kalerkantho

আপনার শিশু

শিখুক সমঝোতা

যেকোনো ধরনের দ্বন্দ্বে জড়ানো কিভাবে এড়ানো যায়, সেটা শিশু পরিবার থেকেই শিখবে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় দ্বন্দ্ব নিরসন। কিভাবে শিশুকে দ্বন্দ্ব নিরসন করতে শেখাবেন জানিয়েছেন স্মিতা দাস

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিখুক সমঝোতা

মাঝেমধ্যেই শিশুরা কারো সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। দ্বন্দ্বের ফলে শিশুর মনে নেতিবাচক আবেগ জন্ম নেয়। তর্ক বা ঝগড়া একসময় মারামারিতেও রূপ নিতে পারে। এ সময়ে শিশুরা রাগ, ঘৃণা ইত্যাদি তীব্রভাবে প্রকাশ করে। এমন পরিস্থিতিতেও শিশুকে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাতে হবে। বিভিন্ন বয়সে শিশুদের আবেগ, সমস্যার ধরন আলাদা। তাই দ্বন্দ্ব নিরসনের কৌশলও আলাদা হওয়া উচিত।

 

ছোট্ট শিশুদের জন্য (২-৮ বছর)

কথা বুঝতে বা বলতে শেখার পর থেকেই শিশুদের যেকোনো সমস্যা বড়দের ধৈর্য নিয়ে শুনতে হবে। একইভাবে বড়রা শিশুর যেকোনো ধরনের আবেগকে কিভাবে দেখছেন এবং কী সমাধান দিচ্ছেন সেটাও পরিষ্কারভাবে শিশুকে জানাতে হবে। পরস্পরের এই বোঝাপড়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলা ও তার কথা শোনার সময় সায় দেওয়া (হ্যাঁ, না, হ্যাঁ শুনছি) খুবই ইতিবাচকতা তৈরি করে। এতে শিশুর মধ্যেও এই গুণাবলি আপনা থেকেই গড়ে উঠবে। শিশুরা তাদের তীব্র ক্ষোভ ও জেদের বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে যেন চিত্কার, হাত-পা ছোড়া, কান্নাকাটি শুরু না করে, সেভাবেই তাদের তৈরি করতে হবে। তাদের সুন্দরভাবে বোঝাতে হবে যে এতে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং তা আরো খারাপ হবে।

যে কোন উত্তেজক পরিস্থিতিতেও বড়দের গলার স্বর শান্ত রেখে কথা বলতে হবে। সাধারণত পরিবার থেকেই শিশুরা এই বিষয়টি রপ্ত করে। কোনো সমস্যায় শিশুকে এককথায় সমাধান না দিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে করতে তাকে সেই সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে হবে। এতে শিশুর ভেতর বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব নিরসনের প্রবণতা তৈরি হবে।

শিশু ও টিনএজারদের জন্য (৯-১৫ বছর)

সব সময় জিততে চাওয়ার প্রবণতা থেকে শিশুকে বের করে আনতে হবে। হোক সেটা তর্ক, খেলা বা অন্য কিছু। আমিই ঠিক—এই ধারণা থেকেও বের হয়ে উদারমনা হতে হবে। অন্যের যুক্তিকে, প্রাধান্যকে গ্রহণ করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। নিজের ভুল স্বীকার করতে পারা একটি অনন্য গুণ। এটি শিশুর ভেতর তৈরি করতে পারলে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের প্রবণতা কমে যাবে অনেকখানি।

সমস্যার জন্য কে দায়ী সেটি না খুঁজে এবং তাকে দোষারোপ না করে কী কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং কিভাবে এর সমাধান হবে তার ওপর গুরুত্ব দিতে শেখাতে হবে এই বয়স থেকেই। মোট কথা, ব্যক্তি বিশেষ নয়, সামগ্রিক সমস্যার ওপর মনোযোগ দিতে শেখাতে হবে। এটি দ্বন্দ্ব নিরসন দক্ষতার খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক।

 

রাগ সব সময় রাগ বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। দুঃখ, অসহায়ত্ব, ঘৃণা—এসব আবেগ বড়-ছোট নির্বিশেষে সবাই রাগের মাধ্যমে প্রকাশ করে। তাই শিশুদের নিজের অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। কিভাবে ধৈর্যের সঙ্গে অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তা আত্মোপলব্ধি করা শিখাতে হবে। কারো সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখলে সামনাসামনি তার সঙ্গে ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলে সমস্যা সমাধান করা শেখাতে হবে। আড়ালে নিন্দা করার প্রবণতা থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে। কারণ এতে উভয় পক্ষের দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। শিশুদের প্রতিযোগী মনোভাবে গড়ে তুললে এবং প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে দিলে দ্বান্দ্বিক প্রবণতা কমে যায়, এটি আশ্চর্যজনক হলেও সত্য। কারণ প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট সংখ্যকই জয়লাভ করে। এতে সবার মাঝে হার-জিত দুটিই সমানভাবে মেনে নেওয়ার অনুশীলন হয়।

 

সব বয়সে তিনটি পালনীয়

তিনটি বিষয় অনুসরণ করে চললে ছোটবেলায় যেমন শিশুরা দ্বন্দ্ব নিরসন করতে পারবে, তেমনি বড়বেলায় ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে লাভবান হবে। এই তিনটি বিষয় হলো—

হ সহযোগিতা

হ আপস

হ যোগাযোগ দক্ষতা

শেষ কথা হলো, শিশুর জন্য অভিভাবককে একটি নির্ভরযোগ্য জায়গা হতে হবে। তাহলে ঠিক, ভুল যা-ই করুক না কেন, সে আপনার কাছে আসবে, নিঃসংকোচে তার অনুভূতি জানাবে। আপনার সান্ত্বনা যেন আপনার শিশুর পাশে সব সময় থাকে। তাহলে বাইরের রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা—সব দ্বন্দ্বকে সে অতিক্রম করবে অবলীলায়।

মন্তব্য