kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

অন্য কোনোখানে

প্রবালদ্বীপে

ইশতিয়াক হাসান

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রবালদ্বীপে

টেকনাফ ঘাট ছাড়তেই পিছু নিল গাঙচিলের দল। গাঙচিলদের বেশ কিছুটা সময় দিয়ে ডানে তাকাতেই উঁচু পাহাড়ের সারি চোখে পড়ল। এগুলো পড়েছে মিয়ানমারে। এখনো আমরা নাফ নদের সীমানায়। একপাশে বাংলাদেশ, আরেক পাশে মিয়ানমার। দূূরে সেন্ট মার্টিনসগামী অন্য কয়েকটি জাহাজও চোখে পড়ছে। পানি শান্ত।

নারকেল জিনজিরা অর্থাত্ সেন্ট মার্টিনস যাওয়ার পথের বারো আনাই নাফ নদ। বাকি চার আনা বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে। একসময় নাফের মোহনা পেরিয়ে বঙ্গোপসাগের পড়লাম। চাচাতো বোনজামাই মহিউদ্দীন ছাড়া বাকিদের সবার এটাই প্রথম সাগর দর্শন না হলেও সাগর ভ্রমণ। ভেবেছিলাম জাহাজ এখন দুলবে। না, সেই শান্ত চেহারা। পাশের এক যাত্রী জানাল বর্ষার সময় এলে বুঝতেন, ১০ ফুট উঁচু এক-একটি ঢেউ মাথার ওপর তুলে ফেলে নৌকা, তখন জাহাজ যায় না। এর মধ্যে দেখা ব্রিটিশ নাগরিক জ্যাকের সঙ্গে। টাকা জমিয়ে নানা দেশে ঘুরে বেড়ায়। সেন্টমার্টিনসের পর যাবে সুন্দরবনে। সিলেট ঘুরে এসেছে আগেই। হঠাত্ একটা উল্লাসধ্বনি কানে এলো। তাকিয়ে দেখি দূরে দেখা যাচ্ছে স্বপ্নদ্বীপ সেন্ট মার্টিনস। যত কাছে আসতে লাগল তত বেশি করে যেন রূপের ডালি মেলে দিচ্ছে প্রবালদ্বীপটি। বেশ কয়েকটি জাহাজ জেটিতে ভিড়েছে। হৈ-হট্টগোল করতে করতে জাহাজ থেকে নামলাম। জেটি পেরিয়ে বাজার, সেখানে কাঠের তৈরি ছোট ছোট ভ্যান দাঁড়িয়ে। পাঁচটি ভ্যান নিয়ে নীল দিগন্তে রিসোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

রিসোর্টটি অনেক বড়। আমরা নিয়েছি কটেজের পাঁচটি কামরা। পেছনের গেট দিয়ে বেরোলেই সি বিচ। সেখানে নামার পর আমার পাঁচ বছরের মেয়ে ওয়াফিকা ও রিদওয়ানের ছয় বছরের মেয়ে ফাইজাকে সামলানো দায় হয়ে পড়ল। সেন্টমার্টিনসের সৈকতে দাঁড়িয়ে খুশি হয়ে উঠল মনটা। শান্ত, কোলাহলহীন একটি বিচ। প্রবাল দেখলাম প্রথমবারের মতো। দিনের বাকি অংশটি কাটালাম তীর ধরে হাঁটাহাঁটি করে। পুনম, নাজিফা ভাড়া নিয়ে সাইকেল চালাতে লাগল সৈকতে। খাওয়াদাওয়া সারলাম রিসোর্টেই। সন্ধ্যার আগে সূর্যটা যখন ডুব দিল সাগরে, কমলা আভা ছড়িয়ে পড়ল দিগন্তে।

পরের দিন সকালে ছেঁড়াদ্বীপ। আমরা একটা শর্টকাট ধরে এগোলাম জেটির দিকে। গোটা সেন্ট মার্টিনস ভ্রমণে এই ছোট্ট যাত্রাটি আমার কাছে অন্যতম আনন্দদায়ক ভ্রমণ হয়ে আছে। মেঠোপথ দিয়ে, খেতখামার কেটে এগিয়ে চললাম আমরা। একসময় চলে এলাম সুন্দর একটা জায়গায়। খোলা প্রান্তরের মাঝখানে একটা উঁচু পাকা জায়গা। এটা হেলিপ্যাড। এখান থেকে এঁকেবেঁকে চলে গেছে অদ্ভুত সুন্দর একটা সরু আঁকাবাঁকা পথ। একসময় উঠে এলাম বিচে। অপূর্ব। বিচে পৌঁছার আগে গাছগাছালিময় জায়গাটা সুন্দর, তার চেয়েও সুন্দর এই সৈকত। অনেক দূর পর্যন্ত বালুর রাজত্ব। জেটি পর্যন্ত তীরে বাঁধা সার সার জেলে নৌকা। জেটিতে গিয়ে একটি স্পিডবোট রিজার্ভ করলাম। স্পিডবোট আতঙ্ক আছে আমাদের অনেকেরই, তবে এটা ১৮ জনের বড় স্পিডবোট। ঝাঁকুনি লাগে কম। ১০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। সাগরে এত স্বচ্ছ পানি দেখিনি আর, ১৫-২০ হাত নিচের প্রবালগুলোও মনে হচ্ছিল হাত দিয়ে ছোঁয়া যাবে। ধারালো প্রবালে স্পিডবোটের ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় তীর পর্যন্ত যেতে হলো নৌকায়। নানা ধরনের গাছগাছালি, কোথাও বালুর মাঝে জমে তৈরি হওয়া ছোট লবণাক্ত পানির লেক, চারদিকে খোলা সাগর সব মিলিয়ে ছেঁড়াদ্বীপ অসাধারণ।  ছেঁড়াদ্বীপে আমাদের সময় এক ঘণ্টা, তার পরই ফিরতি যাত্রা। সেন্টমার্টিনসে ছিলাম দুই রাত। এর মধ্যে ঘটেছে নানা কাণ্ড। যেমন—রিদওয়ানের বোন হারাল। রিদওয়ানের সন্দেহ ওকে পাচারকারীরা নিয়ে গেছে। এদিকে আমার দুই চাচি এ ঘটনায় অজ্ঞান হয়। শেষ পর্যন্ত ওকে পাওয়া গেল রিসোর্টের ভেতরই। পরের দিন স্থানীয়দের কাছে তথ্য পেলাম মিনিট দশেক হাঁটলেই এমন একটা জায়গা মিলবে, যার দুই পাশেই সমুদ্র। ঘণ্টা দেড়েক হেঁটে দেখলাম সামনে ছেঁড়াদ্বীপ। ছেঁড়াদ্বীপে ভাটার সময় হেঁটেও যাওয়া যায়। এই পথটাও ছিল ভারি সুন্দর। পথে এক হাসিখুশি মহিলা বেশ কম দামে (এখানকার হিসাবে) তরমুজ খাওয়ান। রিসোর্টে আসার আগের দিন রাতে বারবিকিউ পার্টিটাও হয়েছিল জমজমাট।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে দুইভাবে সেন্ট মার্টিনস যাওয়া যায়। কক্সবাজার অথবা টেকনাফ যাবেন বাসে। শ্যামলী, সেন্ট মার্টিনস, গ্রিনলাইনসহ আরো অনেক পরিবহনের সরাসরি টেকনাফের বাস আছে। ভাড়া নন-এসি ৯০০ টাকা। এসি ১২০০ থেকে শুরু। টেকনাফ থেকে জাহাজে সেন্ট মার্টিনস। কেয়ারি সিন্দবাদ, কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন, কুতুবদিয়াসহ বেশ কয়েকটি জাহাজ আছে। ভাড়া আসা-যাওয়া ৮০০ থেকে শুরু। আর কক্সবাজার থেকে কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে সরাসরি সেন্ট মার্টিনস যেতে পারবেন। সেন্ট মার্টিনসে বেশ কিছু হোটেল-রিসোর্ট আছে। চাইলে একটু দূরের সাগরঘেঁষা কোনো রিসোর্টে উঠতে পারেন। সেন্ট মার্টিনসে ব্যবসাটা হয় মূলত চার মাস, দাম তাই অনেক চড়া।

এম ভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস

দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫৫ মিটার এবং ১১ মিটার প্রশস্ত এই নৌযানে মেইন প্রপালেশন ইঞ্জিন দুটি। আমেরিকার বিখ্যাত কামিন্স ব্র্যান্ডের এই ইঞ্জিনের একেকটির ক্ষমতা প্রায় ৬০০ বিএইচপি করে। ১৭টি ভিআইপি কেবিনসমৃদ্ধ এই জাহাজ ঘণ্টায় প্রায় ১২ নটিক্যাল মাইল গতিতে ছুটতে পারে। নৌযানটিতে তিন ক্যাটাগরির প্রায় ৫০০ আসন রয়েছে। রয়েছে কনফারেন্স রুম, ডাইনিং স্পেস, সি ভিউ ব্যালকনিসহ আধুনিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা।

 

প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনস যেতে আর নয় টেকনাফ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে যুগান্তকারী কিছু উদ্যোগের কারণে পর্যটনের সম্ভাবনাময় খাতগুলো ক্রমশ ডানা মেলছে। সম্প্রতি এই শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেন শিক্ষানুরাগী ও উদ্যোক্তা প্রকৌশলী এম এ রশিদ। যিনি এক হাতে যেমন প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশসেরা বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তেমনি আরেক হাতে গড়ে তুলেছেন বিশাল কর্মক্ষেত্র কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড। যেখানে তিনি নিত্যনতুন ভাবনায় জাহাজশিল্পের নকশা ও নির্মাণ খাতের উন্নয়নে বহুবিধ প্রতিভাবানদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে সরাসরি সেন্ট মার্টিনস সমুদ্র ভ্রমণে বিলাসবহুল জাহাজের যাত্রার মাধ্যমে পর্যটনশিল্পে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন তিনি।

কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিনস যাতায়াতে এখন আর টেকনাফের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে না। কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের উদ্যোগ ও পরিচালনায় পর্যটকরা এখন থেকে সমুদ্রপথে এম ভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস নামের বিলাসবহুল জাহাজে কক্সবাজার শহর থেকে সরাসরি সেন্ট মার্টিনস ভ্রমণ করতে পারবেন। বিলাসবহুল এই জাহাজটি গত ৩০ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নৌ-সচিব এম এ সামাদসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। কক্সবাজার বিমানবন্দর সড়কের বিআইডাব্লিউটিএ ঘাটে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়।  

সমুদ্রপথে কক্সবাজার থেকে সরাসরি সেন্ট মার্টিনস পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের দাবি দীর্ঘদিনের। এই প্রথম পর্যটকরা কক্সবাজার থেকেই প্রথমবারের মতো সেন্ট মার্টিনস যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছেন। জাহাজটি প্রতিদিন কক্সবাজার থেকে ছাড়ে সকাল ৭টায় এবং ফিরতি পথে সেন্ট মার্টিনস থেকে ছাড়ে বিকেল সাড়ে ৩টায়।

কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এম এ রশিদ জানান, এম ভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেসকে নিজস্ব ডকইয়ার্ডে একটি অত্যাধুনিক বিলাসবহুল জাহাজ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। পুরোপুরি প্রস্তুত নৌযানটি সার্ভিসে যাওয়ার আগে সি ট্রায়ালের অংশ হিসেবে কর্ণফুলী নদী থেকে পতেঙ্গার সমুদ্র মোহনা পর্যন্ত  ট্রায়াল সম্পন্ন করে।

পাহাড়-সমুদ্র বরাবরই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। তাই বিশ্বের বৃহত্তম সৈকত কক্সবাজারের গুরুত্ব অন্যতম। কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে সাগরবক্ষের ক্ষুদ্রাকৃতির নয়নাভিরাম প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনস, যা বিশ্বের অন্যতম সুন্দর প্রবালদ্বীপ হিসেবে পরিচিত। ফলে পর্যটকদের কাছে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনসের গুরুত্ব বরাবরই অন্য রকম। কিন্তু কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিনস যাতায়াত করতে পর্যটকদের পাড়ি দিতে হতো টেকনাফের দীর্ঘ স্থলপথ। সম্প্রতি এম ভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস সেই দীর্ঘযাত্রাকে নীল সমুদ্রে নান্দনিক ভ্রমণে রূপ দিয়েছে।

ভ্রমণের ব্যয়সহ বিস্তারিত জানতে ঢাকা : ০২-৫৮৩১৭০৬১, ০১৭৭১ ৫৭৫ ৪৮৯ ও ০১৮৩২ ৪০৪ ১৪৯। চট্টগ্রাম : ০৩১-৬২৭৮৬৬ ও ০১৭১১-৭৪৯৯৫৫। কক্সবাজার : ০১৮৭০-৭৩২৫৯০-৯৭ এবং সেন্ট মার্টিনস্ : ০১৮৭০-৭৩২৫৯৮-৯৯

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা