kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অন্য কোনোখানে

গড়াই-পদ্মার মোহনায়

আবু আফজাল সালেহ   

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গড়াই-পদ্মার মোহনায়

কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূরে হরিপুর ব্রিজ। ব্রিজ থেকে দুই পাশে গড়াই নদের উপচেপড়া সৌন্দর্য দেখতে দেখতে হাট হরিপুর পৌঁছে গেলাম। বাঁধ ধরে হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম একেবারে পদ্মার সংযোগস্থানে। এখানে গড়াই ও পদ্মা নদীর যুগলবন্দি। গড়াই এসে মিশেছে পদ্মার সঙ্গে। ভারত থেকে গঙ্গা রাজশাহীতে ঢুকেছে। তারপর পদ্মা হয়ে মিলিত হয়েছে মেঘনায়। গড়াই এখানে মিলিত হওয়ায় তিনটি নদীপথ। পদ্মার একদিকে কলকাতা, অন্যদিকে বাংলাদেশ। কুষ্টিয়ার এখান থেকে গোয়ালন্দ। গড়াই গেছে শিলাইদহ হয়ে রাজবাড়ীতে। ফলে অপরূপ এক মোহনা সৃষ্টি হয়েছে কুষ্টিয়া শহরের কাছে, হরিপুরে। নয়নাভিরাম এই স্থানকে স্থানীয়রা বলেন ত্রিমোহনা। সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ে এক মনোরম আবেশ সৃষ্টি হয় এখানে। বিকেলে সময় কাটাতে কুষ্টিয়া শহরসহ অন্যান্য এলাকার ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন প্রতিদিন। বিস্তীর্ণ জলরাশির গড়াই-পদ্মার এই মোহনাকে সাগর বলে আপনার কাছে ভুল হতে পারে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই সৌন্দর্যের জাল আরো জোরালোভাবে বিছিয়ে দিল ত্রিমোহনা। সূর্যের রক্তিম আভা পানিতে আছড়ে পড়ছে। সূুর্যাস্তের লাল আভা গিলে খাচ্ছে নদীর স্রোত। এই সৌন্দর্য না দেখলে ব্যাখ্যা করা মুশকিল। এখান দিয়েই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা-শিলাইদহ যাতায়াত করতেন। পদ্মা ও গড়াই নদীর স্মৃতি নিয়ে অনেক কবিতা-গান লিখেছেন কবি। গড়াইকে তিনি বলতেন গোড়াই। এমনটা উল্লেখ আছে তাঁর কবিতায়—‘গোড়াই নদীর চর/নূতন ধানের আঁচল জড়ায়ে ভাসিছে জলের পর/একখানা যেন সবুজ স্বপন একখানা যেন মেঘ/আকাশ হইতে ধরায় নামিয়া ভুলিয়াছে গতিবেগ/দুপুরের রোদে আগুন জ্বালিয়া খেলায় নদীর চর/দমকা বাতাসে বালুর ধূম্র উড়িছে নিরন্তর/রাতের বেলায় আঁধারের কোলে ঘুমায় নদীর চর/জোনাকি মেয়েরা স্বপনের দীপ দোলায় বুকের পর।’

পদ্মার ওপারে পাবনা, পারমাণবিক কেন্দ্র রূপপুর। আরো আছে বিস্তীর্ণ বালুচর। সবুজের সমারোহ। নৌকার চলাচল আর ছোট ছোট লঞ্চে মাঝিদের জীবনের গল্প। আপনি চাইলে নৌকা কিংবা লঞ্চ ভাড়া করে নেমে পড়তে পারেন নদীতেও। নদীতে নেমে গেলে মনে হয় সাগর। কী বিশালতা। চারদিকে শুধু থইথই পানি আর পানি। এর মাঝে নৌকা ভাসছে, দুলছে। আমাদেরও ভাসতে ইচ্ছা হলো। দুই সঙ্গী লুত্ফর ও মালেককে নিয়ে মাঝারি আকৃতির একটি নৌকা ভাড়া করলাম। তাদের নিয়ে নাও ভাসালাম মাঝ দরিয়ায়। কিছুদূর যেতেই ঢেউয়ের তোড়ে নৌকা এই ডোবে এই ভাসে অবস্থা। নৌকার এমন নাচুনিতে ভয়ই পেয়ে গেলাম।

গড়াই-পদ্মার মিলনস্থলে নৌকাভ্রমণ দারুণ রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা। জেলেদের মাছ ধরা, নৌকায় মালামাল পরিবহন, রঙিন নৌকায় ঝলমলে রোদের ঝিলিক অপূর্ব সৌন্দর্যের অবতারণা করে। ওপারের সবুজ গাছগাছালি ও চরাঞ্চলের সবুজ ক্ষেতের মনোরম দৃশ্যও দুচোখ ভরে দেখার মতো। সন্ধ্যাবেলায় নৌকাগুলো যেন পিলসুজে বাতি জ্বলে মিটির মিটির। পাশ থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকার ভুটভুট শব্দে এ যেন মাতোয়ারা এক ত্রিমোহনা।

পদ্মার প্রধান শাখা নদ গড়াই। গড়াই নদের আর এক প্রান্ত গিয়ে মিশেছে মধুমতীতে। এই মিলন স্থান থেকে কিছুদূর গেলেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। এটি দেশের সবচেয়ে বড় রেল সেতু। তার আগেই পড়বে লালন শাহ সেতু। আর এক তীরে দেশের বৃহত্তম ডিজেলচালিত তাপবিদ্যুৎ উত্পাদন কেন্দ্র। একটু সময় করে নৌকাভ্রমণে দেখা মিলবে এতগুলো বিখ্যাত স্থাপনার।

নৌকাভ্রমণ শেষে বাঁধে বসলাম। বিনোদনপিপাসুদের ভিড় হয় বিকেলবেলা। প্রেমিকযুগলেরও দেখা মেলে সারি সারি। বাদাম আর পটেটো চিপস খেতে খেতে ভুলে গেলাম সারা দিনের ছোটাছুটির ক্লান্তি। নদীর স্রোতের শব্দে হিমেল মৃদু হাওয়ায় গেয়ে উঠলাম, সাগরের তীর হতে, মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে, তোমার কপালে পরাব বলে ভাবি এ বিরলে।

 

কিভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কুষ্টিয়ার মজমপুর। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনে পোড়াদহ বা ভেড়ামারা নামতে হবে। এরপর অটো কিংবা লোকাল বাসে কুষ্টিয়া। রাজশাহী বা খুলনার কিছু ট্রেন কুষ্টিয়ায়ও আসে। রাজবাড়ী বা গোপালগঞ্জ থেকে ট্রেনে কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন। কুষ্টিয়া শহর থেকেই অটোতে তিন-চার কি.মি. দূরে হরিপুর ব্রিজ।

থাকা ও খাওয়া : থাকা ও খাওয়ার জন্য কুষ্টিয়া শহরে জায়গার অভাব নেই। বাজেটের মধ্যেই বিভিন্ন দাম ও মানের আবাসিক ও খাবার হোটেল পাবেন।

 

আরো যা কিছু

কুষ্টিয়ায় বেড়াতে এলে এখানকার বিখ্যাত তিলের খাজার স্বাদ নিতে ভুলবেন না। কুষ্টিয়ার কুলফি মালাইর স্বাদে মাদকতা আছে। একবার খেলে বারবার খেতে মন চাইবে। শহরের কাছেই ছেঁউড়িয়া। মানে লালন সাঁইজির আখড়া। এখানেই লালন একাডেমি। বিখ্যাত বাউলসাধক লালন সাঁইজির মাজারের কাছেই তাঁর অনেক ভক্তের কবর। লালন একাডেমির ক্যাম্পাসও দেখার মতো! অপরূপ রঙ্গন ফুটে আছে ক্যাম্পাসজুড়ে। প্রতিবছর লালনের জন্ম ও মৃত্যুদিনে (কার্তিক মাসে) মেলা হয়। তখন প্রচুর লোক-সমাগম হয়। যে কেউ গেলেই লালনের গান গেয়ে শোনান ভক্তরা। ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন মেলা। লালন গানের সুরে নিজেকে হারাতে চাইলে চলে আসতে পারেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা