kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

অন্য কোনোখানে

খাসিয়াপুঞ্জির পথে

শিমুল খালেদ

৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খাসিয়াপুঞ্জির পথে

ভাপসা গরমে শাহবাজপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের লাইব্রেরি ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে ঘামছিলাম। অপেক্ষার পালা শেষ হল শিবুদার বাইকের হর্নে। শিবুদা আর আমার একসঙ্গে বেড়ানো এবারই প্রথম। আগের দিন ফোনে আলাপ সেরেছিলাম, সেই সূত্রে আজ বেরিয়ে পড়া। যাব দূর পাহাড়ের সীমান্ত জনপদ পাল্লাতল খাসিয়াপুঞ্জি। বড়লেখার দিকে যাওয়া সড়ক থেকে বাঁয়ে মোড় নিয়ে সরু পথ। এক পাশে গাছপালায় ঘেরা পাহাড়, আরেক পাশে জলার ঘাসবন। পথের পাশে পামবাগান দেখে থামলাম। পামগাছের কাণ্ড থেকে উঁকি দিচ্ছে গুচ্ছফুল। অনেকটা কেয়াফুলের মতো। বাগানের পাশে পড়ে থাকা একটি সেতুর ধ্বংসাবশেষ। বুড়াগুল নামের এই সেতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর স্থানীয় ক্যাম্প ছিল শাহবাজপুর। তাদের অস্ত্রের মজুদ ছিল এখানে। সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান রুখে দিতে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা চালিয়েছিল সেতুর ওপর। পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী তখন ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর ওপর কাঠের তক্তা ফেলে পার হতো। যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানি সেনারা সেতুটি পুরোপুরি ধ্বংস করে, যাতে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ধাওয়া করতে না পারে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন পেরিয়ে আসতেই সামনে অহিদাবাদ চা বাগান। দুপুরবেলা ঘেমে-নেয়ে চা পাতা সংগ্রহ করছে নারী চা শ্রমিকরা। কাজের ফাঁকে কেউ জিরিয়ে নিচ্ছে ছাউনিতে। চা বাগানের পর পাহাড় কেটে বানানো পথ। ঢালু পথ ধরে আচমকা মোড় নিয়ে নেমে চোখে পড়ল রাবার বাগান। আঁকাবাঁকা পথের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে খাসিয়াপুঞ্জি দেখে থামলাম। বেরেঙ্গাপুঞ্জি বড় এক পাহাড়ের চূড়ায়। বাইক থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দাঁড়াই। মনে পড়ে ফেলে আসা স্মৃতি। সতেরো বছর আগে সাইক্লিং করে স্কুলপড়ুয়া তিন কিশোর এসেছিলাম। বন্ধু ফরহাদ আর মসকুরের সঙ্গে সেদিন সাইকেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলাম। ফেরার পথে মুড়িয়া হাওরে ঝড়ের কবলে পড়েছিলাম।

বেরেঙ্গাপুঞ্জির পর চোখে পড়ল পাহাড়ের গায়ে জংলি কাশের ঝোপ। এই কাশের বেশ কদর। এর ফুল থেকে বানানো হয় ফুলঝাড়ু। স্থানীয় নাম—টালির ফুরোইন। পাহাড়ের ওপরে উঠে যাওয়া পথের পাশে পাহাড়ি ঝিরি। পথ আর ঝিরির মাঝে ঝোপ-জঙ্গলের ঠাসবুনোট। ঝিরিতে নামতে বেশ বেগ পেতে হলো। স্বচ্ছ পানির স্রোত নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে। পানির তলায় পচা কাঠের নিচ থেকে কুচকুচে কালো কিছু একটা বেরিয়ে এলো। এ যে বড়সড় একটি চিংড়ি! একটু পর পাথরের খাঁজ থেকে বেরিয়ে আসে আরো কয়েকটি চিংড়ি। কালো আর লাল রঙের চিংড়িগুলোর মাথায় শিকার ধরার জন্য কাঁকড়ার মতো ধারালো চঞ্চু।

ঝিরি থেকে ফিরে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে নেমে এসে সামনে পাল্লাতল চা কারখানার প্রবেশপথ। কারখানার কর্মকর্তা অঞ্জনদা। তিনি শিবুদার পরিচিত। চা-বিস্কুটের আতিথেয়তার পর আমরা ঘুরে দেখতে থাকি।

পাল্লাতল চা কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। কারখানার নিমার্ণশৈলীতে ব্রিটিশ ছাপ এখনো বিদ্যমান। ভেতরে চা পাতা গুঁড়া করার কাজ চলছে। গুঁড়া চা পাতার বস্তা স্তূপ করে রাখা। বাতাসে চায়ের গুঁড়ার ঘ্রাণ।

কারখানা থেকে বিদায় নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। একটু পরই পাল্লাতল খাসিয়াপুঞ্জি। পুঞ্জির টিলার নিচে একটি মিশনারি স্কুল। পাকা সিঁড়ি খাড়া পথ উঠে গেছে পাহাড়ের চূড়ায়। চূড়ার মাথায় পুঞ্জি। ভেতরে উঁচু-নিচু পথ। মাটির দেয়াল আর টিনের চালার কুটির। তবে মাচাঘর নেই কোথাও! সব ঘরের ভিত্তি মাটির ওপর। এ রকমই একটি ঘর থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন এক খাসিয়া তরুণী। নাম অ্যাঞ্জেলিনা। শিবুদার পরিচিত। আমাদের বসতে দিয়ে জুমের পান-সুপারির থালা বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর সংসার চলে এই পান-সুপারি বিক্রি করে। স্বামীসহ পানজুমে কাজ করেন। সীমান্ত বিনিময় চুক্তির ফলে তাঁর চারটি পানজুমই ভারত সীমানায় চলে গেছে। তবে চুক্তির শর্ত মোতাবেক সীমান্তের ওপারে হলেও পানচাষে সমস্যা হয় না। ফেরার পথে পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা পাকা পেয়ারা দেখে লোভ হলো। ঝোপের কাছেই একটা শুকনো বাঁশের লাঠি। তার সঙ্গে বুনোলতা দিয়ে আংটার মতো বানিয়ে চললো পেয়ারা পাড়ার প্রচেষ্টা। কসরত করে কয়েকটা পেয়ারা পাড়লাম কিন্তু সেগুলো পড়ল টিলার ঢালের নিচে ঝোপজঙ্গলের ভেতর। নেমে আসার পথে দেখি দুই হাতের মুঠোয় ঝোপের ভেতর পড়া পেয়ারাগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন বালিকা। নাম থেইচেন। অ্যাঞ্জেলিনা দিদির মেয়ে। ক্লাস ওয়ান পড়ুয়া থেইচেন আমাদের নিয়ে পুঞ্জিতে ঘুরল।

পুঞ্জি থেকে নেমে এবড়োখেবড়ো পথে কিছুদূর গিয়ে সামনে পড়ে বেশ বড় এক পাহাড়। সেই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে কেটে বানানো খাড়া এক ফালি পথ। মাত্র কয়েক ফুট চওড়া। পথের ওপরে খাড়া দেয়াল পেরিয়ে পাহাড়ের চূড়া গাছপালা আর জংলি লতা দুদিক থেকে ঢেকে দিয়েছে। সেই বুনোট ভেদ করে সূর্যের আলো মাটিতে পড়ে না। পাহাড়ের ভেতরে ক্রমেই ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পথটি অনেকটা সুড়ঙ্গের মতো হয়ে গেছে। সুড়ঙ্গ পথ থেকে বেরিয়ে দেখা হয় খাসিয়া সম্প্রদায়ের দুজনের সঙ্গে—কুবিনাল আর সূর্য। পাহাড়ে পানের বরজে কাজ সেরে পাড়ায় ফিরছে। টুকটাক গল্প আর ছবি তোলার পর ফেরার পথে পাড়ায় পান খাওয়ার নিমন্ত্রন জানায়। পরের পথটুকু নির্জন। পাহাড়ের বাঁক ঘুরে আবার চা বাগান। যত দূর চোখ যায় একই দৃশ্য।

ক্ষান্ত দিই আমরা। ফেরার পথে অহিদাবাদ চা কারখানায় ঢু মারলাম। কারখানার উঠানজুড়ে তুলে আনা কাঁচা চা পাতার স্তূপ। প্রক্রিয়াজাত করার জন্য সেখান থেকে শ্রমিকরা ট্রলিতে করে নিয়ে যাচ্ছে শেডের ভেতর। কথা হয় একজন টিলা বাবুর সঙ্গে। কারখানা, চা আর বাগান সম্পর্কে জানতে পারি অনেক কিছু।

 

কিভাবে যাবেন

পাল্লাতল যেতে প্রথমে আসতে হবে বড়লেখায়। বড়লেখা বা শাহবাজপুর বাজার থেকে পাল্লাতল চা কারখানা পর্যন্ত রিজার্ভে সিএনজি অটোরিকশা পাবেন। রাতের থাকার জন্য কিছু হোটেল পাবেন বড়লেখা বাজারে।

মন্তব্য