kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

অন্য কোনোখানে

রংধনুর খোঁজে

তানজিদ বসুনিয়া   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রংধনুর খোঁজে

রাত ৯টা, বৃষ্টিভেজা ফাঁকা পথ। আরামবাগের বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে রোমাঞ্চ প্রকাশ করছিলেন মেহেদী হাসান, ‘আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরলেও এবারই প্রথম বিদেশ যাচ্ছি। তাও আবার ভিন্নধর্মী একটি আয়োজনের সঙ্গী হয়ে। অন্য রকম রোমাঞ্চ কাজ করছে।’ মেহেদীর মতো আরো ডজনখানেক তরুণের আড্ডা বাসস্ট্যান্ডের সামনে। আলোচনার বিষয় মেঘ ও পাহাড়।

ড্রিংকিং ওয়াটার স্পার আয়োজনে ‘স্পা ট্যুর ডি রেইনবো-ফটোগ্রাফি কম্পিটিশন’ বিজয়ীদের ট্যুর। তৃতীয়বারের মতো আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় চার হাজার ৩০০ ফটোগ্রাফার ১১ হাজার ৯৬০টি ছবি জমা দেন। তাঁদের মধ্যে সেরা ১৫ জন আলোকচিত্রী পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন।

বাস ছাড়ল রাত ১০টায়। সেরা ১৫-এর একজন বুয়েট ছাত্র আশিকুল ইসলাম হিমেল জানালেন, ‘ফটোগ্রাফির শখ ছোটবেলা থেকেই। স্পার আয়োজন জানতে পারি ফেসবুকে। সেরা ১৫ জন পাবেন শিলং ও চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের সুযোগ। একটি ছবি জমা দিই। এত ফটোগ্রাফারদের ছবির মধ্যে বাছাই করা সংক্ষিপ্ত তালিকায় নিজের নাম দেখে অবাক হয়েছিলাম।’

সকাল ৮টায় তামাবিল স্থলবন্দরে পৌঁছে তরুণদের বহনকারী বাস। সকালের আহার, দুই স্থলবন্দরের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে যখন ডাউকি দিয়ে প্রবেশ করতে চলেছি তখন প্রায় দুপুর। ডাউকি বর্ডারে কাজ সেরে একটি মিনিবাসে যাত্রা শুরু হতেই ক্যামেরায় পাহাড় বন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পরল সবাই। প্রথম গন্তব্য স্নোনেংপোডেং। উমগট নদী ও পাহাড়ের অপরূপ মিশ্রণের কারণে বরাবরই দর্শনার্থীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে স্থানটি। বৃষ্টির বাগড়ায় বেশিক্ষণ থাকা হলো না। পরের গন্তব্য মাউলিলং। যাওয়ার পথে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চিত করে জৈন্তা হিলস ভিউ। জাফলংয়ে ঘুরতে গিয়ে ভারতের যে শহর, যে ব্রিজ দেখে মানুষ তাকিয়ে থাকে, এখানে এসে সবাই একইভাবে তাকিয়ে থাকে ওই পারে জাফলংয়ের দিকে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে এগিয়ে চলা মিনিবাস মাউলিলং পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল। একটি গ্রাম যে ছবিকেও হার মানাতে পারে তার প্রমাণ এই মাউলিলং। সন্ধ্যা নামার আগেই এখান থেকে জীবন্ত শিকড়ের সেতুর [লিভিং রুট ব্রিজেস] সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করার জন্য ছুটলেন ফটোগ্রাফাররা।

লিভিং রুট ভিলেজ দেখে ফিরতে ফিরতে চারপাশে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। সন্ধ্যায় মাউলিলং থেকে শিলংয়ের পথে যাত্রা শুরু করল আমাদের বাস। পাহাড়ের ওপর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ও বৃষ্টির সংমিশ্রণ অপরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। গান, গল্প, আড্ডায় শিলংয়ে পৌঁছাতে রাত ১০টার মতো বেজে গেল। রাতের আহার সেড়ে বিশ্রামে গেলেন সবাই। এই ফাঁকে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (ব্র্যান্ড) রেজাউল করিম জানান, ‘আকিজ গ্রুপ সব সময় সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী কাজকে সাপোর্ট করে। আমরা দেশের তরুণদের নিয়ে কিছু করতে চাচ্ছিলাম। অন্য ছবির প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে সাধারণত টাকা দেওয়া হয়। আমরা বিজয়ীদের ছবি তোলার জন্য ঘুরতে নিয়ে যাওয়াটাই দিচ্ছি পুরস্কার হিসেবে।’

দ্বিতীয় দিন সকালে যাত্রা শুরু হলো এলিফ্যান্ট ফলসের উদ্দেশে। পথে ক্যাথেড্রাল অব মেরি চার্চ ও গ্লাস দিয়ে বানানো গ্লাস মসজিদ দেখতে নেমে পড়ল সবাই। স্থাপত্যকলার কী অপরূপ প্রয়োগই না ঘটেছে এই দুই স্থাপনায়। বৃষ্টির মধ্যেও চলল ছবি তোলা। দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে গাড়ি থামল এলিফ্যান্ট ফলসের সামনে। সাধারণত ঝরনার সৌন্দর্য দেখতে দর্শনার্থীদের বহু দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু এখানে চিত্রটা উল্টো। গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান থেকে মাত্র দুই মিনিট দূরত্বে এলিফ্যান্ট ফলস। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলে যৌবন ফিরে পাওয়া এলিফ্যান্ট ফলসের সৌন্দর্যে বিমোহিত সবাই। ছবি তোলা শেষে ফের যাত্রা শুরু হলো শিলংয়ের পথে। মাঝপথে বাস থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ চিত্কার দিয়ে ওঠেন প্রতিযোগিতার বিচারক আসাফ উদ দৌলা, ‘এ রকম সুন্দর মুহূর্ত পাওয়া দুর্লভ। শহরের ওই প্রান্তে মেঘ আর পাহাড়। নিচে নেমে হতবাক একডজন দর্শনার্থী। লুমডেং ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে সবার চোখ গেল দূর নীলিমায়। নিচে পাহাড়ের কোলঘেঁষে বাহারি রঙের ছোট ছোট দালান। কিছুদূর পর আবার পাহাড়। বাহারি দালানের সঙ্গে উঁচু পর্বতের মেলবন্ধন করে দিয়েছে মেঘ। ক্যামেরাবন্দি করতে ভুললেন না কেউই। বিকেলের আগ দিয়ে শিলংয়ে এসে দুপুরের খাবার সেরে যে যার মতো কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় কাটালেন।

পরদিন সকালের গন্তব্য চেরাপুঞ্জি। মেঘালয় আসার প্রথম দুই দিন বৃষ্টি থাকলেও তৃতীয় দিনে ঝকঝকে রোদ। বাসে চলার পথে সবার দৃষ্টি বাইরে। ছবির মতো সুন্দর দৃশ্য। আঁকাবাঁকা পথে নীল আকাশে মেঘের ছোটাছুটি। চেরাপুঞ্জি পৌঁছানোর আগে বাস থামল মকডক ভিউ পয়েন্টে। সেখানে ছবি তোলা ও পরিদর্শন শেষে গন্তব্য লাইটলুম উপত্যকা। দূর থেকে যাঁরা মেঘের সৌন্দর্য দেখে আফসোস করেছেন, তাঁদের জন্য উপযুক্ত স্থান। সামনে দিয়ে মেঘ চলে যাচ্ছে, ভিজিয়ে যাচ্ছে। কী অপরূপ সৌন্দর্য!

লাইটলুম উপত্যকা থেকে যাত্রা শুরু হলো নোকালিকাই ফলসের উদ্দেশে। মেঘ ও কুয়াশার কারণে রাস্তায় রীতিমতো হেড লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে গাড়ি। সেখানে দুপুরের আহার সেরে আংশিকভাবে নোকালিকাই পরিদর্শন শেষে যাত্রা শুরু হলো চেরাপুঞ্জির পথে। বিকেলে যখন চেরাপুঞ্জিতে বাস থামল, তখন মেঘদলের প্রতিযোগিতায় ঝরনার দেখা মেলা ভার! ‘সেভেন সিস্টার ফলস’ দেখার জন্য পুরো সফরে মুখিয়ে ছিলেন ফটোগ্রাফাররা। সেখানে পৌঁছেই রংধনুর খোঁজে নিজেদের ক্যামেরা নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল সবাই। যে রংধনুকে কেন্দ্র করে ট্যুরের থিম তারই দেখা নেই! হতাশ হয়ে ফিরতে হলো ফটোগ্রাফারদের। রংধনু ওঠেনি তাতে কী, মন রাঙাতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে রাতে হোটেলের ছাদে খেলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। খেলা শেষে গত তিন দিনে তোলা ছবি থেকে সেরা ছবিগুলো জমা দিতে বলা হলো প্রতিযোগীদের। যেখান থেকে বাছাই করে দেয়া হবে পুরস্কার। ছবি ও খেলার পুরস্কার প্রদান শেষ হতে হতে রাত প্রায় ১১টা।

রাতের খাওয়া শেষে ক্লান্ত সবাই যার যার রুমে চলে গেলেন। পরদিন ভোর ৫টার আগেই সব ফটোগ্রাফারকে দেখা গেল হোটেলের ছাদে। গত দিনের রংধনুর দেখা না পাওয়ার দুঃখ ভুলে সবার চোখে-মুখে তখন প্রশান্তির আভা। পাহাড়ের অনাবিল সূর্যোদয় দেখে বিমোহিত সবাই। নিজেদের মতো ছবি তুলে সকাল ৮টার মধ্যে ফিরলেন নাশতা করতে। কিছুক্ষণ পর যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশের উদ্দেশে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা