kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

একযুগে দেশি দশ

ক্রেতাদের আরো কাছে দেশি পোশাক নিয়ে যেতে এবং দেশি পোশাকের বিস্তার ঘটাতে ১২ বছর আগে সম্মিলিত এক উদ্যোগ নিয়েছিল পোশাকের দশটি প্রতিষ্ঠান। এ মাসেই ১২ বছরে পদার্পণ করল তারা। দেশি দশের এই ১২ বছরের যাত্রার গল্প কেমন ছিল জানাচ্ছেন আতিফ আতাউর

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একযুগে দেশি দশ

নব্বই দশক থেকেই দেশি পোশাকের বিস্তার নিয়ে কাজ করছিলেন একঝাঁক তারুণ্যে ভরপুর ডিজাইনার। সবার চোখেই দেশি পোশাক নিয়ে বড় কিছুর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়েই যাঁর যাঁর একক চেষ্টায় এগিয়ে চলছিলেন তাঁরা। সেসময় দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের সমস্যা ও উত্তরণের নিয়মিতই আলোচনায় বসতেন উদ্যোক্তরা। আলোচনায় বিভিন্ন ভাবনা থেকে উঠে আসে একটি সম্ভাবনার কথা- একই স্থানে একই সঙ্গে ক্রেতাসাধারণকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রী দেওয়া সম্ভব হলে বিপনন প্রক্রিয়ার আরো বেশি প্রসার সম্ভব। একই ছাদের নিচে ক্রেতাদের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের পোশাক দেখার সুযোগ করে দিতে এরপর উদ্যোগ নেয় তারা। এই উদ্যোগের নাম—দেশি দশ। ২০০৮ সালে আলোচনা শুরু হলেও দেশীদশের জন্ম ২০০৯ সালে। এবছর ২০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে দেশীদশ। নিপুণ, প্রবর্তনা, কে ক্র্যাফট, অঞ্জন’স, রঙ বাংলাদেশ, বাংলার মেলা, সাদাকালো, বিবিয়ানা, দেশাল ও নগরদোলাকে নিয়ে শুরু হয় এর যাত্রা। পরবর্তীতে প্রবর্তনার পরিবর্তে সৃষ্টি এই উদ্যোগে যোগ দেয়। সেসময়ের দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর মধ্যে যাদের স্বকীয় ডিজাইন স্টুডিও, নিজস্ব উত্পাদন ও বিপনন ব্যবস্থাপনা ছিল তারাই এই উদ্যোগে যোগ দেয়। বিপননের এক নতুন ভাবনা নিয়ে হাজির হয় দেশীদশ।

দেশীয় পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশি সুতা ও দেশের প্রাণ প্রকৃতির মোটিফের পোশাকের প্রতি দেশের মানুষকে টেনে আনার জন্যই এমন প্রয়াস বলে জানালেন উদ্যোগটির অংশীদার অঞ্জন’স এর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার শাহিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘একই প্লাটফর্মে দেশের অন্যতম ১০টি ফ্যাশন হাউজ সেসময়ের জন্যে একটা নতুন ভাবনা ছিল। এই উদ্যোগের একজন হতে পেরে আমি-আমরা গর্বিত।’ তাঁর মতে, এতগুলো ফ্যাশন হাউস একই জায়গায় কাজ করা অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু প্রতিটি ব্র্যান্ডের পোশাকে ভিন্নতা থাকায় সব ঝুঁকি পেরিয়ে দেশী দশ এখনো স্বমহিমায় টিকে আছে। দেশী দশের বসুন্ধরার একটি আউটলেটের জায়গায় বর্তমানে শোরুমের সংখ্যাও বেড়েছে। বাংলাদেশে এখন দেশী দশের মোট আউটলেট তিনটি—বসুন্ধরা সিটি শপিং মল, সিলেট ও চট্টগ্রাম। যাত্রার একযুগ পূর্তি উপলক্ষে ক্রেতাদের পোশাক কেনাকাটায় ১২ শতাংশ ছাড় দিয়ে যুগপূর্তি উদযাপন করছে দেশী দশ। প্রতিষ্ঠানটির সব ফ্যাশন হাউসে কেনাকাটাতেই মিলবে এই ছাড়। এ ছাড়া পাওয়া যাবে একটি কুপন। পরবর্তী সময়ে এই কুপন দিয়ে কেনাকাটায় পাওয়া যাবে আরো ১২ শতাংশ ছাড়। যাত্রা শুরুর পর থেকেই প্রতিবছর নানা উদ্যোগ নিয়েছে দেশী দশ। বৈশাখ, শীত ও ঈদ উপলক্ষে প্রায় প্রতিবছরই ফ্যাশন শো আয়োজন করেছে তারা। এ ছাড়া ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলটির দেশীদশ শো রুম নতুন করে সাজায় তারা।  

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অংশীদার সাদাকালোর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার আজাদ রহমান বলেন, ‘গত ১০ বছরে বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্প প্রসারে দেশী দশ নতুন ধারার সূচনা করেছে বলেই মনে করি। দেশি পোশাকের বিস্তার ও ক্রেতাপ্রিয়তা বাড়ানোর যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, তা অনেকটাই সফল। একই ছাদের নিচে দেশের জনপ্রিয় ১০টি ফ্যাশন হাউজের পণ্য কেনার অভাবনীয় সুযোগ এনে দিচ্ছে দেশীদশ। দেশীয় পোশাক বিপনন , বিস্তার ও জনপ্রিয়তা তৈরীতে বিশাল প্রভাব রেখেছে এই প্রতিষ্ঠান। যেকোন ধর্মীয় , জাতীয় ও সামাজিক উত্সবে ক্রেতাসাধারণের কেনার ভাবনায় পছন্দের তালিকার শীর্ষে এখন দেশীদশ।’

তবে দেশীদশের মতো এমন প্রতিষ্ঠান আরো বেশি প্রভাব সৃষ্টি করতে পারতো বলে মনে করেন সৌমিক দাস। দেশি দশের সাফল্য এবং ব্যর্থতাগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একই প্লাটফর্মে এরকম সমন্বিত বিক্রয় প্রক্রিয়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন ধারণা হিসেবে দ্রুত সাফল্য লাভ করে এবং একই অনুপ্রেরণায় আরো কিছু উদ্যোগ গঠিত হয় পরবর্তীতে। তবে ১২ বছরের প্রাক্কালে বিচার করতে গেলে যতটুকু যুগোপযোগী হওয়া উচিত ছিল এই  উদ্যোগ ততটুকু হয়নি নানান ধরণের প্রতিবন্ধতার কারণে।’

জন্মলগ্ন হতে দেশীদশ দেশীয় বাজারে বিপুল সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে, কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে দেশের বাইরে থেকে পোশাক আমদানী, ভ্যাট, ট্যাক্সসহ বিভিন্ন প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে দেশীদশ অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। গত একযুগে দেশীদশ অনুকূল  হতে চরম প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে বলে জানালেন আজাদ রহমান। তিনি বলেন, দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোতে দেশের প্রান্তিক বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান জড়িত রয়েছে, কিন্তু সে বিবেচনায় সরকারী অনুকূল ব্যবস্থাপনার চরম অবহেলা রয়েছে এই সেক্টরের প্রতি। বিদেশী পণ্যের অবাধ আমদানী, ভ্যাট, ট্যাক্স, ভাড়ার চরম উর্ধ্বগতি, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, প্রতিকূল ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ নানান কারণ প্রতিনিয়ত দেশীদশকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। পরবর্তীতে করোনা পরিস্থিতি বিপর্যস্ত অবস্থায় নিয়ে গেছে।  

বেশ কিছুদিন ধরে ধীরে ধীরে বিরূপ হয়ে উঠা ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে দেশীয় ফ্যাশন শিল্প খারাপ অবস্থানে চলে গিয়েছিল। এরপর করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ২ বছরে পুরোপুরিই মুখ থুবড়ে পরার অবস্থায় পতিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশীদশও এই পরিস্থিতির বাইরে নয়। সেকারণে এই সময়ের বিবেচনায় বিপনন মাধ্যমে নতুন নতুন ভাবনা ও পরিকল্পনার উদ্যোগ নিয়েছে দেশীদশ। যার মধ্যে রয়েছে অনলাইন মাধ্যমের উন্নয়নের বেশ কিছু পরিকল্পনা। এখন করোনা পরবর্তী সময়ের বিবেচনায় ফিজিক্যাল শাখা বাড়ানোর চেয়ে অনলাইন বিপনন পদ্ধতির উন্নয়নের কাজে বেশি মনোযোগ দিয়েছে দেশীদশ। তবে পরবর্তী অনুকুল পরিবেশে আরো শাখা বাড়ানোর ইচ্ছে রয়েছে বলে জানালেন এর উদ্যোক্তারা।



সাতদিনের সেরা