kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

একা একা

সবার জীবনেই কখনো কখনো নিঃসঙ্গতা আসে কালো মেঘ হয়ে। সেই মেঘ কেটে আসে রোদ্দুর। দীর্ঘ সময় নিঃসঙ্গতায় আটকে পড়লে কিন্তু বিপত্তি। লিখেছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানজির আহমেদ তুষার

১৭ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



একা একা

মডেল : তুষ্টি ও তাঁর বর ফামি, ছবি : কাকলী প্রধান

আমরা প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময় নিঃসঙ্গ বোধ করি। যেমন রাতের খাবার খাওয়ার সময় কিংবা বেড়াতে যাওয়ার সময়। এই সাময়িক নিঃসঙ্গতা মন্দ নয়। কিন্তু এটা যদি সব সময় চলতে থাকে তাহলেই মুশকিল। বিষণ্নতা ও হতাশা জেঁকে বসে। জেনে নিন নিঃসঙ্গতার কারণ, প্রভাব এবং কিভাবে নিঃসঙ্গতা থেকে বের হতে পারেন।

আশপাশে কেউ না থাকা আর নিঃসঙ্গতার অনুভূতি এক নয়। অনেক সময় একা থাকলেও নিঃসঙ্গতার অনুভূতি আসে না। আবার সবার মাঝে থেকেও নিজেকে বড্ড একা লাগে। কখনো প্রিয়জন পাশে থাকার পরেও এমন হয়। সুতরাং নিঃসঙ্গতা হলো মানুষের নিতান্তই ব্যক্তিগত একটি অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা। আমি যদি নিঃসঙ্গতা অনুভব করি, তবেই আমি নিঃসঙ্গ। ইউরোপের ৬০ শতাংশ এবং আমেরিকার ৪৬ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্কের মধ্যে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ওপর এ বিষয়ে তেমন কোনো গবেষণা না হলেও অন্তত এটুকু বলা যায় যে প্রযুক্তি ও কর্মব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নিঃসঙ্গতার হার বাড়ছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের বাস্তব যোগাযোগের প্রবণতা কমেছে, বেড়েছে যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ। আর তাই যন্ত্র বা ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাময়িকভাবে হলেও আমরা বড় নিঃসঙ্গ অনুভব করি, কেমন যেন খালি খালি লাগে।

নিঃসঙ্গতার প্রভাব

নিঃসঙ্গতা আমাদের শরীর ও মনে বাজে প্রভাব ফেলে। তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যাওয়া, ক্যান্সার, আলঝেইমারস রোগ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো নানা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। বলা হয় দৈনিক এক প্যাকেট সিগারেট খেলে যে ক্ষতি হয়, নিঃসঙ্গতা তারচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। বিষণ্ন মনের মানুষ সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে। শারীরিক বা অবাচনিক ভাষা সম্পর্কে আমাদের ব্রেন ভুল তথ্য দিতে থাকে। তখন মানুষের প্রতি বিশ্বাস কমে যায়, সবাইকে শত্রু ভাবি এবং খারাপ ব্যবহার করতে থাকি। ফলে কাছের মানুষদের কাছ থেকেও মানুষ আরো দূরে চলে যায়। ফলাফল নিঃসঙ্গতার দুষ্ট চক্র।

নিঃসঙ্গতার উত্স

আমাদের দেহ-মনের অনেক ক্ষুধার মতো আরো একটি ক্ষুধা হলো সংযুক্ত থাকার ইচ্ছা। সামাজিকভাবে মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তাই নিঃসঙ্গতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। বহু বছর আগে বেঁচে থাকতে হলে সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হতো। তখন কেউ দলছিন্ন হলে সে বন্য প্রাণীর হাতে কিংবা শিকার করতে না পেরে খাদ্যাভাবে মারা যেত। তখন থেকেই আমাদের জিনের মধ্যে সমাজে যুক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাচীনকালে দলের মানুষেরা গ্রহণ না করলে কেউ দলে থাকতে পারত না। তাই মানুষকে জানতে হয়েছে দলের মানুষেরা তাকে নিয়ে কী ভাবছে। দল যদি ভালোভাবে না দেখে, তবে সেটি তার বেঁচে থাকার প্রতি বিরাট একটি হুমকি। তাই আজও আমাদের যদি মনে হয় আশপাশের মানুষ আমাদের ভালো চোখে দেখছে না, তবে মস্তিষ্কে অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এই অনুভূতিটিই হলো হাজার বছর পুরনো নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়ার ভয়। এই ভয় থেকেই আমরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকি এবং সহযোগিতা করি। আর সংযুক্ত না থাকতে পারলেই নিঃসঙ্গতা অনুভব করি।

ভালোবাসার মানুষ কাছে না থাকলে মানুষের মধ্যে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি আসতে পারে। কারণ সারাক্ষণ শুধু তাকেই কাছে পেতে ইচ্ছা করে। এই কাছে পাওয়ার ইচ্ছা কামনা-বাসনার জন্য নয়; বরং আবেগীয়। ভালোবাসার মানুষ যখন দূর কর্মক্ষেত্রে, তখন তার অনুপস্থিতি অন্য সঙ্গীকে নিঃসঙ্গতার দংশনে কুরে কুরে খেতে থাকে।

আরো কিছু বিষয় আমাদের নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়—

♦    অনেকে নিজের সফলতার জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা করে। এ কারণে পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবরা তাকে ছাড়াই জগত্ তৈরি করে। সে তখন নিঃসঙ্গ বোধ করে।

♦    কিভাবে কথা বলব, কে কী মনে করবে এজাতীয় ভয়-লজ্জার কারণে অনেকে সবার কাছ থেকে দূরে থাকতে থাকতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।

♦    নিজের কোনো ঘাটতি প্রকাশিত হওয়ার ভয়ে অনেকে একা থাকেন। যেমন : আর্থিক সমস্যা, শারীরিক গঠন, সৌন্দর্য ইত্যাদি কারণে অনেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করেন।

♦    ইগো ও ব্যক্তিত্বের পার্থক্য কিংবা ভিন্ন দর্শন ও মতাদর্শের কারণে অন্য মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন না। অনেক সময় চিন্তা-চেতনায় না মেলার ফলে কথা বলতে অসুবিধা হয়। তখন সবার কাছ থেকে দূরে থাকেন।

♦    বিভিন্ন মানসিক রোগের ক্ষেত্রে অনেকের কথা বলার ইচ্ছাই থাকে না। ফলে নিঃসঙ্গতা বেড়ে যায়।

♦    অন্যের স্বাভাবিক বা নিরপেক্ষ মুখভঙ্গি বা কথা বলার ভঙ্গিকে তার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ হিসেবে ভুলভাবে প্রত্যক্ষ করেন। ফলে অন্যদের ভুল বুঝে দূরে সরে যান। তখন তিনি নিজেকে খুবই একা দেখতে পান।

♦    কিছু বাস্তব পরিস্থিতি আমাদের সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদি নিঃসঙ্গতায় ফেলতে পারে। যেমন : বিদেশ ভ্রমণ, নতুন স্কুল বা কর্মক্ষেত্র, জোরপূর্বক বিয়ে, মা-বাবার মধ্যে অমিল, ঝগড়া, বিচ্ছেদ, সম্পর্কের চর্চার অভাব, একে অন্যকে সম্মান না দেওয়া ইত্যাদি।

ঝেড়ে ফেলুন নিঃসঙ্গতা

আপনার নিঃসঙ্গতার কারণগুলো অনুসন্ধান করুন এবং কারণগুলো দূর করুন। মনে রাখবেন নিঃসঙ্গতা নিঃসঙ্গতাকে বাড়িয়ে তোলে। নিঃসঙ্গতার দুষ্ট চক্র থেকে বের হতে এমন কিছু কাজ করতে পারেন। 

♦    সবার সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন (ইচ্ছা না করলেও, এখানে হার-জিতের কিছু নেই)।

♦    মন ভালো না থাকলেও সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলুন ও তাদের খোঁজখবর নিন। মানুষ হাসিমুখ দেখতে পছন্দ করে।

♦    নিজের কোনো বিষয়কে জাহির করে কোনো কথা বলার দরকার নেই এবং কাউকে ছোট করে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।

♦    আপনার সঙ্গীর সঙ্গে প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে বাক্যালাপ করুন।

♦    নিজের পরিবারের সঙ্গে সময় ‘বিনিয়োগ’ করুন। বৃহত্তর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলুন। সম্ভব হলে নিজের পরিবার নিয়ে অন্য পরিবারের বাসায় বেড়াতে যান।

♦    পুরনো ও নতুন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাদের সঙ্গে দেখা করুন, পারলে আড্ডার ব্যবস্থা করুন।

♦    নিজের কাজের প্রয়োজনে যাদের সঙ্গে দেখা করা যায়, তাদের সঙ্গে দেখা করুন।

♦    আশপাশের পরিবার ও অন্যান্য মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক ও সৌজন্যমূলক কথা বলুন।

♦    প্রতিবেশী কিংবা অন্য মানুষদের সঙ্গে খেলাধুলা করার সুযোগ থাকলে তা গ্রহণ করুন।

♦    সৃজনশীল ও সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন।

মন্তব্য