kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

অষ্টম শ্রেণি

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় : ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম

২০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় : ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম

পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফর ও লর্ড ক্লাইভের মুলাকাত। ওই ঘটনা নিয়ে ছবিটি এঁকেছিলেন ফ্রান্সিস হেইম্যান নামের এক শিল্পী।

সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর

 

উদ্দীপক-১

চ্যানেলে প্রচারিত একটি চলচ্চিত্রে চোখ আটকে যায় নিপার। দেখতে পায় এ দেশীয় কিছু জমিদার জোর করে নিরীহ কৃষকদের কাছ থেকে অর্থ ও ফসল আদায় করে ইংরেজদের হাতে তুলে দিচ্ছে। দেখে সে বুঝতে পারে সিনেমাটি নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে তৈরি করা হয়েছে।

 

ক) ঔপনিবেশিক শাসন কাকে বলে?

খ) দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বলতে কী বোঝায়?

গ) নিপার দেখা শাসনব্যবস্থাটি কী? সেটা কেন এ দেশে প্রচলিত ছিল, ব্যাখা করো।

ঘ) ওই শাসনব্যবস্থার প্রভাব বাংলায় কতটা সুদূরপ্রসারী ছিল, আলোচনা করো।

 

উত্তর :

ক) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধনসম্পদ নিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশি কোনো শক্তি যদি কোনো দেশ দখল করে সেখানে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে তবে তাকে ঔপনিবেশিক শাসন বলে।

খ) দ্বৈতশাসন বলতে লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত ইংরেজ কম্পানি ও দেশীয় নবাবের সমন্বিত শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়। দিল্লির সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে দেওয়ানি লাভের পর বাংলার নবাবদের বৃত্তিভোগীতে পরিণত করে ক্লাইভ দ্বৈতশাসন প্রবর্তন করেন। এই শাসনব্যবস্থায় বাংলার নবাব শুধু শাসন ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব পান এবং রাজস্ব আদায় ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করে কম্পানি। ফলে নবাব পান ক্ষমতাহীন দায়িত্ব আর কম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা।

গ) সিনেমার দৃশ্যটি মূলত ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর ময়দানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের শুরু। এই কাজে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় নবাবের আত্মীয়-স্বজন, সভাসদ ও ক্ষমতালোভী ভারতীয় বণিক শ্রেণি। তাদের ষড়যন্ত্র এবং বাংলার শাসকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছিল বাংলায় ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

বহিরাগতের শাসন, অর্থপাচার, অর্থনৈতিক শোষণ বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনকে থামিয়ে দিয়েছিল। ফলে ক্ষমতা দখলের জন্য ইংরেজদের পরিকল্পনা প্রতিরোধ করার মতো রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কোনো প্রকার শক্তিই দেশে ছিল না। নিজস্ব জমিদারি থাকার পরও সব রাজাকে বিদেশিদের ভূমি রাজস্ব কর দিতে হতো, যার ফলে দীর্ঘদিন বিদেশি শাসনব্যবস্থা এ দেশে প্রচলিত ছিল।

ঘ) ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের ফলে ভারত উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত নবাবকে আটক ও নির্মমভাবে হত্যার পর ইংরেজরা মীরজাফরকে নবাব বানালেও মূল ক্ষমতা চলে যায় ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের হাতে। পরে ১৭৬৫ সালে ইংরেজরা দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা-বিহার-ওড়িশার রাজত্ব লাভ করে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারা নবাবকে ক্ষমতাহীন দায়িত্ব প্রদান করে সিংহাসনে বসিয়ে রাখে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব হাতে রাখে ইংরেজরা। ইংরেজরা প্রজাদের অতিরিক্ত কর দেওয়ার জন্য বল প্রয়োগ করতে থাকে। অতিরিক্ত করের চাপ আর অনাবৃষ্টির ফলে ১১৭৬ সনে বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তবে পাশাপাশি ইংরেজদের অল্প কিছু ভালো উদ্যোগও ছিল। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন ও পাশাপাশি সমাজ সংস্কারের কাজও তারা করেছে। এসব কারণে বলা যায়, পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

 

উদ্দীপক-২

সাদিমপুর গ্রামে কোনো কলেজ নেই। গ্রামটি কুসংস্কার ও অজ্ঞতায় জর্জরিত। পরে এলাকার বড়রা মিলে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। কলেজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গ্রামের এক মানগণ্য বলেন, ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন ও শোষণের জন্য ভারতব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়, যার ফলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন পাস হয়। এর পেছনে কাজ করেছিল এক দল শিক্ষিত ভারতীয়। তাই সবাইকে শিক্ষিত হতে হবে।’

 

ক) ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভাইসরয় কে ছিলেন?

খ) ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কেন দেখা দেয়?

গ) ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাসকৃত আইনের ফলাফল এ দেশের প্রেক্ষাপটে কেমন ছিল, ব্যাখ্যা করো।

ঘ) ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর সময় শিক্ষার প্রসারের আলোকে কি বলা যায় যে, সাদিমপুর গ্রামের কুসংস্কার দূর করা সম্ভব? আলোচনা করো।

 

উত্তর :

ক) ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভাইসরয় ছিলেন লর্ড ক্যানিং।

খ) ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কারণ হলো ইংরেজদের অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ১৭৬৫ সালে বাংলার রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে ইংরেজ শাসকরা। তারা প্রজাদের ওপর অতিরিক্ত কর ধার্য করে। কর পরিশোধের চাপে কৃষকরা প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। এ ছাড়া ১৭৬৮ সাল থেকে টানা তিন বছর অনাবৃষ্টির ফলে ঠিকমতো ফসল উৎপাদনও হয়নি। যেটুকু ফসল উৎপাদন হতো তা আবার শাসকগোষ্ঠী কর হিসেবে নিয়ে নিত। এর ফলেই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর তথা মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

 

গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত আইনটি হলো ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ভারত শাসন আইন। ভারত শাসন আইন জারির ফলে ভারতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা ব্রিটিশ রানির হাতে চলে যায়। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা একজন মন্ত্রীকে ভারত সচিব পদে মনোনীত করে। তিনি ১৫ সদস্যের পরামর্শক কাউন্সিলের মাধ্যমে ভারত শাসনের ব্যবস্থা করেন। এই আইন অনুসারে গভর্নর জেনারেলকে ভাইসরয় নামে অভিহিত করা হয়। এভাবেই ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

 

ঘ) শিক্ষার প্রসারের ফলে একটি এলাকার কুসংস্কার দূর করা সম্ভব। উদ্দীপকে গ্রামের সবাই মিলে কলেজ স্থাপন করে, যা পরে ওই এলাকার আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। ইতিহাস থেকে আমরা দেখি ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী উপমহাদেশে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদরাসা ও ১৭৯১ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ছাড়া রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো সমাজসংস্কারকরা প্রচলিত কুপ্রথা দূর করতে ভূমিকা রাখেন। তাঁদের উদ্যোগ এবং ইংরেজ শাসকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হিন্দুসমাজ থেকে সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ হয়, বাল্যবিয়ে বন্ধ হয় এবং বিধবা বিয়ের চলন ঘটে। এ ছাড়া তাঁদের নানা রকম কর্মসূচি ও শিক্ষার বিস্তার উপমহাদেশে নবজাগরণের সূচনা করে। এর পরিপেক্ষিতে বলা যায়, শিক্ষার মাধ্যমে বাংলার জনগণ ক্রমে অধিকার-সচেতন হয়ে ওঠে। একইভাবে সাদিমপুর এলাকায় কলেজের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটলে এলাকার কুসংস্কার দূর করতে এবং নাগরিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে ভূমিকা রাখবে।

 

     গ্রন্থনা : আল সানি



সাতদিনের সেরা