kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

অন্য কোনোখানে

দুর্গ দেখতে রোয়াইলবাড়ীতে

নিয়ামুল কবীর সজল

৬ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্গ দেখতে রোয়াইলবাড়ীতে

ছবি : লেখক

দুর্গ নাম শুনলেই কেমন যেন একটা রোমাঞ্চের ভাব চলে আসে মনে। পরিচিত অনেকজনের কাছেই শুনেছি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী দুর্গের নাম। যথাযথ ভ্রমণসঙ্গীর অভাবে যাওয়া হচ্ছিল না। সঙ্গী খোঁজার পাশাপাশি চলছিল স্থানীয় একজন পথপ্রদর্শকের খোঁজ। দৈবক্রমে তা পেয়েও গেলাম। ময়মনসিংহ শহরের একটি বেসরকারি বীমা কম্পানির পদস্থ কর্মকর্তা বারী ভাই কোনো এক কাজে যাবেন কেন্দুয়ায়। সুযোগ বুঝে তাঁর সঙ্গী হয়ে গেলাম।

রোয়াইলবাড়ী যাওয়ার একাধিক পথ আছে। শুরু থেকে ঠিক করে না নিলে ঝামেলা হতে পারে। একেকজন একেক কথা বলেন—এদিক দিয়ে ভালো হবে কিংবা ওদিক দিয়ে গেলে ভালো হবে। রোয়াইলবাড়ী যাওয়া যায় নেত্রকোনা-কেন্দুয়া-সাহিতপুর হয়ে। যাওয়া যাবে ময়মনসিংহ-ঈশ্বরগঞ্জ-সোহাগী-আঠারোবাড়ী-সাহিতপুর হয়ে। আরো যাওয়া যাবে ময়মনসিংহ-নান্দাইল চৌরাস্তা-আঠারোবাড়ী-সাহিতপুর হয়েও। এমনকি গৌরীপুর উপজেলা দিয়েও ওখানে যাওয়া যায়। এত সব ঝামেলায় না গিয়ে ফোন দিলাম কেন্দুয়ার সাংবাদিক ছোট ভাই এম এস কামালকে। একসময়ের সহকর্মী কামালই ওখানে যাওয়ার পথ বাতলে দিল। তাঁর কথা মতো সিদ্ধান্ত নিলাম, নান্দাইল চৌরাস্তা হয়ে আঠারোবাড়ী দিয়ে সাহিতপুর হয়েই যাব রোয়াইলবাড়ী। এখানে বলে রাখি, দেশের জননন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাড়িও রোয়াইলবাড়ীর কাছাকাছি।

কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রোয়াইলবাড়ী। আবার নান্দাইল চৌরাস্তা থেকে ১৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে কেন্দুয়া-আঠারোবাড়ী সড়কে সাহিতপুর বাজার। সাহিতপুর বাজার থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রোয়াইলবাড়ী দুর্গ অবস্থিত।

সাহিতপুর বাজার থেকে সরু পাকা সড়ক চলে গেছে রোয়াইলবাড়ী বাজার পর্যন্ত। সড়কের দুই ধারে সবুজের সমারোহ। দিগন্তবিস্তৃত ধানি জমি। সবুজের মধ্য দিয়েই পথ চলা। গ্রামের পথ। তাই চোখে পড়ল পথের ধারের বাঁশঝাড়, ছোট পুকুর, গরু-ছাগলের ঘাস খাওয়া, গৃহস্থদের ছোট-বড় বাড়ি, গৃহিণীদের গৃহস্থালি কাজ। পাকা রাস্তা রোয়াইলবাড়ী বাজারেই শেষ। এরপর একেবারে অজপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায়, সেই গ্রামের মেঠোপথের পথিক হলাম আমরা।

প্রায় এক কিলোমিটার মাটির সড়ক ধরে এগোতেই চোখে পড়ল সেই ঐতিহাসিক রোয়াইলবাড়ী দুর্গ। তবে দুর্গের দিকে এগোলে যা দৃষ্টিতে আসবেই তা হলো বিশাল আকারের দুটি পাশাপাশি পুকুর। দুর্গটির ঠিক উল্টো পাশেই। এমন বিশাল আকারের পুকুরের সন্ধান এখন সহজে পাওয়া কঠিন। পুকুরগুলোর পাড় ঘেঁষে মাটির সড়ক। সড়ক ছুঁয়েই দুর্গটি। দুর্গ প্রথম দেখার পরই যে কারো মন স্মৃতির ডানায় ভর করে চলে যাবে সেই মধ্যযুগে, সেই রাজা-বাদশাদের সময়ে। মনে হবে যেন চোখের সামনেই সৈন্যদল আর তাদের ঘোড়ারা উপস্থিত।

দুর্গটি আকারে খুব বড় নয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ভাষ্যমতে, দুর্গের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৫৩৩.২৩ মিটার। পূর্ব-পশ্চিমে ৩২৭.৫৭ মিটার। খোলা আকাশ আর চারদিকের সীমানাদেয়াল নিয়ে দুর্গটি। দুর্গের মাঝখানে পাথরের কয়েকটি পিলার। এর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, শত বছরের অনাদরে আর লোকজনের লোভে পড়ে এর অনেক কিছুই এখন লুপ্তপ্রায়। দুর্গের প্রাচীরগুলোর পুরুত্ব অস্বাভাবিক রকমের মোটা কয়েক হাত হবে। শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্যই হয়তো এমন ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যন্ত পল্লীর এ দুর্গের খবর অনেকে জানলেও যাদের জানার কথা, অর্থাত্ সরকার বা প্রশাসনের আগ্রহ অথবা নজরের আড়ালেই ছিল এটি। তবে সাংবাদিক বন্ধু কামাল জানালেন, বর্তমান সরকার ও জেলা প্রশাসন ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি রক্ষায় এখন খুবই তত্পর ও সক্রিয়। কর্তৃপক্ষের আসা-যাওয়াও আছে নিয়মিত। গত এপ্রিল মাসেও এখানে খননকাজ চলে। উদ্ধার হয় মাটিচাপা পড়ে থাকা অনেক আলংকারিক পাথর, আলংকারিক ইট ও মৃত্ পাত্রের টুকরা। এ ছাড়া পাথরে নির্মিত পিলার ও বুরুজও আবিষ্কৃত হয়েছে। দুর্গ ছুঁয়ে দুটি কবরস্থান আছে। স্থানীয়ভাবে এগুলো নিয়ামত বিবির মাজার ও ডেঙ্গ মিয়ার সমাধি নামেই পরিচিত। তবে এসব নিয়ে বিতর্কও আছে।

এ দুর্গের গ্রহণযোগ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো কেউ দিতে পারেননি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতে, রোয়াইলবাড়ী দুর্গ ‘কোটবাড়ী দুর্গ’ নামেও পরিচিত। রোয়াইলবাড়ী শব্দটি আরবি ও বাংলা দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। রোয়াইল শব্দটি আরবি ‘রেইল’ বা ‘রালাহ’ থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘মানুষ’ অথবা ‘ঘোড়ার অগ্রবর্তী দল’ কিংবা ‘অশ্বারোহী সৈন্যদল’। সে হিসেবে বলা যায়, রোয়াইলবাড়ী হচ্ছে সৈন্যদলের বাসস্থান। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ভাষ্য মতে, এর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য স্থাপনা বিবেচনায় ধারণা করা যায়, রোয়াইলবাড়ী দুর্গ মোগল আমলের আগে আনুমানিক ১৪ শতকের শেষের দিকে নির্মিত হয়েছিল। ময়মনসিংহের কবি ও গবেষক ফরিদ আহমদ দুলাল জানালেন, রোয়াইলবাড়ীর স্থাপনার সঙ্গে তিনি কুমিল্লার ময়নামতী, বগুড়ার মহাস্থানগড় অথবা পাহাড়পুরের স্থাপনার সাদৃশ্য দেখতে পান। এ জন্য তিনি একে বরাবরই বৌদ্ধ বিহার বলে দাবি করে আসছেন। তিনি বলেন, গবেষক দরজি আবদুল ওয়াহাবের ‘ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন’ বইয়ে উল্লেখ আছে, রোয়াইলবাড়ী এলাকায় মাটির নিচ থেকে মাঝেমধ্যে বুদ্ধমূর্তি সংবলিত প্রাচীন ইট পাওয়া যায়। তা থেকে পণ্ডিতরা মনে করেন, এ অঞ্চলে একসময় পাল রাজাদের শাসন ছিল। যত দূর জানা যায়, ইংরেজ শাসনামলে রোয়াইলবাড়ীতে ছিল সমৃদ্ধ নৌবন্দর। এখানকার নদীতে ছিল নৌকা ও বজরাভিত্তিক বাইজি ও দেহপসারিণীদের জমজমাট ব্যবসা। স্থানীয় লোকজন আবার মনে করেন, এখানে বারোভূঁইয়াদের দলনেতা ঈশা খাঁ এসেছিলেন। তিনি কিছুদিন ছিলেন এখানে।

দুর্গ দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে এলো। আশপাশে কোনো খাবার হোটেলও নেই। খেতে হবে নান্দাইলে। সেখানে ভূরিভোজের সব এন্তেজাম সম্পন্ন। রওনা দিলাম পাকা সড়ক ধরে নান্দাইলের উদ্দেশে। সূর্যটাও তখন ডুবু ডুবু।     

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাস কিংবা ট্রেনে আসা যাবে ময়মনসিংহে। শহরের পাটগুদাম বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ গেটলক বাস ছাড়ে। নামতে হবে নান্দাইল চৌরাস্তায়। ভাড়া ৮০ টাকা। সেখান থেকে সিএনজি দিয়ে যেতে হবে সাহিতপুর বাজার। জনপ্রতি ভাড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা। সাহিতপুর বাজার থেকে সিএনজি কিংবা রিকশা নিয়ে যাওয়া যাবে রোয়াইলবাড়ী বাজার। ভাড়া জনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা। সেখান থেকে হেঁটে অথবা রিকশায় যাওয়া যাবে রোয়াইলবাড়ী দুর্গে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় কয়েকজন মিলে একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে নিলে। এতে সময়ও কম লাগবে, কষ্টও কম হবে।



সাতদিনের সেরা