kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

কাজের মানুষ

অধস্তনদের মিথ্যা আশ্বাস

৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অধস্তনদের মিথ্যা আশ্বাস

সৈয়দ আখতারুজ্জামান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিয়ন্ড ইনস্টিটিউট অব ট্রেনিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক লেখক ও প্রশিক্ষক

উদ্দীপ্ত আর প্রাণবন্ত কর্মী ছাড়া প্রতিষ্ঠান অচল। যেখানে মনের সংযোগ নেই, শারীরিক শক্তি সেখানে খুব কমই কার্যকর। কিন্তু কর্মীদের উদ্দীপ্ত করতে গিয়ে কখনো কখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজের মনের মতো বাক্য প্রয়োগ করে উত্সাহ দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিজ্ঞা আর বাস্তবতার মুখ দেখে না। যা প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলকর নয়। দলের সদস্য, কর্মী, কর্মকর্তাদের সঠিক উপায়ে উদ্দীপ্ত করার জন্য রইল দশ পরামর্শ।

 

এক.

আপনি একজন দলনেতা বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সুতরাং অনুসারীরা আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করছেন। আপনার প্রতিটি কথা, কাজ, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত ও মানবিক গুণাগুণ—সব কিছুই অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে আপনি যা বলছেন, তা ভুলে গেলেও অনুসারীরা ঠিকই মনে রাখছেন। আপনার বলা কথা, আদেশ, নির্দেশনা, পরামর্শ—এসব ঘিরেই কিন্তু তাঁদের কার্যক্রম, পদচারণ ও স্বপ্ন দেখা। সুতরাং মিথ্যা আশ্বাস কৌশলী বাক্যের মোড়কে কখনোই পরিবেশন করবেন না।

 

দুই.

অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আছেন, যাঁরা পরিস্থিতি সামলাতে পারদর্শী। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েও যথাসময়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। কিন্তু এখানেও মনে রাখা দরকার, দলনেতা হিসেবে আপনি যা করলেন সেটা শুধু ভুল নয়, রীতিমতো অন্যায়। মিথ্যা আশ্বাস বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত সমাধান আনলেও ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের চলার পথে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

 

তিন.

দলের সদস্যদের প্রতি যদি আপনার আস্থা থাকে, তাহলে আসল কথা খুলে বলুন। তাঁদের সাহায্য চান। মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আসলে পরিস্থিতির যথাযথ বিশ্লেষণই আপনাকে পথ দেখাবে। কৌশলী হোন কিন্তু তা যেন একতরফা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট না হয়। কেননা কর্মীরাও প্রতিষ্ঠানের অংশ। তাঁদের ভালো-মন্দ দেখতে পারার যোগ্যতাও আপনার দক্ষতার মাপকাঠি।

 

চার. 

দলের দক্ষ ও যোগ্য সদস্যদের ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করুন। আর যেসব সদস্য খাদের কিনারে আছেন, যাঁরা বিপজ্জনক অবস্থানে আছেন, তাঁদের এগিয়ে আনতে বিশেষ ব্যবস্থা নিন।

 

পাঁচ.

ব্যবস্থাপনার সিঁড়ির মাঝখানে থেকে ওপরের দলনেতা বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামলানো রীতিমতো পেশাদার রাজনীতিকের কাজ। আর দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। নিজের অনুসারী বা অধস্তন সহকর্মীদেরও আছে নানা চাহিদা। আপনি জানেন, এই চাহিদা যুক্তিসংগত অথচ কিছুই করার নেই। এ অবস্থায় আপনাকে মাঝখানে দাঁড়িয়ে সামলাতে হবে উভয় পক্ষকেই। এটা সত্যিই কঠিন কাজ। পরামর্শ হলো, এ দুই পক্ষের ভেতর সমন্বয় করা।

 

ছয়.

দলের সদস্যদের মোটিভেটেড রাখার অনেক উপায় আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে, নিজের অবস্থান ও ব্যক্তিত্ব ধরে রেখে আসল দলনেতার মতো তাঁদের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করা। সমস্যার সমাধান করতে পারলেন কি না তা বড় কথা নয়; আপনি তাঁদের চাহিদা মেটাতে চেষ্টা করেন, এটাই বড় ব্যাপার। কোনো কোনো বসের কাছে তো সমস্যার কথা বলাই যায় না। আপনি তাঁদের চেয়ে ব্যতিক্রম হবেন। আপনার দরজা সবার জন্য সব সময় খোলা থাকবে। এমন সহজ সহজ আরো অনেক উপায় আছে।

 

সাত.

দলনেতা হিসেবে সবচেয়ে বড় ভুলটি করবেন সেদিন, যেদিন মনে করবেন অধস্তন সহকর্মীরা ওপরের (ম্যানেজমেন্টের) পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুই বোঝে না। অনুগত অনুসারীরা প্রকৃতিগত কারণেই কম কথা বলে। অনুসরণ আর কাজ করে বেশি। তাঁরা দিন শেষে শুধু একটা জিনিসই চান—আপনি পিঠ চাপড়ে বলুন, ইউ আর গ্রেট। সুতরাং আপনি যদি আদর্শ দলনেতা হয়ে থাকেন, তাহলে দলকে মোটিভেটেড রাখতে অলীক আশ্বাস কখনোই দিতে হবে না।

আট. 

দলের সদস্যকে মোটিভেট করার সবচেয়ে কৌশলী ও কম খরচের পথ হচ্ছে শাস্তি থেকে বাঁচানো। অনেক বুদ্ধিমান বস দলের অবাধ্য সদস্যকে শায়েস্তা করতে ইচ্ছা করে তাঁকে ফাঁদে ফেলেন। কিছুদিন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে রাখেন, তারপর হঠাত্ একদিন নিজেই তাঁকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করেন। আপনি তখনই এই অনুচ্চারিত, অলিখিত এবং শাশ্বত ব্যবস্থাপনার কৌশলগুলো কাজে লাগাতে পারবেন, যখন দলের ওপর আপনার পূর্ণ মানসিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। তার আগে নয়।

 

নয়.

অন্যায় বা ভুলের যেমন শাস্তির বিধান আছে, তেমনি ভালো কর্মীর পুরস্কারও আছে। যাঁর যাঁর পাওনা তাঁকে বুঝিয়ে দিতে সঠিক সময় ও স্থান নির্বাচন করুন। এতে আপনার উদ্দেশ্য অনেক সফলভাবে বাস্তবায়ন হবে। বিভাগীয় মাসিক বা সাপ্তাহিক সভাও একটি সঠিক স্থান হতে পারে।

 

দশ.

যদি কখনো নিরুপায় হয়ে মিথ্যা আশ্বাস দিতেও হয়, তাহলে ভাবুন, কত কম ক্ষতি করে সত্যের কত

কাছাকাছি থেকে বলা যায়। আর লিখে রাখুন পুরো বিষয়টি। এর পর থেকে প্রতিদিন ভাবতে থাকুন, কোনো উপায়ে এই মিথ্যাটাকে সত্যি বানানো যায় কি না। এমন অনেক পরিস্থিতি আসে, যখন প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে দলের সবাইকে সব কিছু জানানো যায় না। ওপর থেকে নিষেধ থাকে। তখন আপনাকে সবচেয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

মন্তব্য