kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ আষাঢ় ১৪২৭। ৩ জুলাই ২০২০। ১১ জিলকদ  ১৪৪১

করোনায় পজেটিভ

করোনায় বন্দিজীবনের কল্যাণে আবারও ফিরে এসেছে ঘুড়ি উড়ানো, বাড়ির সবাই মিলে খাওয়া, টিভি দেখা, গল্প করার মতো পুরনো সব অভ্যাস। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মেখলা সরকারের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন নাবীল আল জাহান

১ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনায় পজেটিভ

করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সবাই ঘরে বন্দি। এখন অবশ্য প্রযুক্তির কল্যাণে বাসায় থেকেই অনেক কিছু করা যায়। কিন্তু সারা দিন মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির পর্দায় চোখ বেঁধে রাখা কি সম্ভব! ফলে যত দিন যাচ্ছে, তত বেশি করে পুরনো দিনের নানা অভ্যাসের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। যখন প্রযুক্তির আশীর্বাদ বা অভিশাপ কোনোটিই ছিল না, মানুষকে এর সাহায্য ছাড়াই নিজেদের বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হতো।

বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটা আরো বেশি করে প্রযোজ্য। এখন ওদের বিনোদন পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। কিন্তু লকডাউন ওদের এই নির্ভরতা থেকে বের হতে বাধ্য করেছে। কত দিন ধরে আর সারাক্ষণ মোবাইলে-ল্যাপটপে বুঁদ হয়ে থাকা যায়! তাই ওদেরও ফিরে যেতে হচ্ছে পুরনো দিনে। বেছে নিতে হচ্ছে আগেকার দিনের নানা বিনোদন। সময় কাটাচ্ছে পরিবারের সঙ্গে। সেই সঙ্গে ফিরে এসেছে পুরনো দিনের অনেক খেলাও।

সেসবের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছে ঘুড়ি। একসময় দেশের শিশুদের মধ্যে এটা খুবই জনপ্রিয় ছিল। বাসায় শিশু আছে, অথচ শীতে নতুন ঘুড়ি আসেনি, এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া ছিল অসম্ভব। ইদানীং এসব পুরনো দিনের স্মৃতিকথায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সেটা উল্টে দিয়েছে করোনাভাইরাস। এখন অবশ্য শীত নয়, গ্রীষ্ম। তবু শহরগুলোর ছাদে ছাদে উড়ছে ঘুড়ি। পুরনো দিনের মতো চলছে কাটাকাটির খেলা। সে জন্য সুতায় দেওয়া হচ্ছে নানা পদের ‘মাঞ্জা’।

যারা ঘুড়ি উড়াতে পারে না, তারাও বাদ নেই এই আনন্দ থেকে। তারা এই খেলা দেখে যেমন আনন্দ পাচ্ছে, তেমনি আছে ‘ভোঁকাট্টা’ হওয়া ঘুড়ি জোগাড় করা। এখন অবশ্য পথে-মাঠে ঘুরে ঘুরে ঘুড়ি কুড়ানোর সুযোগ নেই। তবে এক ছাদের ভোঁকাট্টা হওয়া ঘুড়ির সুতা আটকে যাচ্ছে আরেক ছাদে। সেই ‘সূত্র’ ধরেই চলছে ঘুড়ি কুড়ানো। ভার্চুয়াল খেলাধুলায় শারীরিক তো বটেই, এমনকি মানসিক দক্ষতারও ততটা বিকাশ হয় না, যতটা হয় মাঠের খেলায়। শুধু তা-ই না, শিশু যত বেশি সময় ধরে ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করে, তত তার মধ্যে একগুঁয়েমির ভাব দেখা যায়। চিন্তা-ভাবনা অনেক বেশি এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। বিপরীতে প্রকৃতির সান্নিধ্য তাদের ভাবনায় আনে বৈচিত্র্য। তেমনটাই হয় ঘুড়ি উড়ানোর সময়। কারণ তখন তাকে একই সঙ্গে আকাশের অবস্থা, বাতাসের গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি পরিমাপ করতে হয়। উড়তে থাকা ঘুড়ির পাশাপাশি নজর রাখতে হয় নিজের চারপাশেও। ফলে একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতে হয়। সব মিলিয়ে ঘুড়ি উড়ানো শিশুর মানসিক বিকাশে রাখে ইতিবাচক ভূমিকা।

তবে ঘুড়ি উড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু ব্যাপারে সাবধান থাকা দরকার। আগে প্রায়ই ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত। আবার বাচ্চারা সাধারণত একসঙ্গে খেলতে ভালোবাসে। আগে ঘুড়ি উড়ানোর ক্ষেত্রেও হতো সেটাই। অনেকে জড়ো হয়ে একসঙ্গে উড়াত। এটা এখন করা যাবে না। আলাদা আলাদা ছাদ থেকে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে উড়াতে হবে। মোট কথা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ঘুড়ি ওড়াতে হবে। নইলে সংক্রমণের শঙ্কা থেকেই যাবে। এসব নিশ্চিত করতে বড় কাউকে ঘুড়ি উড়ানোর ব্যাপারে রাখতে হবে নজর।

কেবল ঘুড়ি ওড়ানোই নয়, আগে বাড়িতে বসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আরো নানা খেলার চল ছিল। তার মধ্যে দাবা, লুডু থেকে শুরু করে গানের কলি, নাম-দেশ-ফুল-ফল বা চোর-পুলিশের মতো স্মৃতি-নির্ভর নানা খেলা ছিল জনপ্রিয়। এই সুযোগে সেগুলোর চর্চাও কম-বেশি শুরু হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবেই শিশুদের ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ কমছে।

কেবল খেলাধুলাই নয়, অন্য সব ব্যাপারেও পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সঙ্গে সময় কাটানো বাড়ছে। একসঙ্গে তিন বেলা খাওয়া-দাওয়া করা, টিভিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা ছবি দেখা, কিংবা গল্প করা—ব্যস্ত জীবনের বহু আরাধ্য এসব কাজ করা যাচ্ছে দিনের পর দিন।

তাতে সবচেয়ে বেশি লাভ হচ্ছে বাড়ির শিশুদের। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওরা যত বেশি সময় কাটাতে পারে, তত বেশি নিরাপত্তা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার বোধ তৈরি হয়। সবার সঙ্গে গড়ে ওঠে সহজ সম্পর্ক। বিশেষ করে খাওয়ার সময়ে নানা বিষয়ে পরিবারের সবার মধ্যে কথা হয়। সেই আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সবার সম্পর্কটা নিত্যদিন ঝালাই হতে থাকে।

অনেক দিন ধরেই শিশুদের সঙ্গে পরিবারের দূরত্ব তৈরি হওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আধুনিক যুগের অন্যতম অভিশাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এটিকে। সেজন্য কাউকে দোষও দেয়া যায় না। আধুনিক যুগের বাস্তবতাই এমন যে সবাই মিলে সময় কাটানোর ফুরসত মেলে না। ছোট-বড় সবার জীবনেই দারম্নণ ব্যস্ততা। করোনার অবকাশে মিলছে সেই মহামূল্য ফুরসত। তাই সব বাসাতেই চলছে তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার। নিত্যদিনের পারিবারিক অভ্যাসে আসছে পরিবর্তন। অন্তত এই পরিবর্তনগুলো ভীষণই ইতিবাচক।

মন্তব্য