kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

সয়াবিন তেলের বদলে

সয়াবিন তেল যেন সোনার হরিণ। সবাই ছুটছে সয়াবিন তেলের খোঁজে। কেউ পেলেও দাম দিতে হচ্ছে অনেক বেশি। এ অবস্থায় সয়াবিনের বিকল্প উপায় ভাবা আমাদের সবার জন্য জরুরি। বিকল্পগুলো কী হতে পারে? লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুমাইয়া মামুন

১৬ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সয়াবিন তেলের বদলে

মডেল : পিউলি, ছবি : রেজওয়ান কবির

দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় তেলের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে, তবে তা কতটুকু? এটি আমরা হয়তো অনেকেই জানি না। তথ্যটি জানা থাকলে সয়াবিন কেন, যেকোনো তেল ব্যবহারেই আমরা সংযমের পরিচয় দিতে পারি। বিশেষ করে বর্তমানে সয়াবিন তেল নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে—এ পরিপ্রেক্ষিতে এর বিকল্প প্রত্যেকের ভাবা উচিত।

মনে রাখতে হবে, তেল আমাদের ক্যালরি ও ফ্যাটি এসিডের উত্স হিসেবে কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় চামচ তেলই যথেষ্ট। যখন আমরা বেশি তেল ব্যবহার করি, তখন খাবারে ক্যালরির মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি; যেমন—স্থূলতা, হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি দেখা দেয়। স্থূলতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চলে আসে টাইপ টু ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ইত্যাদি। কারণ ভোজ্য তেলের মধ্যে চর্বি বা ফ্যাট থাকে। এখন নিজেই ভেবে দেখুন বেশি বেশি সয়াবিন তেল খেয়ে শরীরে এসব রোগ আমদানি করবেন, নাকি তেল কম খাবেন।

দৈনন্দিন রান্নায় সয়াবিন তেলের বদলে সরিষা, সূর্যমুখী, অলিভ অয়েল, ঘি বা মাখন পরিমাণে অল্প ব্যবহার করলেও বেশ কয়েকজনের খাবার হয়ে যাবে

বাজারে এখন নানা ধরনের তেল পাওয়া যায়। কিন্তু চলমান সয়াবিন তেলের সংকটে সবাই দিশাহারা। স্বল্পতার কারণে দাম হয়ে চলেছে গগনচুম্বী, যা একজন সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। তাহলে তেল ছাড়াই কি জীবন পার করতে হবে? এ প্রশ্ন সবাই মনে মনে ভাবতে শুরু করেছেন। একটু ভিন্নভাবে ভাবুন।

রান্নায় তেলের মাত্রা কমানো

আগেই বলেছি একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় চামচ তেলই যথেষ্ট। তারপরও আমরা খাবারকে অতিরিক্ত সুস্বাদু করতে গিয়ে বেশি বেশি তেল অপচয় করে ফেলি। বেশি তেলে ভাজাপোড়া খাবারগুলো যদি এড়িয়ে চলি, তাতে ক্ষতি কি! ডুবোতেলে অনেকক্ষণ ধরে রান্না খাবার ট্রান্স ফ্যাটের উত্স, যা আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় বহুগুণ। এই রোগগুলো মোকাবেলা করতেও আমাদের মাসে ব্যয় হয় প্রচুর টাকা, যা একটি সাধারণ পরিবারের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা।

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন

আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই সমস্যার অনেক সমাধান হয়।

বাজারে প্রচলিত ভোজ্য তেলগুলোর ব্যবহার শিখেছি খুব বেশিদিন হয়নি। প্রাচীনকালে এই উপমহাদেশে রান্নায় ব্যবহার হতো সরিষা, নারকেল, তিল, বাদাম ও তিসির তেল। যখন সয়াবিন তেল বাজারে আসে, তখনো সঙ্গে সঙ্গেই তার ব্যবহার বেড়ে যায়নি। ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন হয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। আমরা অভ্যাসের দাস। এখন সয়াবিনের বিকল্প ভাবার সময় এসেছে।

সরিষার তেলে সমাধান

এক সময় গ্রামবাংলার একমাত্র ভোজ্য তেল ছিল সরিষা তেল। পরবর্তীতে সয়াবিন তেলের ব্যাপক প্রচলনের কারণে রান্নায় সরিষা তেলের ব্যবহার দিন দিন কমতে শুরু করে। এখন সময় হয়েছে সরিষা তেলে ফেরার। এটি স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারি। এই তেলের স্যাচুরেটেড ফ্যাট মাত্র ৭ শতাংশ। রয়েছে ভিটামিন ই, কে ও উদ্ভিজ্জ কোলেস্টেরলের মতো উপাদান। যা হূদপিন্ডের জন্য উপকারি। সরিষার তেলের ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডও স্বাস্থ্যকর উপাদান। সরিষার তেলে মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ ৬০ শতাংশ। ফলে আমাদের শরীরের কোলেস্টেরলের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুকি কমে। খাবার পরিপাকে সাহায্য করে।   

রাইস ব্রান তেল উপকারি

রাইস ব্রান তেল তুষ থেকে তৈরি হয়। আমাদের দেশে চাইলেই এর উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব। রাইস ব্রান তেল মনো-আনস্যাচুরেটেড এবং পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ। তা ছাড়া এর স্মোক পয়েন্ট (২৫৪ ডিগ্রি) বেশি হওয়ায় যেকোনো রান্নায় ব্যবহারের উপযোগী। এই তেল রক্তের কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ কমায়। তা ছাড়া টাইপ টু ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগারের মাত্রাও কমায়। এতে ক্যান্সার প্রতিরোধী গুণাবলিও আছে। এতে থাকা গামা ওরাজেনোল রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে।

সানফ্লাওয়ার তেল ভালো বিকল্প

এই তেল প্রচুর পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ এবং এর স্মোক পয়েন্ট অনেক বেশি ২২৭ ডিগ্রি। তাই দৈনিক যেকোনো রান্নার জন্য উপযোগী। সানফ্লাওয়ার তেলে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ আছে, যা রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং হূদরোগের ঝুঁকি কমায়।

জলপাই তেল স্বাস্থ্যকর

জলপাই তেলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ, হাড় মজবুত করা, ওজন কমানো, মন প্রফুলস্ন রাখা এবং কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এই তেলের স্মোক পয়েন্ট কম। তাই ভাজাভুজি না করে সবজি, মাছ স্টিম বা সতে করাই ভালো।

নারকেল তেলে রান্না যায়

কী ভাবছেন! কথাটি আপনার কাছে নতুন শোনালেও অনেক দেশেই নারকেল তেলে রান্নাবান্না করা হয়। নারকেল তেল আমাদের পাকস্থলির খাবার দ্রুত হজমে সহায়ক। শরীরের শক্তি বৃদ্ধিতেও কাজে দেয় নারকেল তেল, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কেক, কুকিজের মতো বেকিংয়ের জন্যও নারকেল তেল উত্তম।

বাদামজাত তেলে ভালো ফ্যাটি এসিড তো আছেই, সঙ্গে আছে প্রচুর ভিটামিন ‘ই’। বাদামের তেল হূদরোগের ঝুঁকি কমায়, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এমনকি ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে।

বৈশ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের সয়াবিন তেলের বিকল্প ভাবতেই হবে। আমাদের হাতের কাছে যে তেল উত্পাদনের উত্স আছে, সেগুলো কাজে লাগানো প্রয়োজন। এছাড়া সবার আগে নিজেদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি। খাবার সব সময় বেশি তেলে রান্না বা ভাজাপোড়া না করে বেক বা গ্রিল করে খাওয়ার অভ্যস গড়ে তুলতে হবে। যেসব খাবার ভাপে রান্না করে খাওয়া যায় সেদিকে অভ্যস্ত হতে হবে। বাজারে এখন এয়ার ফ্রায়ার, প্রেসার কুকার, ওভেন, নন স্টিক কড়াইসহ অনেক ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাওয়া যায়। এসব যন্ত্রে কম তেলে বা তেল ছাড়াই রান্না, ভাজাপোড়া করা যায়। এগুলোর উপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে।

 

 



সাতদিনের সেরা