kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

অন্য কোনোখানে

রাখাইনপাড়া মানিকপুরে...

শিমুল খালেদ   

১৭ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাখাইনপাড়া মানিকপুরে...

এক পশলা বৃষ্টির পর ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল মাতামুহুরী। পড়ন্ত দুপুরে মাতামুহুরীর দুকূলজুড়ে রং আর জৈবিক চাঞ্চল্যের ছড়াছড়ি। নদীর জল সবুজ, দুই কূলের রং সবুজ। তাদের সঙ্গ দিতেই যেন নদীর ওপর নেমে এসেছে সাদা পেজা তুলার মতো মেঘদলের সঙ্গে আকাশের অবারিত নীল। একদল ছেলে নদীর পারে গাছতলায় মাটিতে চারকোনা ঘর এঁকে নুড়িপাথর দিয়ে কী যেন খেলছিল। আমাদের দেখে মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ হেসে লুটোপুটি খেল ওরা, তারপর একছুটে ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীতে!

ভ্রমণসঙ্গী জুয়েলের বাড়ি কক্সবাজারের মানিকপুর গ্রামে। চকরিয়া থেকে পাহাড়ি পথের চড়াই-উতরাই মাড়িয়ে আমাদের বাহন ওদের বাড়িতে নামিয়ে দেওয়ার সময় সবে দুপুর গড়িয়েছে। বিশ্রাম আর উদরপূর্তি পর্ব শেষ করে বেরিয়ে পড়ি গ্রাম দেখতে। এক পাশে চুনতি-হারবাং পাহাড়শ্রেণি, আরেক পাশে বহতা মাতামুহুরী নদী রেখে মধ্যখানে ছবির মতো সুন্দর গ্রাম মানিকপুর। নদীতীরের পাশ ধরে গ্রামের মেঠোপথ। কয়েক কদম হেঁটে পথের বাঁক পার হওয়ার পর প্রাচীন এক মসজিদ দেখে দাঁড়াই। হারানো দিনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি দৃষ্টিনন্দন এক স্থাপনা। জুয়েল বলল, এই মসজিদের নাম তিন গম্বুজ মসজিদ। তিনটি গম্বুজের পাশাপাশি আছে ১২টি মিনার বা খিলান। ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলের সময় ফজল কিউক নামে স্থানীয় এক সমাজহিতৈষী ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটির নির্মাণশৈলী মোগল স্থাপত্য ধাঁচের বলে অনেকে ‘মোগল মসজিদ’ নামেও চেনে। মসজিদের একটু পরই গ্রামের হাট। বাঁশবন আর নদীতীরের মাঝে ছোট ছোট কিছু দোকান। হাটের পরপরই শুরু হয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের পাড়া বা বসতি। রাখাইনপাড়ায় পা দিতেই বদলে গেল দুই পাশের ছবি। পথের পাশ ছুঁয়ে রাখাইনদের ঘরবাড়ি। মাচার ওপর কুটিরগুলোর প্রায় পুরোটা জুড়েই কাঠের আচ্ছাদন। কুচকুচে কালো রঙের কাঠ। বাড়ির উঠান, পাড়ার পথজুড়ে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সব বয়সীদের সরব পদচারণ। পথের ধুলা উড়িয়ে শৈশবের দুরন্তপনায় মেতে উঠেছে শিশুরা। কেউ বা সাইকেল চালাচ্ছে। কাঠের গুঁড়ির শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ানো খোলা মাচার ওপর স্কুলের বই মেলে বসেছে দুই রাখাইন কিশোরী। পাড়ার ঘরবাড়ি ছেড়ে এসে সামনে পড়ল নারকেল বাগান। গাছতলায় স্তূপ করে রাখা ডাব পাহারা দিচ্ছে একটি শিশু। নারকেল বাগানের রাস্তার অপর পাশে খোলা জমি শুরু হয়ে গিয়ে থেমেছে দূরের পাহাড় সারির পাদদেশে। শুকনো মৌসুমে এখানে বাণিজ্যিকভাবে ফুল আর তামাকের চাষ হয়। তারপর আবার পাড়ার ঘরবাড়ি। উঠান লাগোয়া মাচাঘরের নিচতলায় বেত ও বাঁশ দিয়ে ফার্নিচার তৈরিতে ব্যস্ত ছিল এক রাখাইন। কর্তা তূর্যদা জুয়েলের পূর্বপরিচিত। হাসিমুখে আমাদের চেয়ার এগিয়ে দিলেন। ফালি করা বেতের টুকরা আর হাতের নানা কারিকুরি দেখে সেখান থেকে ফিরে হেঁটে চলে আসি পাড়ার প্রান্তসীমায়। মাথামুহুরী নদী এখানে অনেকটা ইংরেজি ‘ভি’ বর্ণের মতো কোণ তৈরি করে দুই পাশে চলে গেছে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি কোণের দুই বাহুর ভেতর। নদীর অপর পারে পানির কিনারা ছুঁয়ে পাহাড় উঠে গেছে পাথরের খাড়া দেয়াল নিয়ে। এইপারে বালুচর। চরের বালুতে লতানো ঝোপের বুনোকলমি আর নলখাগড়ার ঝোপ। একদল রাখাইন আর বাঙালি কিশোর মিলেমিশে চরে ফুটবল নিয়ে মেতেছে। পরের গন্তব্য রাখাইনপাড়ার পাশের এক লিচু বাগান। অনেক আগে সেই শাবানা-ববিতার যুগে এখানে নাকি কোনো এক ছায়াছবির শুটিং হয়েছিল। লিচু বাগানটির তাই বেশ নামডাক। থরে থরে সাজানো লিচুগাছের সারি। বাগানের ভেতরে লম্বা ঘাসের ফাঁকে পিচ্ছিল পথে পা ফেলতে হলো সাবধানে। লিচুপাতার ঘন বুনটের ভেতর চোখে পড়ে পাখির বাসা। বাগানের পাশে নদীর পার ধরে দাঁড়িয়ে আছে সুপারিগাছের সারি। চরের বালুতে পড়েছে তাদের লম্বাটে ছায়া। নদীর পারে জমেছে থকথকে পলিমাটির স্তর। নদী পেরিয়ে ওই পাশে বেশ উঁচু এক পাহাড়ের চূড়া। লিচু বাগানের পর চোখে পড়ে আবারও পাড়ার ঘরবাড়ি। রাখাইনপাড়ার শেষ প্রান্ত। পাড়ার এই দিকটি বেশ নিরিবিলি। তকতকে পরিচ্ছন্ন উঠানের পাশজুড়ে কাঠের সব কুটির। প্রবীণ এক রাখাইন মহিলা পাকা তেঁতুল রোদে শুকাতে দিয়েছেন। তাঁর কাছে গেলে হাসিমুখে এক ছড়া তেঁতুল হাতে তুলে দেন। হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ঘুরেফিরে চলে আসি পাড়ার শেষ মাথায়। বারান্দায় বসে খেলাধুলার ফাঁকে আমাদের দিকে তাকিয়ে একদল রাখাইন শিশু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে আর হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে! রাখাইনপাড়ার পর উঁচু পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়ার ওপর উঠে গেছে পাকা সিঁড়ি। ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম চূড়ায়। বৌদ্ধ বিহার বা কেয়াং দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের ওপর। রাখাইন ঐতিহ্যের শৈলীতে গড়ে ওঠা কেয়াং বানানো হয়েছে কালো কাঠ দিয়ে। কেয়াংয়ের উঠানে দেখা হয়ে গেল একজন ভিক্ষুর সঙ্গে। সেখান থেকে খানিক দূরে উঠানের শেষ মাথায় পাহাড়ের ঢালের ওপর সিংহদ্বারবিশিষ্ট জাদি বা প্যাগোডা। প্রবেশপথের দুই দ্বারে সোনালি রঙের এক জোড়া সিংহের ভাস্কর্য। জাদির ভেতরে ছোট-বড় এক জোড়া সুচালো স্তম্ভের রংও সোনালি। পাশেই বসার জন্য বেঞ্চ। জাদির পাশে গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে চোখে পড়ে দূরে অনেক নিচে বন-পাহাড়ের মাঝ দিয়ে স্রোতস্বিনী মাতামুহুরীর বয়ে চলা। কেয়াংয়ের পাহাড় থেকে ফেরার পথে সন্ধ্যা নেমে এলো।

 

কিভাবে যাবেন

চকরিয়া বাজার থেকে মানিকপুরের রাখাইনপাড়ায় যাওয়ার সহজলভ্য বাহন সিএনজি অটোরিকশা। সেখানে থাকা-খাওয়ার ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী বিরক্ত হয় এবং পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কিছু না করার বিষয়ে সচেতন থাকবেন।

 

মন্তব্য