kalerkantho

বুধবার  । ১৮ চৈত্র ১৪২৬। ১ এপ্রিল ২০২০। ৬ শাবান ১৪৪১

চড়কের ঘূর্ণিপাকে

উদয় শংকর বিশ্বাস   

১৩ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চড়কের ঘূর্ণিপাকে

ছবি : লেখক

গেল বছরের পহেলা বৈশাখের কথা। নিয়মিত রুটিনের মতো সকালে গিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে একটু তাড়াতাড়িই চলে এলাম বাসায়। উদ্দেশ্য চড়ক পূজা দেখতে এবার যাব জয়দেবপুরে। দুপুরের খাবার খেয়ে সোজা হাজির হই ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে। এখান থেকে ছাড়ে ঢাকা পরিবহনের গাড়িগুলো। গন্তব্য জয়দেবপুরের (গাজীপুর) শিববাড়ী। অপেক্ষার পালা দীর্ঘ হওয়ার আগেই হাজির বাসটা। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ বাসে ভিড় কিছুটা কমই বলা চলে। তার পরও বাসে থাকা বৈশাখী সাজের মানুষগুলো জানান দিচ্ছে, দিনটা আজ বাঙালি পঞ্জিকার প্রথম দিন। মনটা গুনগুন করে উঠল ‘হে বৈশাখ, এসো এসো...।’ 
বাইরে সুর্য্যি মামা বেশ দাপট দেখালেও বাসের মধ্যে গরম কিছুটা কম ছিল। গাড়িখানা একদমেই যেন চলে এলো এয়ারপোর্ট, টঙ্গি, বোর্ডবাজার ছাড়িয়ে সোজা গাজীপুরের চৌরাস্তায়। এখানে এসে গাড়ি বাঁক নিল ডানে। তারপর কিছু দূর এগিয়ে গাড়িটা থামল শিববাড়ী বাসস্ট্যান্ডে। হঠাৎ যেন ধুলার রাজ্যে এসে পৌঁছলাম। ধুলা মাড়িয়ে পদব্রজেই হাজির হলাম শিববাড়ী মন্দির প্রাঙ্গণে। শত বছর পুরনো এই মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজারা। এটিই এখন জয়দেবপুরের কেন্দ্রীয় মন্দির। এই মন্দিরের পাশের অপরিসর মাঠেই হবে চড়কের মূল আনুষ্ঠানিকতা। 
এরই মধ্যে পুরো মাঠটি লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। মাঠের মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে লাল কাপড়ে মোড়া চড়ক নামের গাছটি। এর মাথায় লম্বালম্বি করে বাঁশ বাঁধা আছে। সেই বাঁশের দুই পাশে ঝোলানো আছে দড়ি। বুঝতে বাকি রইল না এ দড়িতেই ঝুলবে চড়কের ‘সন্ন্যাসী’রা। যাঁরা পিঠে লোহার হুক বা বর্শা বিঁধিয়ে ঝোলেন, তাঁদের ‘সন্ন্যাসী’ বলা হয়। এটি একটি শৈব কৃত্যানুষ্ঠান। সাধারণত মানতকারীরা কাজটি করে থাকেন। সবাই তা করতে পারেন না। যাঁরা চড়কে ওঠেন তাঁরা তিন দিন উপোস থাকেন, নানা রীতিনীতি পালন করেন। শিবের আশীর্বাদ লাভের আশায় প্রাচীনকাল থেকে কষ্টসহিষ্ণু এই কৃত্যানুষ্ঠানটি বাংলায় পালিত হয়ে আসছে। শিব ভক্তরা শারীরিক কষ্টকে তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য থাকে শিবের অপার কৃপা লাভ। সাধারণের চোখে পুরো প্রক্রিয়াটি যদিও ভয়াবহ কিন্তু শিব ভক্তদের কাছে এটি ধর্মাচারণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। ইংরেজরা ধর্মাচারণের দিকটি না দেখে বরং এর বীভৎসতার দিকটিকেই দেখেছিল। তাই তারা উনিশ শতকের মাঝামাঝি আইন করে চড়ক পূজা বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপর বেশ কিছুকাল বন্ধ ছিল এই পূজা। পরে আবার এটি পালন করা শুরু হয়। কালীপ্রসন্ন সিংহের কালজয়ী রচনা ‘হুতুম পেঁচার নকশা’ বইয়ে সে সময়ের চড়ক উৎসবের কথা বিস্তারিত জানা যায়। এখন মূলত বাংলার বিভিন্ন জনপদে নিুবর্ণের শিবভক্ত হিন্দুরা ভক্তি সহকারে চড়ক পালন করেন। ব্রাহ্মণরা এটি কখনোই পালন করেননি, তাঁরা এটিকে কোনো ধরনের ধর্মাচার বলে স্বীকারও করেননি। 
চড়কের মাঠে প্রথমেই দেখা মিলল শিব সজ্জিত এমনই একজনের। তাঁর পিঠে ছয়টি শিক বা লোহার বড়শি বাঁধা। মাথায় পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি জটা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, সারা মুখে নীল রং মাখা, হাতে ত্রিশূল। ত্রিশূলের মাথায় নতুন আমের গুটিবিদ্ধ। বেশভূষা দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই তাঁর প্রতি সম্ভ্রম জাগল। ভক্তদের কাছে গিয়ে তিনি ভিক্ষে চাইছেন। ভক্তরা চাল-ডাল, টাকা-পয়সা যার যা সাধ্য তা-ই দিচ্ছেন। তিনিও কালক্ষেপণ না করেই ভক্তদের দেওয়া ভিক্ষে সামগ্রী ঝোলায় পুরে নিচ্ছেন। সেই সঙ্গে ঢাকের তালে তালে নানা শারীরিক কসরত করছেন দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য। তাঁর সারা পিঠে বড়শির অসংখ্য দাগ, কিন্তু মুখে হাসি। আরেকজনের দেখা মিলল, তিনি কালীর মুখোশ মাথায় চাপিয়ে হাতে কাঠের খক্ষ দিয়ে কপট ভয় দেখাচ্ছেন সবাইকে। ঢাকের তালে তালে মাথা ঘুরাচ্ছেন অবিরত। মনে হলো বুঝি তাঁর মধ্যে কালী ভর করেছেন। এ দৃশ্য দেখে ভক্ত-দর্শকদের মধ্যে দেখা দিল নতুন এক উন্মাদনা। অন্যদিকে দেখা গেল, চড়ক গাছের নিচে পূজারি করে চলেছেন পূজার আনুষ্ঠানিকতা। হিন্দু সধবা রমণীরা তাঁদের সংসার ও সন্তানের মঙ্গল কামনায় পূজারির কাছে পূজা দিচ্ছেন সারিবদ্ধভাবে। আশপাশটা ছেয়ে গেছে ধূপের ধোঁয়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে লাগল ঢাকের বোল। সবাই উন্মুখ হয়ে আছে সন্ন্যাসীর চড়কে ওঠার অপেক্ষায়। ভিড়েই মধ্যে দেখা মিলল এক সন্ন্যাসীর। কানে-গালে-হাতে-পেটে লোহার শিক ঢুকানো। শিকের মাথায় আমের কড়ি বাঁধা। ইনিই বোধ হয় প্রধান সন্ন্যাসী। তাঁর নির্দেশনায় দেখা গেল সব কিছু পরিচালিত হচ্ছে। পূজা-অর্চনার পর্ব শেষ হওয়ার পর শুরু হলো চড়কের মূল পর্ব। দর্শকদের উপস্থিতিও ক্রমশ বাড়তে লাগল। পিঠে বড়শি বাঁধা সন্ন্যাসীকে উপুড় করে ঝুলে থাকা দড়ির একপ্রান্তে বেঁধে দেওয়া হলো। অপর প্রান্তের দড়ি একজন টান দিয়ে ধরে থাকলেন। মূল সন্ন্যাসীর নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি ঘোরাতে লাগলেন আর অপর দড়িতে পিঠে বড়শি বাঁধা সন্ন্যাসী উপুড় হয়ে ভাসতে লাগলেন সমান বেগে। ঘুরন্ত অবস্থায় তিনি বাজাতে লাগলেন ঢাক। এই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মুখে কাঁচা আম, হাতে ঢাকের কাঠি, পিঠে ঢাক, গলায় পেঁচানো শোলার সাপ, গায়ে লাল ধুতি-সে এক অসাধারণ দৃশ্য। আকাশে ঘুরন্ত সন্ন্যাসীকে দেখে সবার সে কি আনন্দ। ধূপের ধোঁয়া, ঢাকের বাদন, মানুষের কোলাহল-উপস্থিত সবাইকে মুহূর্তেই নিয়ে গেল এক অপার্থিব জগতে। একপর্যায়ে ঢাক বাজানো বন্ধ করে সন্ন্যাসী তাঁর ঝোলায় থাকা আম-বাতাসা-শসা ভক্তদের মধ্যে ছুড়ে দিতে লাগলেন। সন্ন্যাসীর ছোড়া এসব জিনিস হাতে পাওয়ার জন্য ভক্তদের মধ্যে পড়ে গেল হুড়োহুড়ি। অনেকেরই বিশ্বাস, এসবে থাকে দৈব্যশক্তি। ঘোরার পাঠ সাঙ্গ করে সন্ন্যাসীকে একসময় চড়ক থেকে নামিয়ে আনা হলো। মহিলারা তাঁকে বাতাস করতে লাগলেন। এরপর শিক্ষানবিশ সন্ন্যাসীরা একে একে উঠে ঘুরতে লাগলেন চড়কের চড়কিতে। তবে সেটা তারা করলেন বড়শির বদলে গামছা বেঁধে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় একসময় সাঙ্গ হলো চড়ক পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এরপর হিন্দু ভক্ত মহিলা-পুরুষ সবাই চড়ক গাছে তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রণাম করলেন করজোড় হাতে। পূজারি ভক্ত সাধারণের মধ্যে নিবেদিত কলা-শসা, তরমুজ-আপেল-আঙুর প্রভৃতি ফল বিতরণ করে শেষ করলেন চড়ক পূজা।
 
 
কিভাবে যাবেন 
ঢাকার গুলিস্তান ও মতিঝিল থেকে মালিবাগ, বাড্ডা, ফার্মগেট, শাহবাগ, মহাখালী, বনানী, খিলক্ষেত, উত্তরা হয়ে গাজীপুর পর্যন্ত বিভিন্ন বাস সার্ভিস রয়েছে। সার্ভিসভেদে ভাড়া ৩০-৫০ টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা