kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

অন্য কোনোখানে

ঝুলে-দুলে সাতছড়ি

নাফি রহমান

১১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




ঝুলে-দুলে সাতছড়ি

ঘুরতে যাব; কিন্তু হাতে বেশি পয়সা নেই। তখনই মনে পড়ল সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের কথা। ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ খুব দূরে নয়। অল্প টাকায় দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসা যায়। বন্ধুদের জানাতেই রাজি হয়ে গেল কয়েকজন। যেই কথা সেই কাজ। পরদিন বেরিয়ে পড়লাম সাতছড়ির উদ্দেশে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাজির হলাম কমলাপুর রেলস্টেশনে। এখান থেকে সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে ছেড়ে যাবে হবিগঞ্জগামী পারাবাত এক্সপ্রেস। ট্রেন ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। অথচ রাতে কথা দেওয়া সাত বন্ধুর বেশির ভাগের কোনো হদিস নেই। শেষমেশ পাওয়া গেল দুজনকে। অগত্যা তাদের নিয়েই চেপে বসলাম ট্রেনে। ট্রেনের মানুষ আর চারপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে ১০টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম নোয়াপাড়া স্টেশনে। এখানেই নামতে হবে। স্টেশনের পাশে ছোট্ট একটি বাজার। সকালে কোনো কিছু পেটে দেওয়ার সুযোগ হয়নি কারো। বাজারের একটি দোকানে নাশতা সেরে নিলাম। এখান থেকে সাতছড়ি যেতে হবে সিএনজিতে। আমাদের দেখেই বেশি ভাড়া হেঁকে বসল তারা।

বেশ কিছুক্ষণ দামাদামি করে জনপ্রতি ৪০ টাকায় আমাদের নিয়ে যেতে রাজি হলো একজন। নামিয়ে দেবে উদ্যানের গেটে। বাজার পেরোতেই সরু রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে সবুজ চা বাগান। চা বাগানের ভেতর সব কিছুতেই যেন একটু পরিচ্ছন্ন ভাব। চারপাশের এমন পরিবেশ দেখে শান্তি লাগে, চোখ জুড়িয়ে যায়। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে চলে এলাম উদ্যানের গেটে। সেখানে নেমে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছি। তখন রাস্তার বিপরীত পাশে চোখ আটকে গেল। মাটি থেকে ৩০ ফুট ওপরে গাছের সঙ্গে কাঠ ও গাছের গুঁড়ি দিয়ে সাজানো বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্ত সিঁড়ি। একেবারে সিঁড়িও বলা যায় না। কেননা সিঁড়ি যেমন আরামে পার হওয়া যায়, সে রকম কোনো ব্যবস্থা ওখানে নেই। দেখে ভয় লাগে। আবার অজানা উত্তেজনায় তাতে চেপে বসতেও মন আঁকুপাঁকু করে। দায়িত্বে থাকা একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এটা ট্রি অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটি। উঁচু গাছের গুঁড়ির সঙ্গে শক্ত দড়িতে বেঁধে পাঁচ রকমের ঝুলন্ত সিঁড়িপথ বানানো হয়েছে। এই পথে বনের মধ্য দিয়ে এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়া যায়। তাতে উদ্যানের সৌন্দর্য যেমন কাছ থেকে দেখা যায়, তেমনি আছে রোমাঞ্চকর অনুভূতির ছোঁয়া।

দেখে চড়ার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। ১০০ টাকার টিকিট কাটার পর তাঁরাই শরীরের সঙ্গে সেফটি বেল্ট বেঁধে দিলেন। মাথায় চাপিয়ে দিলেন জুতসই একটি হেলমেট। নিরাপত্তার এমন সাজ-সরঞ্জাম দেখে অমন উঁচু গাছে সিঁড়িতে চলতে বেশ খানিকটা সাহস পাওয়া যায়। মই বেয়ে উঠে গেলাম ওপরে। এরপর কখনো শুধু দড়ি দিয়ে বানানো পথ, কখনো ঝোলানো গাছের গুঁড়ির পথ। কখনো দড়িতে ঝোলানো চারকোনা কাঠের পথ। নিচে তাকাতেই একটা ভয় ভয় অনুভূতি জানান দেয় শরীরে। এই পথে একসঙ্গে কয়েকজন সওয়ার হওয়া গেলেও প্রতিটি ধাপ পার হতে হয় একা। চলার সময় শরীরের ভারসাম্যও রাখতে হয় যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে—সেফটি বেল্ট শরীরে বাঁধা বলে পড়ে যাওয়ার ভয় যদিও থাকে না, কিন্তু বন্ধুদের সামনে কে-ই বা হেরে যেতে চায়। ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একেকটি ধাপ পেরিয়ে যাওয়ার পর গাছের গুঁড়ির সঙ্গে খানিকটা প্রশস্ত জায়গা করে দেওয়া। সেখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া যায়। গাছের ঘন পাতার ফাঁকে মাটি থেকে ৪০ ফুট ওপরে, সময় তখন নেহাত মন্দ লাগে না। প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময় কখন যে পেরিয়ে গেল, টেরই পেলাম না। শেষ মাথায় রাখা নেমে যাওয়ার মইয়ের দেখা পেতেই তা টের পেলাম। তবে মাটিতে নেমে আসার পর যে স্বস্তিবোধ, সেই অনুভূতিটাও কিন্তু কম নয়। নেমেই সবাই বড় করে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললাম।  এবার বিপরীত পাশের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ঘোরার পালা। উদ্যানের বিভিন্ন গাছপালা দেখে মনটা জুড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে নির্মল বাতাসে গা জুড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ তো আছেই। উদ্যানে ঘোরা শেষে সামনে কিছুদূর এগোলেই চা বাগান। কিছুক্ষণ চা বাগানে সময় কাটিয়ে সিএনজিতে চেপে চলে এলাম শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে। এবার ঢাকায় ফেরার পালা।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালের ট্রেনে চেপে নোয়াপাড়া রেলস্টেশন। এখান থেকে সিএনজিতে করে সাতছড়ি উদ্যানের গেটে যাওয়া যায়। সিএনজিভাড়া ৪০ টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা