kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

শিশু যখন বেশি লাজুক

যেসব শিশু বেশি লাজুক পরবর্তী জীবনে নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে তারা। করণীয় কী জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহজাবিন খানম। লিখেছেন আতিফ আতাউর

২৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশু যখন  বেশি লাজুক

পড়াশোনায় বেশ ভালো আবু সাইদ রাদ। বরাবরই ক্লাসে প্রথম। স্বভাবে ভীষণ লাজুক রাদকে নিয়ে প্রথম দিকে তেমন চিন্তা করেননি মা-বাবা। ভেবেছিলেন বড় হতে হতে লাজুকতা কমে যাবে। কিন্তু হাই স্কুলে ভর্তি হয়েও লাজুক স্বভাব যেন আগের চেয়ে বেশি। সহপাঠী মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা, ছেলে বন্ধুদের সঙ্গেও খুব একটা মিশতে দেখা যায় না ওকে। খেলাধুলার চেয়ে ঘরে বসে পড়াশোনা আর সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ ওর। শিক্ষকরাও রাদের লাজুকতার বিষয়ে অবগত। শ্রেণির পাঠ জানা থাকলেও ঠিকঠাক উত্তর দেয় না। ভালো ছাত্র বলে সবাই ওর সঙ্গে মিশতে চাইলেও তাতে রাদের প্রচ্ছন্ন আপত্তি।

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো শিশুদের স্বভাবেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। কারো চাপা স্বভাব তো কেউ মিশুক, কেউ লাজুক। তবে যারা অতিরিক্ত লাজুক, তাদের প্রধান সমস্যা হতে পারে আত্মবিশ্বাসের অভাব। নিজের যেটা প্রয়োজন সেটা চাওয়া থেকে দূরে থাকা, অধিকার আদায় থেকে সরে থাকা, একাকী হয়ে পড়া ভালো দিক নয়। লাজুক স্বভাব শিশুকে অনেক ইতিবাচক দিক থেকে দূরে রাখে, ব্যক্তিত্ব গঠনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাড়তি চাহিদা নয়

শিশুর কাঁধে প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেবেন না। যখন শিশুর কাঁধে প্রত্যাশার চাপ বেড়ে যায় এবং সেটা পূরণ করতে ব্যর্থ হয় তখনই তার মধ্যে লজ্জাবোধ চেপে বসে। আমি পারিনি—এই বোধ তাকে লজ্জায় ফেলে। এতে শিশু আরো লাজুক হয়ে ওঠে। এ জন্য শিশুর সামর্থ্যের মধ্যে চাহিদা সীমাবদ্ধ রাখুন। ক্লাসে কোনো বিষয় না পারা, কোনো বিষয়ে কম জ্ঞান থাকাসহ নানা ব্যাপারে শিশুর অজ্ঞতা থাকতেই পারে। তাকে সেটা শিখতে বলুন। সে নিজে থেকে যেটা করতে পারে তাতেই তাকে উত্সাহ দিন। কিছু করতে ব্যর্থ হলে পরেরবার করার জন্য অনুপ্রেরণা দিন।

শ্রেণি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলুন

শিশু লাজুক হলে আগেই ওর শ্রেণি শিক্ষককে জানিয়ে রাখুন। শিশু যদি মুখচোরা হয়, নিজ থেকে সুবিধা-অসুবিধার কথা না বলে, তবে এটা করা জরুরি। অনেক লাজুক শিশু পড়া করে আসে ঠিকই; কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস না করলে নিজ থেকে বলে না বা জানাতে চায় না। কিংবা কিছু জিজ্ঞেস করলেও লাজুকতার কারণে বলতে চায় না। তার প্রভাব ওর পড়াশোনায় পড়তে পারে। শিক্ষক তার সম্পর্কে আগে থেকে জানলে তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করতে পারবেন।

আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলুন

আপনার সন্তান ঠিক কোন কোন বিষয়ে বেশি লাজুক সে সম্পর্কে একটি তালিকা করতে পারেন। ক্লাসভীতি, আত্মীয়-স্বজন এলে লুকিয়ে থাকা, বেশি লোকসমাগম এড়িয়ে চলা, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ থেকে দূরে থাকা, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সহজে না বলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিশুদের মধ্যে লাজুকতা থাকতে পারে। এ জন্য শিশুকে ক্লাসের পাঠ তৈরি করতে সাহায্য করুন। ওর কাছে পরিবারের সবাই মিলে পাঠটি শুনতে চান। যদি বেশি লোকের সামনে কথা বলতে লজ্জা পায়, তবে আগে পরিবারের সামনে ওকে বক্তব্য দিতে অনুশীলন করান।

শিশুকে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া মজার ঘটনা সম্পর্কে কথা বলতে উত্সাহিত করুন। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পারিবারিক পরিমণ্ডলে রাতের খাবারের সময় বলার নিয়ম করতে পারেন। আত্মীয়ভীতি থাকলে তাদের সম্পর্কে মজার মজার গল্প শোনাতে পারেন। এতে শিশুর মধ্যে ভয় কাটবে, ওর আত্মবিশ্বাস বাড়বে। শিশুকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যান। নতুনদের সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিন।

সাফল্য উদযাপন করুন

শিশুর ক্লাসে প্রথম হওয়া, কোনো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়া, জন্মদিনসহ বিভিন্ন উপলক্ষ উদযাপন করুন। ওর বন্ধু, সহপাঠী, শিক্ষক, প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করুন। সন্তানের সাফল্য উদযাপন করা তার জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। সবাই মিলে ওর সাফল্য উদযাপন করলে নিজেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে, লাজুকতা কমবে। 

পাঠবহির্ভূত কাজে অংশ নিতে বলুন

শুধু পড়াশোনা নয়, খেলাধুলা, নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে শিশুকে অংশ নিতে উত্সাহিত করুন। বহির্মুখী ক্রিয়াকলাপ লাজুক স্বভাবের শিশুদের লজ্জা, ভয়, আত্মসন্দেহ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। প্রথম প্রথম তিন-চারজনের ছোট গ্রুপ দিয়ে শুরু করুন। শিশু আত্মবিশ্বাস অনুভব করলে আরো বড় গ্রুপে নিয়ে যান।

সমালোচনা করবেন না

শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তারপর তাকে প্রতিক্রিয়া দেখান। শিশুর কথার মাঝখানে ওকে থামিয়ে দেবেন না। সন্তান যদি বুঝতে পারে তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সমালোচিত হতে হবে, তাহলে সে নিজের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করবে। আপনি ভাববেন লাজুকতার কারণে ও হয়তো কথা বলছে না। ওর মতামত উপেক্ষা করলেও ওর মধ্যে লাজুকতা ভর করবে। তুই পারিস না, তুমি ওর মতো হতে পারো না, ও পারল তুমি পারো না কেন—এই জাতীয় তুলনায় যাবেন না। শিশুর মতামতকে মূল্য দিন।

শিখিয়ে দিন সহবত

শিশুদের স্বভাবের লাজুকতার বড় একটি কারণ কখন কোথায় কী বলতে হবে বা কী করতে হবে—সেটা সম্পর্কে সঠিকভাবে না জানা। নতুন পরিবেশে শিশুদের ঘাবড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু শিশু যদি আগে থেকেই ঁজানে কোন পরিবেশে কেমন আচরণ করতে হয় বা করা উচিত, তাহলে তার মধ্যে বেশি লাজুকতা প্রকাশ পায় না। এ জন্য বিয়ে, জন্মদিন, ভ্রমণ, শপিং, স্কুল, আড্ডা, খাওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোন সহবতটি সবাই পছন্দ করে বা করা উচিত—সে বিষয়ে ছোট থেকেই শিক্ষা দিন।

মনে রাখুন, সব শিশু এক রকম নয়। আপনি শত চেষ্টা করলেও আপনার লাজুক স্বভাবের সন্তানকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, চনমনে, জীবনীশক্তিতে ভরপুর একজন এক্সট্রোভার্ট মানুষে বদলে ফেলতে পারবেন না। স্বভাবের বিষয়টা বেশির ভাগই জিনের ওপর নির্ভরশীল। আবার সব ক্ষেত্রে তা না-ও হতে পারে। কারণ লাজুক স্বভাবের মা-বাবার সন্তানরাও মুখরা হতে পারে। তবে হ্যাঁ, আপনি তার লজ্জা, সংকোচ কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে সহায়তা করতে পারেন। এতে ওর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।



সাতদিনের সেরা