kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

ছক ভেঙে গয়না

শাড়ি মানেই গলা, কান ও হাত ভরে গয়না পরতে হবে—সে ধারণা প্রায় অচলই করে দিচ্ছেন আজকের নারীরা; দুই কানে দুই রকম দুল, এক পায়ে নূপুর—প্রথাভাঙা এমন সাজেও হাজির হচ্ছেন অনেকে; গয়নার ফিলহাল স্টাইল নিয়ে কথা বলেছেন শোভন মেকওভারের রূপ বিশেষজ্ঞ শোভন সাহা। কথা বলে লিখেছেন জিনাত জোয়ার্দার রিপা

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছক ভেঙে গয়না

মডেল : পল্লবী গয়না : বিশ্বরঙ সাজ : শোভন মেকওভার ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

কান ফেস্টিভালে অভিনয়শিল্পী আজমেরী হক বাঁধনের পোশাক, স্টাইল আর গয়না ছিল টক অব দ্য টাউন। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার নানা পত্রিকায়ও ফিচার হয়েছে তাঁর স্টাইল স্টেটমেন্ট নিয়ে। কখনো ব্লাউজ হয়েছে পুরোটাই গয়না, তো কখনো দুই কানে দুই দৈর্ঘ্যের দুল। আলোচনায় এসেছে সবই। সবচেয়ে বড় কথা, এসব গয়না কিন্তু দর্শকের চোখকে আরাম দিয়েছে। এককথায়, দেখতে বেশ লেগেছে। সে মতে এখনকার তরুণীরাও নিজেদের সাজাচ্ছেন নানা অনুষ্ঠানে।

কেমন ধারা পছন্দ

আসলে পছন্দের কোনো ছক নেই, নেই কোনো ব্যাকরণ। সচেতন নারী সাজেন সেভাবেই, যেটাতে তাঁকে ভালো লাগে। সে ভালো লাগার সঙ্গে জুড়ে দেন নিজের রুচি আর চাহিদাকে। ‘ধারা’ বলতে আসলে কিছু নেই আজকাল। শাড়ি পরলেই গাদাখানেক গয়না পরতে হবে, কুর্তিতে বালা চলে না—এসব গত্বাঁধা ধারণা আর কাজ করছে না।

এখনকার গয়না

একটা সময় ছিল, যখন শুধু সোনা-রুপাই ছিল ভরসা। কালে কালে আরো নানা ধাতু গড়ন পেল গয়নার। তামা, পিতল, অক্সিডাইজ পেরিয়ে গয়না রূপ নিল কড়ি, কাঠ, সুতা, শেল, কাপড়, বাঁশ, পাট, বিডস, পাথর নানা ম্যাটেরিয়ালে। আমাদের বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল তো কচুরিপানা, গামছা দিয়েও গয়না বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন। সেসবও পুরনো হলো। নতুনত্ব এনে সাজের ঢং বাড়াতে মেয়েরা খুঁজতে লাগলেন অভিনব কিছু। তারই ধারাবাহিকতা যেন বাঁধনের গয়না নিয়ে এমনতর এক্সপেরিমেন্ট। সে নিরীক্ষা সমাদৃত হলো সর্বত্র।

কোন পোশাকে কেমন

আগল ভেঙেছে প্রচলিত মাইন্ডসেটে। শাড়িতে শুধু একটি মালা বা কানের দুল অথবা শুধু বড় একখানা চুড় বা ব্রেসলেট, কামিজে বা কুর্তিতে একটি বা কয়েকটি বালা একসঙ্গে পরছেন এখন মেয়েরা। পশ্চিমা পোশাক মানেই মিনিমাল গয়না সেটা আর এখন মানছেন না অনেকে; বরং সে ক্ষেত্রে কানে তুলছেন ঢাউস বা লম্বা টপ বা দুল অথবা হাতে পরছেন বালা, ব্রেসলেট। তবে সব আবার একসঙ্গে পরছেন না কেউ। বেছে নিচ্ছেন যেকোনো একটি।

নথ কিংবা নাকফুল

নাকে সোনাই পরতে হবে—এ ধারা অচল করেছেন আধুনিক নারী। বলা যায়, নব্বইয়ের দশক থেকেই নিজেকে আলাদা করতে বিয়ের আগে শৌখিন নারীরা ডায়মন্ডের নাকফুল পরতে শুরু করেন। আর গত দশকে তো রুপা, মেটাল, অক্সিডাইজের নাকফুলও বিপুল জনপ্রিয় হলো দামে কম আর নকশার ভিন্নতার জন্য। একই কারণে শুধু বিবাহিত মেয়েদের মধ্যেই আর আটকে থাকল না নাকফুল পরার প্রবণতা।

 

প্রথা ভাঙার সুর বাজল বিয়েতে

শুধু সোনার গয়না কিংবা গা ভর্তি অনেক গয়নায় মোড়া বউ আজকাল কমই চোখে পড়ে। এখন সোনা ছাড়াও নানা ধাতুর গয়না পরছেন মেয়েরা বিয়েতে। ইমিটেশন হলেও সোনায় ধোয়া হতে হবে, তা-ও নয়; বরং রুপা বা রুপার রঙে অন্য ধাতুর গয়নাও পরছেন কনেরা। ছিমছাম গয়নার সেট তৈরি করে নিচ্ছেন নিজেদের পছন্দমাফিক। সোনার দাম বেশি বলে এক গয়নায়ই বিয়ের সব পর্বে সাজার যে ধারা ছিল তা কিছুটা অস্তমিত। বিয়ের একেক পর্বে সাজতে একেক নকশার গয়নাই পরছেন বেশি। দামের কথা চিন্তা করে তাই সোনা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। সে জায়গা দখল করছে কুন্দন, রুপা, স্টোন, মেটাল। বাগদান, হলুদ, বিয়ে কিংবা বউভাত অনুষ্ঠানে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে তাই গায়ে জড়াচ্ছেন পছন্দের গয়না।

 

কান চলচ্চিত্র উত্সবে আজমেরী হক বাঁধনের পোশাক ও গয়নার ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা সারা বিশ্বে তাঁকে পরিচিত করেছে ফ্যাশনিস্তা হিসেবেই। ঢাকাই জামদানিতে তাঁর ব্লাউজটাই গলার গয়না কিংবা গয়নাটাই যেন ব্লাউজ হয়ে উঠেছে।

 হাতের ব্রেসলেটটাও যেন একাই এক শ!

 

গলায় একটি মালা, তাতেই সাজের পূর্ণতা।

কান ফেস্টিভালে প্রতিটি সাজই বাঁধনকে করেছে আলাদা। এই যেমন রেড কার্পেটে হাঁটার দিন তাঁর কানের দুলের দৈর্ঘ্যই ছিল দেখার মতো। এক কানে বেশ লম্বা, তো অন্য কানে সেই দুলটাই হয়ে গেছে ছোট।

 

তবে গয়না যেমনই হোক, সবার আগে সবার খেয়াল নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে। মানাচ্ছে কি না! সে কথা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না একেবারে।

ডিজাইনার কী বলেন, বাজারে যা চলছে

কনক দ্য জুয়েলারি প্যালেসের স্বত্বাধিকারী ডিজাইনার লাইলা খায়ের কনক বলেন, ‘এখন তো ব্রাইডাল জুয়েলারিতেও মেয়েরা বাহুল্য এড়াতে চান। এসেই খোঁজেন ছিমছাম গয়না। আমাদের নকশায়ও তাই এখন এটার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অনুষ্ঠান বুঝে নানা থিমের গয়না বেছে নিচ্ছেন মেয়েরা। এমনকি শৌখিনরা তো নানা মোটিফের গয়নায়ও সাজছেন বিয়েতে। শুধু বিয়ে নয়, যেকোনো অনুষ্ঠান বা আয়োজনে কিংবা এমনিতে সাধারণ ব্যবহারের জন্যও ভিন্ন ধরনের গয়নার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। মোটিফে ট্রাইবাল (আদিবাসী), জ্যামিতিক, টেরাকোটা যেমন পছন্দ এক শ্রেণির, ঠিক তেমনি একেবারে চিরকালীন ঐতিহ্যবাহী গয়নার কদরও কম নয়।’

চাঁদনী চক মার্কেটের মা জুয়ালার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আমিনুল ইসলাম রানা বলেন, ‘আগে গড়পড়তা চাহিদা ছিল গয়নার। মানে যেকোনো একটি নকশা হিট হলে সেটির অনেক কপি বানিয়ে রাখতাম আমরা। এখন সেই চল কমেছে; বরং এখনকার মেয়েরা অন্যের চেয়ে একটু আলাদাই থাকতে চান। এখন বেশির ভাগ সময় নিজেদের পছন্দের গয়নার ছবি নানা মাধ্যম থেকে জোগাড় করে আমাদের দেন। আমরা সে মোতাবেক তৈরি করে দিই। সোনার গয়না বা সোনালি রঙের প্রতি টানও কমেছে এখনকার মেয়েদের।’

গয়না : অঞ্জন’স,রায় বাড়ি ও ঢং বুটিক

শাড়ির সঙ্গে একটি মালা বা দুল, হাতে শুধু ব্রেসলেট বা চুড়, কুর্তিতে এক গাছা বালা, দুই পায়ে নয়, শুধু এক পায়েই নূপুর; হাতে ঢাউস আংটি-গয়না এখন জবরজং ঢং নয়, তৈরি করছে নিজস্ব স্টাইল স্টেটমেন্ট; এমনকি বিয়ের সাজের গয়নার রং নানা নিরীক্ষা পেরিয়ে পেয়েছে অভিনবত্ব। এড়িয়েছে বাহুল্য। 

 

 

 

 



সাতদিনের সেরা