kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

একা মা একা বাবা

এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরুর পর স্বপ্ন ভঙ্গ হয় অনেকেরই। কেউ নতুন করে জীবন শুরু করলেও অনেকে রয়ে যান একা বা সন্তানের সঙ্গে। সন্তানের সঙ্গে একা ভালো থাকার উপায় বললেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের কাছে শুনে লিখেলেন আতিফ আতাউর

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



একা মা একা বাবা

মডেল : বিনা ও মিফতা সাজ : শোভন মেকওভার; ছবি : কাকলী প্রধান

বারো বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেন নাফিজা ইসলাম ও সিফাত আহমেদ। বিয়ের পর বছর কয়েক ভালোই ছিলেন। ব্যাংক কর্মকর্তা সিফাতের জগত ছিল অফিস, বাসা আর স্ত্রী। তিন বছর পর ঘর আলো করে আসে তাঁদের প্রথম সন্তান আলভিনা। সংসার যেন সুখের সমুদ্র। আলভিনার বয়স চারে পড়তেই পরিবর্তন সিফাতের মধ্যে। রাত করে বাসায় ফেরা, স্ত্রীর সঙ্গে মিথ্যা বলা, সন্তানের প্রতি অমনোযোগ। সিফাতের সঙ্গে অন্য মেয়ের সম্পর্কের কথা জানতে পারেন নাফিজা। এরপর জল গড়ায় বেশ। পাঁচ বছর ধরে এখন মেয়েকে নিয়ে একাই থাকেন নাফিজা। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করেন। শুরুতে মেয়ে কার কাছে থাকবে এ নিয়েও ঝামেলায় ছিলেন নাফিজা। শেষ পর্যন্ত আদালতের দারস্থ হয়েছিলেন তিনি।

নাফিজার মতো একা থাকার গল্প শুধু মেয়েদেরই নয়, আছে অনেক পুরুষেরও। বিয়ের পর বিচ্ছেদ, সন্তানের ভরণপোষণ ও বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা নিয়ে ঝামেলাও দেখা দেয়। এগুলোরও আছে আইনী প্রতিকার। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা জানান, মুসলিম আইন অনুযায়ী, বাবা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আইনগত অভিভাবক আর মা সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক। মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও মা সন্তানের দেখাশোনা করতে পারবেন। ছেলের ক্ষেত্রে সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তানের বয়ঃসন্ধি বয়স পর্যন্ত মা সন্তানদের নিজের কাছে রাখতে পারবেন। তবে বিচ্ছেদের পর সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও বাবাকেই সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিতে হবে।

সন্তানের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানোর পাশাপাশি দরকার নিজের জন্যও কিছুটা সময়

আলভিনা এখন বাবা ও মা দুজনের কাছেই থাকে, ভাগ করে। মাঝেমধ্যে বাবা এসে নিয়ে যায় ওকে। বাবার কাছে কিছুদিন থেকে পুনরায় মায়ের কাছে চলে আসে সে। এ নিয়ে অবশ্য অভিযোগ নেই নাফিজার। বললেন, ‘আমি সন্তানকে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করতে চাই না। ও যখনই বাবার কাছে যেতে চায় বা ওর বাবা নিতে আসে আমি যেতে দেই।’ পুনরায় বিয়ে করা নিয়ে পরিবার থেকে চাপ আছে নাফিজার ওপর। কিন্তু এ নিয়ে আর ভাবতে রাজি নন নাফিজা। বাকি জীবন মেয়ে আর নিজেকে নিয়েই কাটাতে চান।

তবে মাহমুদুল হাসানের গল্পটা আবার ভিন্ন রকম। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তিনিও। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায় স্ত্রী। প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে দুচোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেন। দাদী আর নানীর ভালোবাসায় ধীরে ধীরে বড় হয় তার সন্তান। এখন বয়স সাত বছর। নিজের কাছেই এনে রাখছেন। সকালে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিসে চলে যান। স্কুল থেকে নিয়েও আসেন। প্রতিবেশীরাও খুব সার্পোট করেন তাকে। বাবা-মা চাপ দিলেও দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে চিন্তা করছেন না। সন্তানই এখন তাঁর দুনিয়া।

মডেল : নির্ভয় ও ইকবাল

একা বাবা-মায়ের জীবনটা হয়তো অন্যদের মতো নয়। তবে এমন জীবন নিয়েও ভালো থাকা যায়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বললেন, ‘একা থাকার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে আগে থেকেই কিছুটা প্রস্তুতি থাকা উচিত। কারণ পথটা একটু ভিন্ন। কিছু চ্যালেঞ্জও থাকে। সমাজের সবাই কারো একা জীবন সহজভাবে নেয় না। কারণ তারা এমন জীবনে অভ্যস্ত নয়। অনেক সময় নেতিবাচক কথা, ভিন্নপথে নিয়ে যেতে প্ররোচনা, সিদ্ধান্ত বদলে প্রভাব ফেলাসহ নানা সমালোচনাও করতে পারে। এমন সময় নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থাকা হবে। মনে রাখতে হবে নিজের কিংবা সন্তানের ভালোর জন্যই একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অতএব লোকের কথায় কান দিলে চলবে না। তাই মানসিকভাবে পূর্ব প্রস্তুতি রাখুন। প্রস্তুতি থাকলে সেটা তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না আপনার উপর। নিতে পারবে না ভিন্নপথেও।’
একা থাকলে অনেক কিছুর সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে বাঁচতে হয়। এজন্য উপেক্ষা করতে শিখুন। সবার কথা মেনে চলা যাবে না। যারা সমালোচনা করে তাদের এড়িয়ে চলাই এই সময় বুদ্ধিমানের কাজ। পাশাপাশি পরিবার, বাবা-মা, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যারা সাপোর্টিভ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিন। একা জীবনে নেতিবাচক মানুষের কথাবার্তা, আচার আচরণের প্রভাব ভুলতে যারা আপনাকে সমর্থন দিচ্ছে, আপনাকে বুঝতে পারছে, আপনার খেয়াল রাখছে তাদের কাছাকাছি থাকুন। ভালো বন্ধু ও সঙ্গী খুঁজে নিন। পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে মেলামেশা বাড়িয়ে দিন। যারা নেতিবাচক তাদের এড়িয়ে চলুন। সহায়কদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিন। এতে একা চলার পথের শক্তি, সমর্থন ও প্রেরণা দুটোই পাবেন।

সন্তানকে আগে থেকেই আপনার জীবন সম্পর্কে ধারণা দিন। তবে বাবা কিংবা মায়ের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এটা তাকে মানসিকভাবে হীনমন্য করে ফেলে। কী কারণে আপনারা আলাদা হয়ে গেছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই। সন্তানকে আলাদা থাকার বিষয়ে বুঝিয়ে বলুন। যাতে সন্তান স্কুলে বা বাইরে গিয়ে টিচার অথবা অন্য কারো কাছে নেতিবাচক কিছু শুনলে মায়ের কাছে বা বাবার কাছে শেয়ার করে। মনের মধ্যে চেপে রাখলে সন্তানের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। ঝুঁকি তৈরি হয়। এজন্য সন্তানের সঙ্গে বাবা কিংবা মায়ের খোলা সম্পর্ক থাকা ভালো।   
অনেক বাবা হয়তো মনে করেন মায়েদের মতো করে সন্তানের দেখাশোনা তারা করতে পারেন না কিংবা পারবেন না। আদতে কিন্তু বিষয়টা তেমন নয়। মেখলা সরকার বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বাবারাও মায়েদের মতো করে সন্তানের দেখাশোনা করতে পারেন। তারা ছোট থেকে সন্তান দেখাশোনার দায়িত্বটা নেন না বলে মনে করেন পারবেন না। কিন্তু এসব কিছু করার মেধা ও যোগ্যতা সবই বাবাদের আছে। সন্তান লালনপালন এমন কোনো বিশেষ দক্ষতা নয় যে এটা শুধু নারীরা পারবে, পুরুষ পারবে না। পুরুষের মধ্যেও মায়া, মমতা, দায়িত্বশীলতার মতো গুণ আছে। মায়েরা সন্তানকে বেশি সময় দেন, আর বাবারা কম বলে, আমাদের চোখে এই বিষয়টা কম ধরা পড়ে। কিন্তু একজন বাবা যখন সন্তানকে নিয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নেবেন তখন তাঁকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে যে তিনি পারবেন। প্রথম দিকে হয়তো কিছুটা সমস্যা হয়, তবে পরে ধীরে ধীরে সব কিছুতেই বাবা অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।’
মা কিংবা বাবা যিনিই হোন একা থাকলে সন্তানকে নিয়ে কিছু সমস্যা পোহাতেই হয়। এজন্য কিছু সাপোর্টিভ মানুষের সহযোগিতা নিন। বিশেষ করে আপনি যখন অফিসে বা বাইরে থাকবেন তখন ডে কেয়ার সেন্টারের সহযোগিতা নিতে পারেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। যাতে তারাও আপনাকে বিপদ আপদে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে পারেন। বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জিং, যতটা সহজ মনে হয় ততটা সহজ নয়। তারপরও এমন জীবনে মানুষের সঙ্গে যত সুসম্পর্ক গড়তে পারবেন তত বেশি সুবিধা পাবেন।  
তবে শুধু যে সন্তানকে নিয়েই সময় কাটাবেন বিষয়টা কিন্তু তা নয়। নিজের প্রতিও মনোযোগী হোন। নিজের ভালোলাগার কাজগুলো করুন। নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্নের যত্ন নিন। নিজের ভালো থাকার জন্য বন্ধু সংখ্যা বাড়ানোও জরুরি।
 

 



সাতদিনের সেরা