উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছি? সেগুলো আমাদের চিন্তা করতে হবে।

আমরা যে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হব, তার জন্য কি প্রতিযোগিতামূলক জাতি হিসেবে আমরা দাঁড়াচ্ছি? নাকি আমরা শুধু অভ্যন্তরীণভাবে একে অন্যের বিরুদ্ধে মনোযোগী থাকছি? কারণ আমরা যদি অভ্যন্তরীণভাবে সুসংহত না থাকি, একটা জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে না পারি তাহলে কিন্তু বাইরের পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা আমাদের জন্য কঠিন হবে।

২০২৬ সালের পর আমি চাইলেই কেউ কিছু দেবে না আমাকে। আমি যা চাই সেটি অর্জন করতে হবে। আমার ক্ষেত্র আমার নিজেকে তৈরি করতে হবে। আমরা শান্তিপূর্ণ দেশ। এটাই আমাদের মূলমন্ত্র। বঙ্গবন্ধু বলেছেন—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।

একটা বৈরী পৃথিবী আমাদের চারপাশে তৈরি হচ্ছে। সেই বৈরী পৃথিবীতে যদি আমরা শান্তির জায়গাটা অন্বেষণ করতে যাই তাহলে আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতাও বাড়াতে হবে। তার জন্য আমাদের বিনিয়োগ, পেশাদারি, দক্ষতা দরকার।

 

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত, বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট



সাতদিনের সেরা