kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পোশাকে ছবির গল্প

পোশাকের নকশায় থিম হিসেবে ডিজাইনারদের কাছে চিত্রকলা এমনিতেই প্রিয়। এখন তাতে শুধু টুকরো মোটিফ নয়, ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে পুরো দৃশ্যপট। হাতে আঁকা ছবির পাশাপাশি পোশাকে করা হচ্ছে প্রিন্টও। ডিজাইনারদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আতিফ আতাউর

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পোশাকে ছবির গল্প

মডেল : নুজহাত শাড়ি : ঈহা

শাড়িতে ফুটে উঠেছে গ্রাম্য মেলার চিত্র—নাগরদোলা, শিশুদের হৈ-হুল্লোড়, ভিড়বাট্টা, মিষ্টি-মণ্ডা-মিঠাইয়ের দোকান, পুতুলনাচের ছাউনি দেওয়া ঘরসহ যাকে ঘিরে এই মেলা সেই বিশাল বটগাছও। বাদ যায়নি পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীও। এমন নান্দনিক চিত্রের ছবি এখন স্থান পাচ্ছে পোশাকে। পছন্দের মোটিফ আর বাহারি ছবি থাকায় ফ্যাশনে ভিন্নতা আনতে ক্রেতারাও বেছে নিচ্ছে ছবিযুক্ত এমন পোশাক।

ক্যানভাসজুড়ে থাকছে যা

দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোর যাত্রা শুরুর সময় থেকেই কমবেশি ছবিযুক্ত পোশাক ডিজাইন করেন ডিজাইনাররা। শুরুতে শহীদ মিনার, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, কবি-সাহিত্যিকদের ছবি তুলে ধরেন পোশাকে। এরপর দেশ-বিদেশের জনপ্রিয় নেতা, গায়ক, নায়কদের ছবিও স্থান পায় তরুণ-তরুণীদের পোশাকে। মূলত হাতে এঁকে পোশাকে এমন ছবি তুলে ধরেন ডিজাইনাররা। এরপর ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রযুক্তি চলে আসায় এখন সরাসরি ছবি বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে পোশাকের ক্যানভাসজুড়ে। ডিজাইনাররা যেমন পোশাকের ওপর হাতে এঁকে সাতলা বিল, নগরজীবন, বৈশাখী মেলা, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, সেন্ট মার্টিন, শরতের আকাশ, গায়ের মেয়ে, ফুলকুড়ানি, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, লালবাগ কেল্লা, পাহাড়পুরের মতো ঐতিহাসিক জায়গা, নানা পটচিত্র, ফুল, পাখি, প্রজাপ্রতির স্থান দিচ্ছেন তেমনি ক্যামেরায় তোলা ছবি সরাসরি প্রিন্ট করেও বসিয়ে দিচ্ছেন পোশাকে। প্রিন্ট করা ছবির পোশাকে স্থান পেয়েছে সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, কটকা, মহেশখালী, খাগড়াছড়ি, পদ্মা নদী, হাকালুকি হাওর, সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা, বগা লেক, সাজেকসহ প্রাণ ও প্রকৃতিতে ভরপুর পর্যটন স্থানগুলো। শুধু হাতে আঁকা কিংবা প্রিন্টেড ছবিই নয়, ছেলে-মেয়েদের পোশাকে পুঁতি, জরি, বাহারি লেস ও অভিনব কাটিং যোগ করেও বৈচিত্র্য এনেছেন ডিজাইনাররা।

ফেব্রিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মসলিন, সিল্ক, অ্যান্ডি, সুতি, কটন, পলিয়েস্টার ও হাফ সিল্ক। একটু আলাদা রুচির তরুণ-তরুণীরাই এমন পোশাকের ক্রেতা। যারা কোথাও ঘুরতে গিয়ে ছবি তোলার জন্য সেই জায়গা ও পরিবেশ উপযোগী পোশাক পরতে পছন্দ করে। কেউ যদি কক্সবাজার ঘুরতে যায় তবে সে চাইলে কক্সবাজারের ছবি আঁকা শাড়ি বা টি-শার্ট বেছে নিতে পারবে। 

ডিজাইনাররা যা বললেন

ফ্যাশন হাউস নিত্য উপহারের স্বত্বাধিকারী বাহার রহমান বলেন, ‘আমরা শুরুতে টি-শার্টে পতাকা নিয়ে কাজ করে জনপ্রিয়তা পাই। এরপর দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা ছবি পোশাকে যোগ করেছি। সর্বশেষ প্রয়াস দেশের প্রাণ-প্রকৃতি পোশাকে তুলে ধরা। দেশের জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোর ছবি পোশাকে তুলে ধরেছি।’

ফ্যাশন হাউস তৃথুপীর ডিজাইনার আয়েশা আহমেদ বলেন, ‘ফ্যাশনে পটচিত্রের ব্যবহার দেশীয় ফ্যাশন শুরুর সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। ডিজাইনাররাও পোশাকে পটচিত্র নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। কিন্তু এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে পোশাকে পটচিত্রের ব্যবহার তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। আমি এটাকেই আবার নতুন করে তুলে ধরতে চাচ্ছি। এ জন্য আমরা পোশাকে মধুবাণী আর্ট, বিভিন্ন মানুষের ছবি পোর্ট্রেট করছি। গাউন, থ্রিপিস, কুর্তিতে এমন ছবি তুলে ধরছি। ক্রেতারাও পছন্দ করছে।’

ফ্যাশন হাউস গুটিপোকার স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার আফসানা সুমী বলেন, ‘আমরা প্রকৃতিকেন্দ্রিক কাজ করি। তাই সব কিছুর মাঝেই যোগ থাকে ফুল, পাখি, পাতা, আকাশ কিংবা নদী। নিজের দেশকে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টাও এটা। সিলেট, নাফাখুম, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন বা বরিশালের সাতলা বিলকে তুলে ধরেছি পোশাকে। প্রিয় কোনো ব্যক্তিত্ব যেমন ফ্রিদা বা ভ্যান গঘকে শাড়ির আঁচলে নিয়ে এলে সেখানেও আমরা প্রকৃতির সংযোজন রাখি।’

ঈহা’র ডিজাইনার মৌরী নাজনীন বলেন, ‘পোশাকে ফুল, পাখি, প্রজাপতি তো আঁকা হয়ই। এর পাশাপাশি আমাদের দেশীয় কৃষ্টি কিংবা ঐতিহ্যগত কিছু দৃশ্য নিয়ে কাজ করি। মানুষ নতুনত্ব চায়। আর এখন উৎসব ঘিরে পোশাক পরার চল চলে এসেছে। আমাদের কাজগুলোও তাই বিভিন্ন উৎসব ঘিরে হয়। যেমন বৈশাখে করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বটমূলের গ্রামীণ মেলা, সাক্রাইন উৎসব ঘিরে ঘুড়ি, শরতে শিউলি মেয়ে, শীতকালে সরিষা ক্ষেত। এসবের পাশাপাশি ঢাকার দৈনন্দিন দৃশ্যপট যেমন শাড়িতে এসেছে,  তেমনি এসেছে গ্রামের কোনো অনাড়ম্বর নারীর পদ্ম ফুল তোলার চিত্র।

শাড়ির আঁচলটা আসলে একটা ক্যানভাস। আমরা একসময় শুধু হ্যান্ড পেইন্টেড শাড়িই করতাম। স্বভাবতই দামের রেঞ্জটা বেশি ছিল। চাহিদা থাকলেও সব সময় করতে পারতেন না। গত কয়েক বছর আমরা নিজস্ব পেইন্টিং স্ক্রিনে নিয়ে আসছি। ফলে আমাদের পণ্যগুলো এখন ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে (দাম ২২০০-১৯০০০ পর্যন্ত)। দামটা নির্ভর করে ডিজাইনের মাধ্যম, কাপড়ের ধরন, সর্বোপরি ডিজাইনের ওপর।’

ছবিওয়ালা পোশাকের যত্ন

ছবিযুক্ত পোশাক পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ খানিকটা আলাদা বলে জানালেন ডিজাইনাররা। এ জন্য অন্য সব কাপড়ের সঙ্গে এগুলো না ধোয়াই ভালো। বিশেষ করে ছবিওয়ালা পোশাক ওয়াশিং মেশিনে পরিষ্কার করা যাবে না। গরম পানি ব্যবহার করবেন না। ঠাণ্ডা পানিতে ডিটারজেন্ট অথবা সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে কম রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। কাপড় শুকিয়ে গেলে রোদ থেকে তুলে নিতে হবে।  

 

কোথায় পাবেন কেমন দাম

নিত্য উপহার, তৃথুপী, ঈহা, শরদিন্দু, পটের বিবিসহ বেশ কিছু ফ্যাশন হাউসে পাওয়া যাবে ছবির পোশাক। চাইলে অর্ডার করে বানিয়েও নিতে পারবেন নিজের পছন্দের ছবি বা চিত্র ব্যবহার করে। আফসানা সুমী বলেন, ‘অনেক সময় ক্রেতাই তার পছন্দ জানায়, আমরা সে অনুযায়ী এঁকে দিই। কৃষ্ণকে যশোদা মায়ের ভাত খাওয়ানোর দৃশ্য আঁকা শাড়ি এঁকেছিলাম এক প্রবাসী ক্রেতার জন্য। তিনি তাঁর সন্তানের অন্নপ্রাশনের জন্য আমাদের কাছ থেকে নিয়েছিলেন। তিনিই থিম দিয়েছিলেন।’ এ ছাড়া বাজার থেকে টি-শার্ট কিনে পছন্দের ছবি পোশাকে প্রিন্ট করে নিতে পারবেন শাহবাগ, মালিবাগ, মিরপুর, উত্তরাসহ ঢাকা শহরের প্রিন্টিং দোকান থেকে। খরচ পড়বে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। আর ফ্যাশন হাউস থেকে কিনতে পারবেন ৫৫০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে।

মন্তব্য