kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

অন্য কোনোখানে

এক দিনে রাজশাহীর পাঁচ স্পট

মাহতাব হোসেন   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক দিনে রাজশাহীর পাঁচ স্পট

রোদ উঠে গেছে, বাস চলছে শাঁ শাঁ। জানালা দিয়ে আমার চোখে পড়ল মাইলস্টোন, পুঠিয়া আর মাত্র তিন কিলোমিটার।

রাজশাহী এসেছি সকালে। খুব অল্প সময়ের সফর। ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে পদ্মা এক্সপ্রেস ছাড়ে রাত সাড়ে ১১টায়। খুব ভোরে রাজশাহী স্টেশন। এক আত্মীয়ের বাসায় ঘণ্টা দুয়েক বিশ্রাম নিয়ে ভদ্রা মোড় থেকে বাসে উঠেছি। ঘুম ঘুম লাগছিল, রোদ উঠে যাওয়ায় তন্দ্রা ভাব ছুটে গেল। বাস থেকে নেমে পড়লাম। নাশতা করা দরকার। একটা রেস্তরায় পরোটা ডিমভাজি দিয়ে নাশতা সেরে পুঠিয়ার দিকে এগোতে শুরু করলাম। রিকশাভ্যান একমাত্র বাহন। জনপ্রতি পাঁচ টাকা। উঠে বসলাম দুজন। ইঞ্জিন লাগানো ভ্যান। বেশ গতিতে চলতে লাগল, ঝকঝকে আবহাওয়া, দারুণ ল্যান্ডস্কেপ। মিনিট সাতেক পরেই পুঠিয়া রাজবাড়ীর চূড়া দেখতে পেলাম। মন্দিরের বাইরের অবয়ব দেখে যতটা বিস্মিত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি হয়েছে মৌসুমী। এত চমত্কার নির্মাণশৈলী। মূল মন্দিরের ছাদ থেকে থরে থরে সজ্জিত হয়ে চূড়ায় রূপ নিয়েছে। বেশ কিছু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় মূল বেদিতে। মৌসুমী মোবাইল ক্যামেরা বের করে ওপরে উঠে গেল। চারদিকে সমান বারান্দা রেখে মাঝখানের ঘরে একটা শিবলিঙ্গ রাখা হয়েছে। এটা শিবমন্দির। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একজন বললেন, এই শিবলিঙ্গ দক্ষিণ এশিয়ার সবেচেয়ে বড়। মন্দিরের পেছন দিকে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে ঘাটে। পেছনে বিশাল দিঘি। শিবমন্দিরের পাশেই একই ধাঁচের আরেকটা মন্দির। মন্দির দর্শন শেষে রাজবাড়ীর মূল অংশে চলে এলাম। সম্প্রতি রং করা হয়েছে বাড়ির সামনের অংশ। ভেতরে ঢুকে পড়লাম। টিকিট লাগেনি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৯৫ সালে মহারানি হেমন্তকুমারী দেবী ইন্দোইউরোপীয় রীতিতে আয়তাকার দ্বিতল রাজবাড়ীটি নির্মাণ করান। ভেতরে গোবিন্দমন্দির। এটা অন্যান্য মন্দিরের চেয়ে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছে স্থাপত্যশৈলীতে। অনেকটা দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরের মতো। প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নিয়ে পুরো রাজবাড়ী এলাকা ঘুরলাম। পুঠিয়া রাজবাড়ীর আশপাশে ছয়টি রাজদিঘি আছে। প্রতিটি দিঘির আয়তন ছয় একর। মন্দির রয়েছে ছয়টি। এ ছাড়া রানির স্নানের ঘাট, অন্দরমহল মিলিয়ে বিশাল রাজবাড়ী প্রাঙ্গণ। পুঠিয়া রাজবাড়ী দর্শন শেষে চা খেতে এলাম পাশের বাজারে। জিজ্ঞেস করে নিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার ম্যাপ। যাব বাঘা শাহি মসজিদ দেখতে। ২০০৮ সালের আগস্টে রেডিও ফুর্তি গ্রামীণফোনের এক প্রতিযোগিতায় ২১টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মধ্যে বাঘা শাহি মসজিদ প্রথম স্থান অধিকার করে। ৫০ টাকার নোটে এই মসজিদ দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। ফের রিকশা ভ্যান। এবার লম্বা পথ। ইঞ্জিনচালিত রিকশা ভ্যান ৭০ টাকায় ঠিক করলাম আড়ানি বাজার পর্যন্ত। শীত শেষের রোদ মাথায় নিয়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথে এক গাঢ় আবেশ নিয়ে পৌঁছলাম আড়ানি বাজারে। সেখানে মৌসুমি পানি পানের বিরতি নিল। তার আগে গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে চার টাকা কাপের চা। এরপর সিএনজি। আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে যখন বাঘা পৌঁছিয়ে দিল, তখন প্রায় দুপুর। বাঘা মসজিদ দেখে মনেই হলো না, এটি ৫০০ বছর আগের। পাশে বিশাল দিঘি। পারে সারি সারি নারকেলগাছ। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রওনা করলাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে। সঙ্গে সঙ্গেই বাস পেয়ে গেলাম। কিছুটা ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার। হেডফোনে গান শুনতে শুনতে দুজনই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল ‘বিনোদপুর’, ‘বিনোদপুর’ চিত্কার শুনে। এখানে নামব। একটা রেস্টুরেন্টে ভাত খেলাম। রাস্তা পার হয়ে রিকশা নিয়ে চলে এলাম বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন। ম্যাপ আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম। সেখান থেকে চারুকলা, টুকিটাকি চত্বর, স্টেডিয়াম, মমতাজ উদ্দিন কলা ভবন, শাবাশ বাংলাদেশ ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৫টার পরে বের হলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরিয়ে দেখার কৃতিত্ব বন্ধুর ছোট ভাই সোহেলের। ধৈর্য নিয়ে ঘুরে দেখিয়েছে। রাজশাহীর রিকশাগুলোও চমত্কার। সব ইঞ্জিনচালিত, প্রশস্ত জায়গা। তাতেই চেপে পদ্মার পার চলে এলাম। ‘টি’ বাঁধের কাছে নৌকা দেখে চড়তে ইচ্ছে হল। অনেকেই যাতায়াত করছে। নৌকায় ১০ মিনিটের মধ্যে চরে পৌঁছে গেলাম। মৌসুমী ভয় পাচ্ছিল নৌকার কাঁপুনি দেখে। কিন্তু চরে গিয়ে তার উচ্ছ্বাস বেড়ে গেল। মনেই হলো না একটু আগে সে আতঙ্কে ত্রস্ত ছিল। মনে হচ্ছিল বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে চলে এলাম। মাইলের পর মাইল শুধু বালু আর বালু। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে ধূমকেতু এক্সপ্রেসে ঢাকার উদ্দেশে যখন চেপে বসলাম, তখন মনে হলো, বাসে করে যদি নাটোর এসে সকালে নামতাম, তাহলে রাজশাহীর আরো বেশি জায়গা দেখতে পেতাম। যদিও এই সময়ের মধ্যে দেখেছি অনেক কিছু, রাজশাহী শহর মুগ্ধ করেছে, মুগ্ধ করেছে মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন। এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর বাংলাদেশের আর কোথাও দেখিনি।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে ও ট্রেনে দুইভাবেই রাজশাহী যাওয়া যায়। সবেচেয়ে ভালো হয় রাতের ট্রেনে যাওয়া। কমলাপুর থেকে রাত ১১টা ১০ মিনিটে ছেড়ে পদ্মা এক্সপ্রেস যায় রাজশাহী। ভোরবেলায় নামিয়ে দেয়। দিনে গিয়ে দিনে ঘুরে আসতে চাইলে এই ট্রেনে যাওয়াই ভালো। যদি আরো বেশি জায়গায় ঘুরতে চান তাহলে বাসে করে নাটোরে এসে নামবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা