kalerkantho

শনিবার । ১৪ চৈত্র ১৪২৬। ২৮ মার্চ ২০২০। ২ শাবান ১৪৪১

অন্য কোনোখানে

পানছড়ি অনেক সুন্দর

ইশতিয়াক হাসান   

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পানছড়ি অনেক সুন্দর

ঠিক হলো, আগে যাব শান্তিপুর অরণ্য কুটির। তারপর মায়াবিনী লেক। যদিও যাওয়ার পথে আগে লেকটাই পড়ে। খাগড়াছড়ি শহর থেকে একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করা হলো। যাত্রী আমরা পাঁচজন। আমি, আমার স্ত্রী পুনম, চার বছরের মেয়ে ওয়াফিকা, চাচাতো বোন নাজিফা এবং তার স্বামী মহিউদ্দীন। এবার খাগড়াছড়ির যেখানেই গিয়েছি, চেঙ্গি নদী সঙ্গী হয়েছে। তো পানছড়ির শান্তিকুটিরে যাওয়ার পথেও ব্যত্যয় হলো না। মাঝেমধ্যেই গাছপালার ফাঁক দিয়ে তার চেহারা দেখা যাচ্ছে। ঘড়ি বলছে সকাল সাড়ে ১০টা। পাহাড়িদের বর্ষবিদায় আর বরণের উত্সব চলছে। একটু পর পরই শিশু থেকে বুড়ো—সব বয়সী পাহাড়িবোঝাই ট্রাক আমাদের পাশ কাটাচ্ছে। ওয়াফিকা খুশি মনে ওদের টা টা দিচ্ছে। ট্রাকে আসীন শিশুরাও আমাদের দেখে হৈ-হট্টগোল করছে। গাড়িচালক সুমনের বাড়িও পানছড়ি। জানাল, পানছড়ি সদর পেরিয়ে বেশ কয়েক কিলোমিটার পেরোলে ভারতীয় সীমানা। ভারতে যখন মেলা হয়, তখন নাকি অনেকে ওপারে গিয়ে মেলা দেখে আসে। খাগড়াছড়ি শহর থেকে পানছড়ির শান্তিকুটিরের দূরত্ব কমবেশি ২৫ কিলোমিটার। আমাদের গাড়িচালক বাঁয়ের যে রাস্তাটা দিয়ে শান্তিকুটিরের দিকে যেতে হয়, সেটা ফেলে এগিয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর একজনকে জিজ্ঞেস করতেই ভুলটা ধরা পড়ল। আবার গাড়ি ঘুরিয়ে চললাম। বাঁয়ের রাস্তায় ঢুকে কিছুটা পথ যেতেই ভারি সুন্দর একটা জায়গায় চলে এলাম। সরু পিচ ঢালাই রাস্তাটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে। ডান পাশে যত দূর চোখ যায়, শুধু ধানক্ষেত। বাঁয়েও কিছুদূর পর্যন্ত ধানক্ষেত। তারপর হঠাত্ করেই পাহাড়সারির শুরু। ধানক্ষেত আর পাহাড়ের এই মিতালি দেখতে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। ছবি তুললাম। গাড়ি ছাড়ার পর কিছুদূর আসতেই আবার থামতে হলো। সামনেই চেঙ্গির ওপর ব্রিজ। নিচে তাকাতেই চোখে পড়ল সুন্দর একটা রাবার ডেম। রাবারকে ফুলিয়ে পানি ধরে রাখার জন্য নদীর ওপর বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ডান দিকে থইথই পানি। রাবার ডেম উপচে এ পাশে পড়ছে পানির একটা ধারা। দেখলে মনে হয়, ছোটখাটো একটা জলপ্রপাত। পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু ছোট শিশুও নদীতে ডেমের জায়গায় নেমে পড়েছে। আমার গিন্নি, নাজিফা আর মহিউদ্দীন নামল নদীতে। আমি রইলাম ওয়াফিকার পাহারায়। খুব ঢালু একটা জায়গা দিয়ে নিচে নামতে হয়। বেশ কসরত করে নেমে পড়ল ওরা তিনজন। এদিকে ওকে রেখে যাওয়ায় কাঁদতে কাঁদতে অভিশাপ দেওয়া শুরু করল ওয়াফিকা। এ কারণেই কি না কে জানে, মহিউদ্দীন পটকানা খেয়ে শরীর ভিজিয়ে ফেলল! ওরা উঠে আসার পর ডাব খাইয়ে ওয়াফিকাকে ঠাণ্ডা করে আবার যাত্রা। মিনিট দশেকের মধ্যে চলে এলাম শান্তিকুটিরের সামনে। বেশ বড় এলাকা নিয়ে বৌদ্ধদের এই তীর্থস্থান। ইন্টারনেট ঘেঁটে জেনেছি, পুরো জায়গাটা ৬৫ একর। অটোরিকশা বাইরে রেখে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। কিছুদূর এগোতেই অনেক গাছপালা চোখে পড়ল। মূল আকর্ষণ বিশাল বৌদ্ধ মূর্তিটা। রোদে গনগনে একটা পাকা জায়গা পেরিয়ে মূর্তিটার সামনে চলে এলাম। ৫০ ফুট উচ্চতার বসে থাকা বৌদ্ধ মূর্তিটা তৈরি হয়েছে ২০০৯ সালে। সোনালি রঙের বুদ্ধ সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে অনেক বৌদ্ধ মূর্তি চোখে পড়বে। তবে এটার মতো বিশাল, আর সুন্দর আছে কমই। কয়েকটা ছোট মন্দির আছে পাশেই। মেহগনি, আগর, তেজপাতাসহ নানা ধরনের হাজারো গাছে ভর্তি জায়গাটা। ডান পাশে বড় মাঠ। এখানেই অনুষ্ঠান হয়। বিশেষ করে কঠিন চীবর দান উত্সবের সময় নাকি গোটা অরণ্য কুটির এলাকা মানুষে গম গম করে। নিচে পাহাড়ি ছড়ার ওপর একটা সেতু নজর কাড়ল। কিছুদূর এগিয়ে গাছপালার মাঝখান দিয়ে নিচে নামার একটা পথ খুঁজে পেলাম। ওয়াফিকাকে নিয়ে সাবধানে ঢালু পথটা দিয়ে নেমে এলাম। কাঠের ছোট্ট সেতুটায় পা রাখলাম। চারপাশে ফুটে আছে অনেক শাপলা। সেতু পেরিয়ে ওপাশে কিছুদূর গেলাম, তারপর এসে বসলাম সেতুতে পা ঝুলিয়ে। এখানে আরো কিছুটা সময় প্রকৃতির নির্জনতা উপভোগ করে উঠে এলাম ওপরে। আমাদের হাতে সময় নেই বেশি। মায়াবিনী লেকের দিকে যেতে হবে এবার।

আধা ঘণ্টা লাগল মায়াবিনী লেকের কাছে পৌঁছতে। পানছড়ির লতিবান ইউনিয়নের কংচাইরীপাড়ায় এর অবস্থান। প্রচুর পর্যটক এসেছেন লেকে। শুনেছি, মোট ৪০ একর জায়গা নিয়ে লেকটা। লেকের এখানে-সেখানে ছোট ছোট দ্বীপের মতো। আবার লেক পেরোনোর জন্য কাঠ-বাঁশের সেতুগুলোও ভারি সুন্দর। আমরা হেলেদুলে সেতু পেরিয়ে এখান থেকে ওখানে যাচ্ছি। পথে এক বাজার থেকে শসা আর কাঁচা মরিচ কিনেছি। লেকের পারের এক দোকান থেকে লবণ চেয়ে নিলাম। তারপর মজা করে শসা খেলাম। ছোট্ট এক দ্বীপের মতো জায়গায় বেশ ভিড়। সেখানে বর্ণিল সব নৌকা ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ১০০ টাকা দিয়ে নাজিফারা একটা নৌকা ভাড়া নিল। সেতুর ওপর থেকে আমরা ওদের ছবি তুললাম। তারপর নৌকা নিয়ে দুই পাহাড়ের মাঝে অদৃশ্য হলো ওরা। সঙ্গে ওয়াফিকা থাকায় আমরা সঙ্গী হলাম না। পানিতে নামতে না পারায় ওয়াফিকার মন ভার। অবশ্য একটু পর মন ভালো হয়ে গেল। লেকের তীরে কম পানিতে পাহাড়িরা মজা করে নিজেদের নৌকাটা ডুবিয়ে দিয়েছে। এখন কোমর পানিতে হৈ-হট্টগোল আর আনন্দ করছে। আমরা বাঁশের সেতু পেরিয়ে ওদের কাছে গেলাম। এরই মধ্যে নাজিফারাও হাজির হয়েছে নৌকা নিয়ে। এদিকে পেট চো চো করছে। এখানে আগে অর্ডার না দিলে খাবার পাওয়া যায় না। তাই দেরি না করে ধরলাম খাগড়াছড়ির পথ।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে শ্যামলী, এস আলম, হানিফ কিংবা শান্তি পরিবহনের বাসে খাগড়াছড়ি যেতে পারেন। আছে এসি বাস সেন্ট মার্টিন পরিবহন। খাগড়াছড়ি শহর থেকে অটোরিকশা কিংবা চাঁদের গাড়িতে শান্তিকুটির আর মায়াবিনী লেক। খাগড়াছড়িতে পর্যটন মোটেল, হোটেল গাইরিনসহ বেশ কিছু ভালো আবাসিক হোটেল আছে । এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য বেশ ভালো সিস্টেম রেস্তোরাঁ। বাঁশকুঁড়ি রেস্তোরাঁর খাবারটাও মানসম্মত। তবে দাম একটু বেশি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা