kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

মেয়ের সুন্দর জীবনের জন্য

উঁচু পদে করপোরেট চাকরি করতেন রাজু আহমেদ ইবনে হাবিব রুদ্র। মেয়ের সুন্দর জীবনের জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। আরো গল্প আছে। জানাচ্ছেন আতিফ আতাউর

৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




মেয়ের

সুন্দর জীবনের

জন্য

‘চাকরিটা কেন ছাড়তে চান?’ চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার দিন জিজ্ঞেস করেছিলেন ওয়ালটনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। উত্তরে কোনো ভণিতা করেননি রুদ্র। সরাসরি বলেছিলেন, মেয়ের সুন্দর জীবনের জন্য চাকরি ছাড়তে চান। সব শুনে তাঁকে কয়েক মাসের ছুটি নেওয়ার সুযোগ দিতে চান তাঁরা। কিন্তু সেটা যে সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত নয় জানতেন রুদ্র। এরপর মেয়েকে নিয়েই শুরু হয় রুদ্রর নতুন জীবন।

সন্তানের জন্য এমন ত্যাগ এটাই প্রথম নয় রুদ্রর। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন নাছিমা আক্তার সীমাকে। তখন গ্রামীণফোনে কাস্টমার সার্ভিস, ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগে চাকরি করতেন রুদ্র। চাকরিটা পার্মানেন্ট হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী মিলে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সীমার গর্ভে সন্তানধারণ নিয়ে প্রথম দিকে বেশ শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বাবা হওয়ার আগেই তখন রীতিমতো সুপারড্যাডের ভূমিকা পালন করেন তিনি। স্ত্রীকে সব রকম সাপোর্ট দেওয়ার জন্য নিজের কর্মস্থল সাতক্ষীরায় নিয়ে যান। এরপর সেখান থেকে বদলি হন খুলনায়। সেখানেই তাঁদের কোল আলো করে আসে সীজা রাইয়ান উর্বী। তখনই আবার ঢাকায় বদলি হন রুদ্র। তিনি ঢাকায়, উর্বী খুলনায়। মেয়ের জন্য মন পড়ে থাকত খুলনায়। এ জন্য সপ্তাহ পেরোতেই মেয়েকে দেখতে ছুটে যেতেন খুলনা।

মেয়েকে ঢাকায় নিজের কাছে রাখার সব রকম সুবিধাই ছিল রুদ্রর। কিন্তু ডাক্তারের নির্দেশ—সন্তান জন্মের পর জন্মস্থানে অন্তত এক বছর প্রতিপালন করা ভালো। এতে রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি সুস্থ ও সুন্দরভাবে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে শিশু। মেয়ের মঙ্গলের জন্য তাই করেছেন এই বাবা। এক বছর পর মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ডাক্তারের কথার প্রমাণ পান কদিন পরই। ঢাকায় এসেই ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয় উর্বী। তখন রাত জেগে মেয়ের সেবা করেন বাবা।

ঢাকায় মোহাম্মদপুরে বাসা নেন তাঁরা। খুলনায় দুটি বুটিক শপ চালাতেন সীমা। সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে ঢাকায় ব্র্যাক নবধারা স্কুলে যোগ দেন। সেটাও স্বামীর উৎসাহেই। সন্তানের দেখাশোনার জন্য বাসায় উর্বীর ছোট মামাকে রেখে দেন তাঁরা। এ ছাড়া রুদ্রর বড় বোনও থাকেন মোহাম্মদপুরে। এটাও একটা ভরসার জায়গা ছিল তাঁদের। সীমার আগেই বাসায় পৌঁছতেন রুদ্র। তারপর মেয়ের খাওয়া, গোসল, কাপড় পরানোসহ সব দায়িত্ব পালন করতেন। মেয়ের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন, ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। এক বছর পর দুজনের কর্মস্থল হয় উত্তরা। সীমা নবধারা স্কুলে আর রুদ্র ওয়ালটন গ্রুপে। তখন সন্তানকে আরো ভালোভাবে দেখাশোনার জন্য উত্তরায় বাসা নেন তাঁরা। বড় ভাইয়ের সঙ্গে একই বাসায় উঠেন, যাতে উর্বী খেলাধুলার সঙ্গীসহ দেখাশোনার জন্য আরো বেশি অভিভাবক পায়। উর্বীর বয়স তত দিনে তিন বছর। তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সীমা বলেন, ‘সাধারণত প্রথম দিন সন্তান তার মায়ের সঙ্গে স্কুলে যায়। কিন্তু আমাদের মেয়ের বেলায় তা হয়নি। সেদিন ওর বাবাই ওকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি স্কুলের ইন্টারভিউ বোর্ডেও আমার পরিবর্তে রুদ্র যোগ দিয়েছিলেন।’ স্কুল শুরু হলে প্রতিদিন সকালে উর্বীকে স্কুলে দিয়ে আসতেন সীমা। আর স্কুল থেকে নিয়ে আসতেন রুদ্র। অফিসের ব্যস্ততায় মেয়েকে আনতে যাতে ভুলে না যান সে জন্য মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতেন। অফিসের লাঞ্চ টাইমে আর সব বাবা যেখানে খাওয়াদাওয়া আর খোশগল্প করে সময় পার করেন, তখন রুদ্র স্কুল থেকে মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন। এরপর মেয়ের গোসল, কাপড় পরানো, খাওয়ানো শেষে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে অফিসে ফিরতেন। কখনো কখনো ঠিকমতো নিজের খাবারটাও খেতে পারতেন না। মেয়ের জন্য এত ত্যাগ করেও তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। বললেন, ‘নিজের কোনো সময় ছিল না। তা নিয়ে আমার কোনো আফসোসও ছিল না। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার সন্তান অন্য সবার থেকে একটু যেন আলাদা হয়ে বেড়ে উঠছে। ওর বয়সী আরেকটা মেয়ে যেভাবে খেলছে, হাসছে, কথা বলছে উর্বী সে রকম করছে না। এটা নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম। এর পরই মনে হলো ওকে আমাদের পর্যাপ্ত সঙ্গ দেওয়া হচ্ছে না। সীমারও চাকরি ছেড়ে দেওয়ার উপায় ছিল না। কারণ তত দিনে ব্র্যাক নবধারা স্কুল কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অতগুলো ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব ও একাই কাঁধে তুলে নেয়। ফলে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে আমি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’

এর পরই যেন ঝলমলে শৈশবের স্বাদ পেতে শুরু করে উর্বী। মেয়েকে নিয়ে বাসার বাইরে ঘুরে বেড়ানো, দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, বাইরের পরিবেশে খেলাধুলা, ছুটির দিনে আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে নিয়ে যাওয়া শুরু করেন তিনি। মেয়েকে গল্প বলা, ছবি আঁকা শেখানো শুরু করেন। দ্রুতই আর সব স্বাভাবিক শিশুর মতো আচরণ করতে শুরু করে উর্বী। বিষয়টা আরো বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে এডুকেশন অ্যান্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ শুরু করেন রুদ্র। এখন এ বিষয়ক দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষাকে ডিজিটালাইজেশন করতেও কাজ করছেন একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। গত বছর ভ্যালেনটাইনসে বাবার সঙ্গে গেঞ্জি ডিজাইন করে মাকে চমকে দিয়েছে উর্বী। এখন তাদের তিনজনের হাসি-খুশি পরিবার। এ জন্য ৭০ শতাংশ অবদান রুদ্রর বলে স্বীকৃতি দিলেন সীমা। কিন্তু তা মানতে চাইলেন না এই সুপারড্যাড, বললেন, ‘সন্তান একটি গাছের চারার মতো। মা-বাবা দুজনের যত্ন আর ভালোবাসায় ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে কাউকে না কাউকে তো একটু বেশি দায়িত্ব পালন করতেই হয়। আমাদের দুজনের সমান যত্নেই সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে উর্বী।’

মন্তব্য