kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

অন্য কোনোখানে

আ জার্নি বাই কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস

শাহজাদা ফারহান অধি

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আ জার্নি বাই কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস

অনেক দিন ধরেই শুনছিলাম, ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে নতুন একটি বিলাসবহুল ট্রেন চালু হচ্ছে। অবশেষে ১৭ অক্টোবর শুরু হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে নিয়ে আসা ট্রেনটির যাত্রা। এদিন উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন থেকে সকাল ৭টা ২০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে ট্রেনটি।

ট্রেন ভ্রমণ সব সময়ই ভালো লাগে আমার। ট্রেনে ঘুরে বেড়ানো আমার শখ। গত তিন-চার বছরে নতুন চালু হওয়া সব ট্রেনের প্রথম যাত্রাতেই যাত্রী হয়েছি। মিটারগেজ ট্রেন জার্নির অনুভূতিই আলাদা। ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম যেতে এই ট্রেনের ১০ ঘণ্টার মতো লাগবে। এত লম্বা জার্নির লোভ সামলাতে পারলাম না। ঢাকা থেকে প্রথম যাত্রাতেই টিকিট কেটে ফেললাম। সঙ্গী আরো চারজন।

১৭ অক্টোবর খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি কখন সময় হবে। সারা দিন অপেক্ষা করার ধৈর্য ছিল না। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে ট্রেন ছাড়ার কথা থাকলেও কমলাপুর চলে গেলাম বিকেলেই। নতুন ট্রেনে যাব ভাবতেই শিহরণ লাগছে। এই ট্রেনের টিটিই লিটন ফারুক ভাই আমার পরিচিত। মাটির মানুষ। কাজে সর্বদা সততা বজায় রাখেন। আমাদের স্টেশনে দেখে খুব খুশি হলেন। তাঁর বাড়ি লালমনিরহাট। নিজের এলাকায় নতুন ট্রেন পেয়ে তাঁরও খুশির অন্ত নেই। পকেট থেকে চকচকা ৫০০ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললেন, যাও খিচুড়ি নিয়ে এসো। ট্রেনে একসঙ্গে বসে খাব।

আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ। ৮টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা থেকে প্রথম যাত্রা শুরু করল কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। ট্রেনে মোট ৬২৬টি আসন। তবে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম ফেরার সময় এতে ৫৯৬টি আসন থাকে। এর মধ্যে শোভন চেয়ার ৫১০ টাকা, এসি চেয়ার ৯৭২ টাকা এবং এসি বাথ এক হাজার ৭৫০ টাকা। আমাদের সিট শোভন চেয়ার শ্রেণিতে। মাঝখানের টেবিলে সিট। সবাই মুখোমুখি বসে আড্ডা দিচ্ছি। নতুন লেটেস্ট মডেলের ট্রেন, ভেতরে নতুন গন্ধ।

অনেকে তাদের মাথার ওপরের লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ কেউ কানে হেডফোন গুঁজে অন্ধকারে বাইরে তাকিয়ে আছে। সবার মুখেই আনন্দের আভা। হালকা ঠাণ্ডা লাগছে। ব্যাগ থেকে ফুলহাতা শার্ট বের করে গায়ে দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে পাশের কোচে গিয়ে একটা ফাঁকা সিটে বসলাম। সব সিটের পাশেই চার্জিং পয়েন্ট! ভাবছি এক কাপ কফি হলে মন্দ হতো না। কী আশ্চর্য! তখনই একজন কফি নিয়ে হাজির। চিনি বাড়িয়ে এক কাপ কফি নিলাম।

জানালা দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। জানান দিচ্ছে সামনেই শীতের আগমন। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ট্রেন টাঙ্গাইল পার হলো। সামনে বঙ্গবন্ধু সেতু। সেতু পার হলে ঘুমিয়ে পড়ব ভাবছি। তখনই লিটন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। টিকিট চেক করতে এসেছেন। বললাম চেকিং শেষ করে আসেন। একসঙ্গে খাব। খিচুড়ি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

লিটন ভাই যখন চেকিং শেষ করে এলেন তখন ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর। সবাই মিলে খাওয়া শুরু করলাম। খিচুড়ি তখনো বেশ গরম। একসঙ্গে সব প্যাকেট খোলায় পুরো কোচে খিচুড়ির সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। অনেকে আড়চোখে খাওয়া দেখছে। খাওয়া শেষে বেসিনে হাত ধুয়ে সিটে এসে বসলাম। লিটন ভাই গেলেন চা আনতে। তিনি মানুষকে খাওয়াতে খুব পছন্দ করেন। ফিরে এসে জানালেন, কপাল খারাপ। খাবার বগি বন্ধ করে দিয়েছে।

লিটন ভাই আবার ডিউটিতে চললেন। আমি বাইরের অন্ধকার দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। চোখ খুলতেই দেখি সকাল হয়ে গেছে। বাইরে ঘন কুয়াশা। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে দেখি ট্রেন রংপুর স্টেশনে। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে মুখ বাইরে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলাম। ব্যাপারটা একটু রিস্কি হলেও ভালো লাগছিল। রোদ ওঠেনি এখনো। ট্রেন চলছে তো চলছেই। পথ যেন শেষই হয় না। তবু মন্দ লাগছে না। খানিক পর আবার সিটে চলে এলাম। জানালার পাশে বসে সবুজ প্রকৃতি দেখতে দেখতেই ট্রেন তিস্তা জংশন অতিক্রম করল।

আমার সবচেয়ে প্রিয় সেকশন—তিস্তা টু কুড়িগ্রাম। এখানকার লাইনের অবস্থা খুবই খারাপ। ট্রেন চলে সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার গতিতে। রেললাইনের সমান্তরালেই আরেকটি রাস্তা। একটু পরপরই আঁকাবাঁকা মোড়। নতুন ট্রেন, তাই ওই সব এলাকার বেশির ভাগ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রেন দেখছে। বুড়ো, পিচ্চি, মহিলা সবাই। ট্রেনের গতি কম হওয়ায় নসিমন নিয়ে অনেকে পাল্লা দিচ্ছে। কারো চেষ্টা সাইকেল নিয়ে ট্রেনকে টেক্কা দেওয়া। এই লাইনের ধীরগতির ট্রেন নিয়ে একটি মজার গল্পও আছে। একদিন এক অশীতিপর বৃদ্ধা ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। লাইনে ট্রেনও যাচ্ছে। চালক জানালা দিয়ে মাথা বের করে বললেন, ‘বুড়িমা, তোমার কষ্ট হচ্ছে না? হেঁটে না গিয়ে ট্রেনে উঠে পড়ো। বুড়িমা উত্তর দেন, না বাবা, আমার তাড়া আছে।’

দেখতে দেখতে ট্রেন কুড়িগ্রাম স্টেশনে পৌঁছে গেল। স্টেশনে শত শত মানুষ। সবাই নতুন ট্রেন দেখতে এসেছে। মহিলারা বাচ্চা কোলে নিয়ে এসেছে ট্রেন দেখতে। আমরা আবার এই ট্রেনেই ঢাকা ফিরব। ইঞ্জিন ঘুরিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে দেবে। এই ফাঁকে নাশতা সারতে চাইলাম। কিন্তু স্টেশনের আশপাশে কোনো হোটেল নেই।

ফেরার পথে আমাদের সিট এসি কেবিনে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। কৌতূহলী যারা ট্রেনে উঠেছিল তারা নেমে যাচ্ছে। গার্ড বাঁশি ফুঁ দিতেই ট্রেন আবার ছুটে চলল ঢাকার উদ্দেশে। এবার অনেকটা ক্লান্ত লাগছে। কেবিনে কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। কেবিনে ফ্রিজ আছে। এ ছাড়া অ্যাটেনডেন্টকে ডাকার জন্যও আছে বিশেষ ব্যবস্থা। ফলে অ্যাটেনডেন্টকে ডাকতে আর বাইরে যেতে হয় না। রংপুর স্টেশনে নেমে পরোটা, ডিম, ডাল আর হালুয়া কিনে আবার ট্রেনে উঠলাম। পার্বতীপুর স্টেশনে নেমে চা খেয়ে কেবিনে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল টিটিই সাহেবের ডাকে। টিকিট চেক করতে এসেছেন। এবার অবশ্য আমাদের লিটন ভাই নেই। অন্য আরেকজন টিকিট চেক করে চলে গেলেন। ঢাকার উদ্দেশে এবার আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা